মার্চের মাঝামাঝি—ক্যালেন্ডারের পাতায় এখনো বসন্তের রেশ থাকার কথা, অথচ আকাশ থেকে ঝরছে যেন গলিত সিসা। ভোরের স্নিগ্ধতা ফিকে হতে না হতেই তপ্ত পিচঢালা পথ থেকে উঠে আসছে আগুনের হলকা। যে শহরে বাতাসের গান শোনার কথা ছিল, সেখানে আজ বইছে মরুভূমির তপ্ত ‘লু-হাওয়া’।
পরিসংখ্যান বলছে, গত ২০ বছরে ঢাকার তাপমাত্রা বেড়েছে প্রায় ৩–৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। কোনো কোনো এলাকায় এই দহন গ্রামের তুলনায় ৭ ডিগ্রি পর্যন্ত বেশি। কিন্তু এই অস্বাভাবিক অগ্নিদাহ কেবল ‘জলবায়ু পরিবর্তন’ নামক কোনো বিমূর্ত বৈশ্বিক সমস্যার ফল নয়; বরং এটি আমাদের অপরিকল্পিত নগরায়ন ও আত্মঘাতী উন্নয়ন-দর্শনের চরম মূল্য। আমরা গড়ে তুলেছি কংক্রিটের জঙ্গল, আর তার চড়া মাশুল দিচ্ছি শরীর পোড়ানো এই ‘আরবান হিট আইল্যান্ড’ বা ‘নগর তাপীয় দ্বীপ’ প্রভাবে। আমাদের প্রিয় শহরগুলো আজ একেকটি উত্তপ্ত কড়াইয়ে পরিণত হয়েছে, যেখানে সাধারণ মানুষের জীবন ওষ্ঠাগত।
আরবান হিট আইল্যান্ড : কেন এই অগ্নিদাহ?
একটি শহর কেন তার আশপাশের অঞ্চলের তুলনায় বেশি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে—এর কারণ বিশ্লেষণ করলে আমাদের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের কঙ্কালই বেরিয়ে আসে।
প্রথমত, শহরের গঠনশৈলী। আধুনিক শহর মানেই পিচঢালা কালো রাস্তা, কংক্রিটের বিশাল অট্টালিকা এবং কাঁচের দেয়ালঘেরা ভবন। এসব উপকরণ দিনের বেলায় সূর্যের তাপ শোষণ করে ধরে রাখে। গ্রামাঞ্চলে মাটি বা গাছপালা সেই তাপ বাষ্পীভবনের মাধ্যমে প্রস্বেদন ঘটিয়ে প্রকৃতিকে শীতল করে; কিন্তু শহরে সেই সুযোগ নেই। রাতে যখন প্রকৃতি ঠান্ডা হওয়ার কথা, তখন কংক্রিট ও পিচ তাদের সঞ্চিত তাপ বিকিরণ করতে শুরু করে। ফলে রাতভর শহর আর শীতল হতে পারে না।
দ্বিতীয়ত, ভবনের স্থাপত্যশৈলী। বর্তমানে ‘গ্লাস টাওয়ার’ বা কাঁচের দেয়ালযুক্ত ভবনের প্রবণতা বাড়ছে। এসব কাঁচ সূর্যের আলো প্রতিফলিত করে পাশের রাস্তা ও ভবনকে আরও উত্তপ্ত করে তোলে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র বা এসির অবাধ ব্যবহার। আমরা নিজেদের ঘর ঠান্ডা রাখতে গিয়ে এসির বাইরের ইউনিট দিয়ে যে গরম বাতাস বাইরে ছাড়ি, তা পথচারীসহ আশপাশের মানুষের জন্য অসহনীয় পরিস্থিতি তৈরি করে। এটি এক ধরনের দুষ্টচক্র—গরম বাড়ে বলে আমরা এসি চালাই, আর এসির কারণে বাইরের পরিবেশ আরও উষ্ণ হয়ে ওঠে।
তৃতীয়ত, সবুজায়ন ও জলাশয়ের সংকট—অর্থাৎ শহরের ‘ফুসফুস’ অকেজো হয়ে পড়া। একটি আদর্শ শহরের অন্তত ২৫ শতাংশ এলাকায় সবুজ থাকা প্রয়োজন। কিন্তু আমাদের নগর পরিকল্পনায় সবুজের স্থান প্রায় কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ। উন্নয়নের নামে শতবর্ষী গাছ কেটে ফেলা হচ্ছে, পার্কগুলোকে কংক্রিটে ঢেকে ফেলা হচ্ছে। অথচ গাছ শুধু ছায়া দেয় না; এটি কার্বন-ডাই-অক্সাইড শোষণ করে অক্সিজেন সরবরাহ করে এবং পানি বাষ্পীভবনের মাধ্যমে বাতাসকে প্রাকৃতিকভাবে ঠান্ডা রাখে। একই চিত্র জলাশয়ের ক্ষেত্রেও। নদী, খাল, পুকুর ও ঝিল ছিল শহরের ‘পকেট এসি’। বাষ্পীভবনের মাধ্যমে এগুলো আশপাশের তাপমাত্রা কমিয়ে রাখত। কিন্তু গত তিন দশকে আমরা ঢাকাসহ বিভিন্ন শহরে অর্ধেকের বেশি জলাশয় ভরাট করে বহুতল ভবন নির্মাণ করেছি। ফলে বৃষ্টির পানি যেমন নিষ্কাশিত হতে পারছে না, তেমনি তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের প্রাকৃতিক ব্যবস্থাও ভেঙে পড়েছে।
