২০২৬ সালের ঈদুল ফিতরের দিন চারেক আগের ঘটনা। কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে ভোর পাঁচটা থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন রফিকুল ইসলাম। গার্মেন্টসকর্মী, মিরপুরে থাকেন পরিবারসহ; ঘরে বৃদ্ধা মা এবং ছোট দুই সন্তান রয়েছে। সারা বছর জমিয়ে রাখা টাকায় ঈদের নতুন জামা কিনেছেন, এখন শুধু বাড়ি ফেরার পালা।
কাউন্টারে পৌঁছতেই শুনলেন—টিকিট নেই। অনলাইনেও খুঁজে পেলেন না। তবে স্টেশনের বাইরে একদল মানুষ ফিসফিস করছে: “টিকিট লাগবে? আছে, তবে একটু বেশি পড়বে।” সরকার নির্ধারিত ২১৫ টাকার টিকিট দালালের কাছে বিক্রি হচ্ছে ১০০০ টাকায়। বিকল্প না থাকায় রফিকুল সেই টিকিট কিনলেন। কারণ, পরিবার নিয়ে বাড়ি যাতাই বাধ্যতামূলক। রফিকুল একা নন—প্রতি ঈদে লাখো মানুষ এই অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন। বাস, লঞ্চ, ট্রেন—সব পথেই চলে একই লুট। প্রশ্নটা সহজ: এই অবস্থার জন্য দায়ী কে—পরিবহন মালিক ও দালালদের লোভ নাকি রাষ্ট্রের উদাসীনতা?
ঈদযাত্রা : আনন্দের পথে চাপের পাহাড়
ঈদুল ফিতর বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় উৎসব। প্রতি বছর এক কোটিরও বেশি মানুষ ঢাকা ছেড়ে ছুটে যান গ্রামের বাড়ি, মা-বাবা, সন্তান এবং শেকড়ের কাছে। এই ফেরাটা শুধু যাত্রা নয়—এটা আবেগ, পরিচয়।
কিন্তু সেই আবেগকে পুঁজি করে প্রতি বছর চলে নির্মম ব্যবসা। BRTA নির্ধারিত ভাড়ার তালিকা থাকলেও তা মানা হয় না। ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে সরকার নির্ধারিত ৫৫০ টাকার বাসভাড়া ঈদের আগে বিক্রি হয় ১২০০–১৫০০ টাকায়। “ঈদের সময় একটু বেশি লাগে ভাই”—এই一句তে যাত্রীর প্রতিবাদ শেষ।
লঞ্চেও একই অবস্থা, কেবিনের দাম আকাশছোঁয়া। সবচেয়ে বেহাল অবস্থা ট্রেনে। কারণ, মানুষ ট্রেনকে তুলনামূলকভাবে সাশ্রয়ী ও নিরাপদ মনে করে। সেই চাপকে কাজে লাগিয়ে লুটপাট চলে, যা বাস বা লঞ্চের চেয়েও ভয়াবহ।
ট্রেনের টিকিট : কাউন্টারে নেই, দালালের হাতে আছে
কমলাপুর, বিমানবন্দর, ক্যান্টনমেন্ট স্টেশনগুলোতে ঈদের আগে লম্বা লাইন—কাউন্টারে একটাই উত্তর: “টিকিট নেই।” অনলাইন পোর্টালে ঢুকলেও মুহূর্তের মধ্যে সব আসন শেষ। অথচ স্টেশনের আশেপাশে ঘুরঘুর করা দালালরা সহজেই টিকিট বিক্রি করছে দুই থেকে পাঁচগুণ দামে।
কীভাবে এত টিকিট দালালের হাতে যায়? বেশিরভাগই জানেন, কিন্তু বলার সাহস নেই। রেলওয়ের কিছু কর্মী, টিকিট পরীক্ষক (টিটি) এবং বাইরের দালাল চক্রের মধ্যে সুগঠিত নেটওয়ার্ক সক্রিয়। অনলাইন সিস্টেমে বট ব্যবহার করে মুহূর্তে বড় অংশের টিকিট কিনে নেওয়া হয়, পরে চড়া দামে বিক্রি করা হয়। কাউন্টার থেকেও নানা কৌশলে টিকিট সরিয়ে ফেলা হয়।
আর টিটি’রা তো আছেনই—বিনা টিকিটে বা কম ক্লাসের টিকিটে যাত্রীকে গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার বিনিময়ে ‘নগদ ব্যবস্থা’। প্রতি ঈদে এই নিয়ে সংবাদ হয়, তদন্ত কমিটি গঠন হয়, দু-একজন দালাল ধরা পড়ে। কিন্তু মূল সিন্ডিকেলে হাত দেওয়া হয় না। এটি শুধু দুর্নীতি নয়, এটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের মধ্য দিয়ে সাধারণ মানুষকে ঠকানোর সংগঠিত ব্যবস্থা।
পরিবহন সিন্ডিকেট : রাজনীতির ছায়ায় লুকানো লুট
শুধু ট্রেন নয়, বাস ও লঞ্চেও একই চিত্র, তবে দুর্নীতির রূপ ভিন্ন। পরিবহন মালিক সমিতিগুলো অত্যন্ত শক্তিশালী। রাজনৈতিক সংযোগ, স্থানীয় প্রশাসনের বোঝাপড়া, এবং অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলের নেতারাই এই সমিতির কর্তৃপক্ষ। ফলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন।
ঈদের আগে সমিতির সিদ্ধান্তেই নির্ধারিত হয় ‘অনানুষ্ঠানিক ভাড়া’। কোন রুটে কত নেওয়া হবে, কাউন্টারে কোন দাম দেখানো হবে, যাত্রী থেকে কত নেওয়া হবে—সবই অলিখিত নিয়মে চলে। কেউ বেঁকে বসলে চাপ আসে সমিতির তরফ থেকে। সিন্ডিকেটের গায়ে রাজনৈতিক বর্ম যতদিন না খোলা হয়, ততদিন ভাড়া বাড়তেই থাকবে।
নীরব সহ্য : মানুষ প্রতিবাদ কেন করে না?
