গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, বরিশাল বিভাগে জলাতঙ্ক প্রতিষেধক (এআরভি) ও সাপের কামড়ের বিষনাশক (অ্যান্টিভেনম) ভ্যাকসিনের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। গত পাঁচ-ছয় মাস ধরে এই দুটি ভ্যাকসিনের সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। বিশেষ করে জলাতঙ্কের ঝুঁকি বাড়লেও বরিশাল বিভাগের সরকারি হাসপাতালগুলোতে কোথাও এই প্রতিরোধক ভ্যাকসিন পাওয়া যাচ্ছে না—এটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
কারণ, এর ফলে কুকুর-বিড়ালের কামড়ে আহত রোগীদের টিকা পেতে এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ছুটতে হচ্ছে। টিকাদান কেন্দ্রের সামনে মানুষের দীর্ঘ অপেক্ষা শেষ হচ্ছে না। এতে গ্রামাঞ্চলের রোগীদের দুর্ভোগ আরও বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে আগামী এক মাসের জন্য বরিশাল বিভাগে জরুরি ভিত্তিতে ৯ হাজার ৭৪০ ভায়াল ভ্যাকসিন চেয়েছে বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, যা দিয়ে ৪৮ হাজার ৭০০ জনকে সেবা দেওয়া সম্ভব।
এই সংকটের মূল কারণ কেন্দ্রীয় পর্যায়ে ভ্যাকসিনের ঘাটতি, ঔষধ প্রশাসন ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মধ্যে সমন্বয়হীনতা এবং চাহিদাপত্র অনুমোদনে দীর্ঘসূত্রতা। স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে বলা হচ্ছে, মে বা জুন মাসে সরবরাহ পাওয়া যাবে; কিন্তু এই দীর্ঘ অপেক্ষার দায় কে নেবে?
চিকিৎসকদের মতে, কুকুর, বিড়াল বা শিয়ালের কামড় বা আঁচড়ের পর অ্যান্টি-র্যাবিস ভ্যাকসিন দেওয়া বাধ্যতামূলক। গুরুতর ক্ষেত্রে এর সঙ্গে র্যাবিস ইমিউনোগ্লোবুলিনও দিতে হয়। কিন্তু এসবের কোনো সরবরাহ নেই। অন্যদিকে সাপে কাটা রোগীর চিকিৎসায় প্রথম এক ঘণ্টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যা ‘গোল্ডেন আওয়ার’ নামে পরিচিত। এই সময়ের মধ্যে অ্যান্টিভেনম প্রয়োগ না করা গেলে মৃত্যুঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়। বাংলাদেশে সাধারণত চার ধরনের বিষধর সাপ রয়েছে। এর মধ্যে গোখরা সাপের বিষ দ্রুত স্নায়ুতন্ত্রে আঘাত করে, ফলে এক ঘণ্টার মধ্যেই রোগীর অবস্থা সংকটাপন্ন হয়ে যেতে পারে। এই অবস্থায় জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উপজেলা পর্যায়ে সাপে কাটা ও জলাতঙ্কের জরুরি চিকিৎসা নিশ্চিত না করলে মৃত্যুহার কমানো সম্ভব নয়। এটি শুধু চিকিৎসা সংকট নয়, বরং নীতিগত ও প্রশাসনিক ব্যর্থতার প্রতিফলন।
আমরা জানি, জলাতঙ্ক একটি মারাত্মক রোগ, যার লক্ষণ প্রকাশ পেলে মৃত্যু প্রায় অনিবার্য। তাই এই ভ্যাকসিন সরবরাহে অবহেলা করা মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়। সম্প্রতি বাবুগঞ্জ উপজেলার সায়েম বা হানিফ শরীফের মৃত্যু প্রমাণ করে, উপজেলা পর্যায়ে অ্যান্টিভেনম না থাকা মানে রোগীকে নিশ্চিত মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া। বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজে পৌঁছানোর আগেই পথেই এ ধরনের রোগীদের প্রাণ হারানো এখন যেন নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। তবে শুধু বরিশাল নয়, সারাদেশেই এই দুই ধরনের ভ্যাকসিনের সংকট রয়েছে। এই সংকটের মূল কারণ কেন্দ্রীয় পর্যায়ে ভ্যাকসিনের ঘাটতি, ঔষধ প্রশাসন ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মধ্যে সমন্বয়হীনতা এবং চাহিদাপত্র অনুমোদনে দীর্ঘসূত্রতা। স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে বলা হচ্ছে, মে বা জুন মাসে সরবরাহ পাওয়া যাবে; কিন্তু এই দীর্ঘ অপেক্ষার দায় কে নেবে? প্রতিটি দিন যখন জীবনের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে, তখন মাসের পর মাস সরবরাহ বন্ধ থাকা কি মেনে নেওয়া যায়?
এদিকে আর কিছুদিন পরই বর্ষাকাল আসছে। এই সময়ে প্রাকৃতিক কারণেই গ্রামাঞ্চলে সাপের উপদ্রব অনেক বেড়ে যায়। জলাশয় ভরে গেলে সাপ লোকালয়ে চলে আসে, ফলে কৃষক ও সাধারণ মানুষের ঝুঁকি বাড়ে। তাই এখনই যদি অ্যান্টিভেনম ও জলাতঙ্কের ভ্যাকসিন জেলা থেকে উপজেলা পর্যায়ে পর্যাপ্ত পরিমাণে মজুদ না করা হয়, তবে পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। তাই দেরি না করে কেন্দ্রীয় ঔষধাগার থেকে আকাশপথে বা দ্রুততম উপায়ে বরিশালসহ দেশের সব দুর্গম এলাকায় এআরভি ও অ্যান্টিভেনম ভ্যাকসিন পৌঁছে দিতে হবে। শুধু ভ্যাকসিন পাঠালেই চলবে না, উপজেলা পর্যায়ে সেগুলো সংরক্ষণের জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও কোল্ড-চেইন নিশ্চিত করতে হবে। বর্ষায় সাপের কামড় থেকে বাঁচতে বাড়ির চারপাশ পরিষ্কার রাখা, অন্ধকারে আলো ব্যবহার করা এবং কার্বলিক অ্যাসিড ব্যবহার বিষয়ে মানুষকে সচেতন করতে হবে। পাশাপাশি ওঝা বা ঝাড়ফুঁকের ওপর নির্ভর না করে সরাসরি হাসপাতালে যাওয়ার পরামর্শ পত্রিকা, টেলিভিশন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচার করা জরুরি।