চতুর্থত, আইনি কাঠামো ও নীতিমালার ব্যর্থতা। একজন আইন বিভাগের শিক্ষার্থী হিসেবে যখন দেখি পরিবেশ সংরক্ষণের জন্য বিদ্যমান আইনগুলোর যথাযথ প্রয়োগ নেই, তখন হতাশ হতে হয়। বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ এবং প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণ আইন, ২০০০-এ স্পষ্টভাবে জলাশয় ভরাটকে দণ্ডনীয় অপরাধ বলা হয়েছে। ‘ড্যাপ’ (DAP) বা ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যানেও সবুজের জন্য নির্দিষ্ট জায়গা রাখার নির্দেশনা রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে রাজউকের নকশা অমান্য করে ভবনের চারপাশের ফাঁকা জায়গা দখল করা হচ্ছে। ‘বনায়ন’ বলতে অনেক সময় শুধু শোভাবর্ধক ছোট গাছ লাগানো বোঝানো হয়; কিন্তু বড় ছায়াদানকারী বৃক্ষ রোপণ ও সংরক্ষণে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও তদারকি অনুপস্থিত। সিটি কর্পোরেশনের পক্ষ থেকে ছাদবাগানে ১০ শতাংশ হোল্ডিং ট্যাক্স ছাড়ের ঘোষণা থাকলেও তার কার্যকর বাস্তবায়ন এখনো আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আটকে আছে।
সমাধানের পথ : সবুজ ও নীলের মেলবন্ধন
এই সংকট থেকে উত্তরণের পথ কঠিন হলেও অসম্ভব নয়। এখনই ‘গ্রে টু গ্রিন’—অর্থাৎ কংক্রিট থেকে সবুজে ফেরার সময়।
প্রথমত, ছাদবাগান ও ভার্টিকাল ফরেস্ট্রিতে জোর দিতে হবে। পরিকল্পিতভাবে ভবনের ছাদ সবুজায়ন করা গেলে ভেতরের তাপমাত্রা অন্তত ৩–৫ ডিগ্রি কমানো সম্ভব। যেসব ভবনের ছাদে পর্যাপ্ত জায়গা নেই, তারা দেয়ালে লতানো গাছ বা ‘ভার্টিকাল ফরেস্ট্রি’ পদ্ধতি অনুসরণ করতে পারে। এতে ভবন সরাসরি তাপের প্রভাব থেকে রক্ষা পাবে এবং বায়ুর মানও উন্নত হবে।
দ্বিতীয়ত, নগর বনায়ন ও ‘পকেট পার্ক’ গড়ে তুলতে হবে। রাস্তার ধারে শোভাবর্ধক গাছের বদলে স্থানীয় ছায়াদানকারী বৃক্ষ—যেমন বকুল, ছাতিম, জারুল—রোপণ করা প্রয়োজন। শহরের ছোট ছোট খালি জায়গায় এমন পার্ক তৈরি করতে হবে, যেখানে থাকবে ঘাস ও গাছ; অপ্রয়োজনীয় কংক্রিট নয়।
তৃতীয়ত, ‘স্পঞ্জ সিটি’ ধারণা বাস্তবায়ন ও জলাধার পুনরুদ্ধারে আইন প্রয়োগ জোরদার করতে হবে। শহরকে এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে, যাতে বৃষ্টির পানি শোষিত হয়ে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর বজায় থাকে এবং উপরিভাগের তাপ কমে। দখল হওয়া খাল ও পুকুর পুনরুদ্ধার করা এখন সময়ের দাবি।
চতুর্থত, স্থাপত্য ও নগর পরিকল্পনায় পরিবর্তন আনতে হবে। রাস্তা ও ফুটপাতে পিচের বদলে তাপ-সহনশীল উপকরণ বা ‘কুল পেভমেন্ট’ ব্যবহার করা যেতে পারে। ভবনের নকশায় প্রাকৃতিক আলো-বাতাস চলাচলের সুযোগ বাড়াতে হবে, যাতে এসির ওপর নির্ভরতা কমে।
প্রকৃতির ওপর আমাদের এই নিরন্তর অত্যাচার যদি বন্ধ না হয়, তবে অদূর ভবিষ্যতে শহরগুলো বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়বে। তীব্র তাপপ্রবাহ শুধু শারীরিক কষ্টই বাড়ায় না; এটি শ্রমশক্তির উৎপাদনশীলতা কমিয়ে দেয় এবং নিম্নআয়ের মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে তোলে। আমাদের মনে রাখতে হবে, উন্নয়ন মানে কেবল উঁচু ভবন বা প্রশস্ত রাস্তা নয়; উন্নয়ন মানে একটি সুস্থ, বাসযোগ্য পরিবেশ।
নগর পরিকল্পনাবিদ, সরকার এবং সাধারণ নাগরিক—সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টাই পারে এই উত্তপ্ত শহরগুলোকে আবার শীতল করতে। আসুন, আমরা নিজের ঘর থেকেই শুরু করি। অন্তত ছাদে বা বারান্দায় একটি গাছ লাগাই, জলাশয় রক্ষায় সোচ্চার হই। আমরা যদি আজ প্রকৃতির যত্ন না নিই, তবে প্রকৃতি আমাদের ক্ষমা করবে না। আগামী প্রজন্মের জন্য একটি মরুভূমি নয়, বরং সুজলা-সুফলা, শীতল শহর রেখে যাওয়াই হোক আমাদের অঙ্গীকার।