প্রথমত, মানুষ জানেন প্রতিবাদ করলে ফল নেই। অভিযোগের স্থান আছে, কিন্তু কেউ শোনে না। হেল্পলাইনে ফোন করলে ধরেও না, ধরলেও কিছু হয় না।
দ্বিতীয়ত, সময়ের চাপ। ঈদের আগে বাড়ি পৌঁছানোই মূল লক্ষ্য; তখন অভিযোগ করার সময় নেই।
তৃতীয়ত, দীর্ঘদিনের মানসিক পরাজয়। বছরের পর বছর একই অবস্থা দেখে মানুষ মেনে নিয়েছে যে ‘এটাই স্বাভাবিক’। ক্ষোভ আছে, কিন্তু প্রতিবাদের ভাষা নেই। এই নীরব সহ্যই সিস্টেমকে টিকিয়ে রাখে।
অন্য দেশে কী হয়?
ভারতে উৎসব মৌসুমে বিশেষ ট্রেন (‘ফেস্টিভ স্পেশাল’) চালু হয়, অ্যাপ-ভিত্তিক টিকিটিং কালোবাজারি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর। পাকিস্তানেও ঈদে অতিরিক্ত পরিবহন সেবা যোগ করার নীতি আছে। এই দেশগুলো নিখুঁত নয়, তবে অন্তত স্বীকার করে যে চাহিদা বাড়বে এবং পরিকল্পনা নেওয়া দরকার। বাংলাদেশে এই দূরদর্শিতার অভাব প্রতি বছর প্রমাণিত হয়।
রাষ্ট্রের ভূমিকা : আইন আছে, প্রয়োগ নেই
BRTA ভাড়া নিয়ন্ত্রণের আইন করেছে। তবে ঈদে প্রতিনিয়ত একই অবস্থা কেন? কারণ—প্রয়োগ নেই। ভ্রাম্যমাণ আদালত মাঝেমধ্যে অভিযান চালায়, কিছু জরিমানা হয়, দু-একটি সংবাদ হয়। কিন্তু সিন্ডিকেটের মূল মাথারা ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকে। রেলওয়ের অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি অপরিবর্তিত। আইন থাকলেও যদি তা প্রয়োগ না হয়, তা সাধারণ মানুষের জন্য নয়—কেবল কাগজের আশ্বাস।
সমাধান কোথায়?
-
রেলওয়ের অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি বন্ধ করতে হবে, টিকিট কালোবাজারি চক্রে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
-
বাস ও লঞ্চে ডিজিটাল টিকিটিং বাধ্যতামূলক করতে হবে।
-
ঈদ মৌসুমে বিশেষ ট্রেন ও লঞ্চ সার্ভিস বাড়াতে হবে।
-
হেল্পলাইন সত্যিকারের কার্যকর করতে হবে।
-
সবচেয়ে জরুরি—পরিবহন সিন্ডিকেটের রাজনৈতিক বর্ম খোলা।
দায় কার?
সত্যিকারের উত্তর : দুজনেরই—পরিবহন মালিক ও দালাল চক্রের নৈতিক ব্যর্থতা এবং রাষ্ট্রের উদাসীনতা। তবে দুটির মধ্যে সবচেয়ে বিপজ্জনক হলো রাষ্ট্রের উদাসীনতা। কারণ ব্যক্তির লোভ নিয়ন্ত্রণের দায় রাষ্ট্রের।
পুনশ্চ
রফিকুল ইসলাম এবার বাড়ি গেছেন, কিন্তু পকেটের অনেকটা খালি। তাঁর কষ্টার্জিত টাকা চলে গেছে দালালের পকেটে, সিন্ডিকেটের তহবিলে, আর রাষ্ট্র দূর থেকে দেখেছে—কিছু বলেনি।
বাড়ি ফেরার আবেগ অদম্য। কিন্তু সেই আবেগকে বারবার পুঁজি করে শোষণ করা এবং রাষ্ট্র নীরব দর্শক হওয়া—এটি মেনে নেওয়া যায় না। ঘরে ফেরার পথ যদি বোঝা হয়ে যায়, তাহলে আনন্দ থাকে না—শুধু বেঁচে থাকার লড়াই। রাষ্ট্র যদি নাগরিকের উৎসবের দিনেও এই লড়াই থেকে মুক্তি দিতে না পারে, তাহলে সে রাষ্ট্র তার সবচেয়ে মৌলিক দায়িত্বে ব্যর্থ।
লেখক : তরুণ কলামিস্ট ও শিক্ষার্থী, গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
ইমেইল : taiyemkhanofficial@gmail.com













