আমরা প্রায়ই উন্নয়নকে দূরের কোনো আলোকবর্তিকা বলে কল্পনা করি—যেন তা কেবল কিছু নীতিমালা, কিছু প্রকল্প, কিছু স্বপ্নকল্পনা। অথচ উন্নয়ন কোনো বাহ্যিক বস্তু নয়, যা বাইরে থেকে আমদানি করা যায়। বরং এটি এক ধরনের অভ্যন্তরীণ রূপান্তর—একটি জাতির সম্মিলিত চরিত্রের ধীর, নিঃশব্দ বিবর্তন। এখানে একটি সহজ অথচ নির্মম সত্য রয়েছে, যা উচ্চারণ করতে আমরা সংকোচ বোধ করি। তা হলো—যতক্ষণ না একটি দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠী শৃঙ্খলাবোধে অভ্যস্ত হয়, ততক্ষণ সেই দেশ উন্নতির পথে এগোনোর উপযুক্ত হয়ে ওঠে না।
নিঃসন্দেহে বলা যায়, উন্নয়ন কোনো দয়া নয়, কোনো কৌশলও নয়; এটি এক ধরনের অর্জিত যোগ্যতা। আর এই যোগ্যতার মূলভিত্তি শৃঙ্খলা—নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা, নিয়ম মানার অভ্যাস এবং অন্যের অধিকারের প্রতি অবিচল সম্মান।
এই জায়গাতেই আমাদের আয়নায় নিজেদের দেখা দরকার—আমরা কি সত্যিই শৃঙ্খলাবদ্ধ? নাকি আমরা কেবল সুযোগের অপেক্ষায় থাকি—কোথায় নিয়ম ভেঙে একটু সুবিধা নেওয়া যায়? রাস্তার মোড়ে, অফিসের ফাইলে, বাজারের দরদামে—আমরা কি প্রতিনিয়ত এক অদৃশ্য খেলায় অংশ নিই না, যেখানে ‘বুদ্ধিমত্তা’র নামে অসততাকেই বৈধতা দিই?
অথচ আমরা বুঝি না—‘বিশৃঙ্খল জাতি উন্নতি করতে পারে না’। এটি কোনো নৈতিক বাণী নয়; এটি এক নির্মোহ বাস্তবতা। শৃঙ্খলা মানে শুধু বাহ্যিক নিয়ম পালন নয়, এটি এক ধরনের অভ্যন্তরীণ স্থিতি। যে সমাজে মানুষ নিয়মকে শত্রু মনে করে, সেখানে উন্নয়ন সবসময় অনিশ্চিত জুয়ার মতো। আজ কিছু অগ্রগতি হলো, কালই তা ভেঙে পড়ল—কারণ ভিতরে কোনো দৃঢ়তা নেই।
চালাকি, ফাঁকি এবং স্বল্পমেয়াদি লাভের প্রতি আমাদের অদ্ভুত আকর্ষণ আসলে সর্বনাশের পথই প্রশস্ত করে। আমরা অনেক সময় এটিকে বুদ্ধি বা কৌশল বলে প্রশংসা করি; কিন্তু এই তথাকথিত বুদ্ধি আসলে আত্মঘাতী প্রবণতা। কারণ, প্রতারণা কখনোই সমষ্টিগত সাফল্যের ভিত্তি হতে পারে না। এটি কেবল আস্থার মৃত্যু ঘটায়—আর আস্থা ছাড়া কোনো সমাজ টিকে থাকতে পারে না।
ধরা যাক, একটি বাজার যেখানে প্রত্যেক বিক্রেতা ক্রেতাকে ঠকাতে চায়, আর প্রত্যেক ক্রেতা বিক্রেতাকে সন্দেহ করে—সেখানে কি কোনো সুস্থ অর্থনীতি গড়ে উঠতে পারে? কিংবা একটি রাষ্ট্র, যেখানে নাগরিকেরা নিয়ম মানার চেয়ে নিয়ম এড়ানোর পথ খুঁজতেই বেশি আগ্রহী—সেখানে কি স্থায়ী উন্নয়ন সম্ভব? উত্তরটি স্পষ্ট, কিন্তু আমরা তা উচ্চারণ করতে চাই না।
আমরা প্রায়ই ভাবি—অমুক দেশ উন্নত, কারণ তাদের সম্পদ বেশি, প্রযুক্তি উন্নত। কিন্তু আমরা কি খেয়াল করি, তাদের শক্তির মূলে রয়েছে সামাজিক শৃঙ্খলা ও পারস্পরিক আস্থা? অন্যদিকে, যখন কোনো সমাজে এই দুইয়ের অভাব থাকে, তখন উন্নয়ন একটি ভঙ্গুর মুখোশে পরিণত হয়—বাইরে চকচকে, ভেতরে শূন্য।
প্রতিদিনের ছোট ছোট আচরণে—নিয়ম মানা বা ভাঙার ক্ষুদ্র সিদ্ধান্তে—ধীরে ধীরে একটি জাতির চরিত্র গড়ে ওঠে। তাই রাষ্ট্রের নির্বাহী প্রধানের ভূমিকাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কেবল আইন প্রণয়ন করলেই শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত হয় না; প্রয়োজন একটি নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির বিকাশ এবং শৃঙ্খলা, সততা ও দায়িত্ববোধের চর্চা নিশ্চিত করা।
এখন প্রশ্ন—আমরা কি সেই জাতি, যারা সাময়িক লাভের মোহে নিজেদের ভবিষ্যৎ বিক্রি করতে প্রস্তুত? নাকি আমরা সেই জাতি, যারা বুঝতে শিখেছি—শৃঙ্খলা কোনো বাধা নয়, এটাই মুক্তির পথ?
কারণ জোচ্চুরি, ঠকবাজি, ফোরটোয়েন্টিগিরি—এসব কখনো দীর্ঘপথের সঙ্গী নয়। এগুলো ক্ষণস্থায়ী ছায়া—যা প্রথমে আশ্রয় দেয়, পরে অন্ধকারে ঠেলে দেয়। তাই উন্নয়নকে যদি সত্যিই টেকসই করতে চাই, তবে আমাদের প্রথম কাজ হবে নির্ভীকভাবে নিজেদের আয়নায় দেখা—আমরা আসলে কতটা শৃঙ্খলাবদ্ধ?













