কোলাহল, যানজট আর ইট-পাথরের যান্ত্রিক খাঁচার বাইরে ঢাকার যে একটি নিজস্ব প্রাচীন আত্মা আছে, তার দেখা মেলে এই শহরের আদি অংশ ‘পুরান ঢাকা’য়। সরু গলি আর জরাজীর্ণ ভবনের ভাঁজে ভাঁজে এখানে লুকিয়ে আছে ৪০০ বছরের এক সমৃদ্ধ ও রাজকীয় ইতিহাস। আর এই বর্ণিল ইতিহাসের সবচেয়ে সুস্বাদু ও আকর্ষণীয় অধ্যায়টি হলো এখানকার ঐতিহ্যবাহী রন্ধনশৈলী।
পুরান ঢাকা কেবল একটি ভৌগোলিক স্থান নয়; ভোজনরসিকদের কাছে এটি এক তীর্থভূমি, যেখানে মোগল আর নবাবদের হাত ধরে গড়ে ওঠা খানদানি খাবারের ঐতিহ্য আজও স্বমহিমায় টিকে আছে। এখানকার প্রতিটি পদ যেন এক-একটি অলিখিত গল্প বলে, আর প্রতিটি মসলার সুবাসে মিশে থাকে অতীত আভিজাত্যের স্মৃতি।
পুরান ঢাকার সকালের শুরুটাই হয় এক অন্যরকম মায়াবী আমেজে। কাকডাকা ভোরেই এখানকার বাতাসে ভাসতে শুরু করে ঐতিহ্যবাহী বাকরখানি আর তন্দুর রুটির মচমচে ঘ্রাণ। ভোরের ধোঁয়া ওঠা চায়ের সাথে এক টুকরো বাকরখানি ঢাকাইয়াদের প্রাত্যহিক জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। সকালের ভারী নাশতার কথা উঠলেই মনে পড়ে ঠাটারি বাজারের বিখ্যাত হোটেল স্টার কিংবা মতিঝিলের হিরাঝিলের কথা। এখানকার খাসির পায়া, গ্লাসি, মগজ ভুনা, খিচুড়ি কিংবা চিকেন টিকার স্বাদ একবার যিনি পেয়েছেন, তিনি বারবার ছুটে আসতে বাধ্য হন। এছাড়া লক্ষ্মীবাজারের পাতলাখান লেনের মচমচে লুচি-ভাজি, সূত্রাপুর ডালপট্টির বুদ্ধুর পুরি কিংবা নারিন্দার রাসেল হোটেলের নাশতা ভোজনরসিকদের কাছে তুমুল জনপ্রিয়। তৃষ্ণা মেটাতে নবাবপুর রোডের রথখোলার মোড়ের বাবুল দাসের মাঠা কিংবা নারিন্দার সৌরভের মাঠা ও ছানা যেন এককথায় অমৃতের স্বাদ এনে দেয়।
বিকেল নামতেই পুরান ঢাকার অলিতে-গলিতে শুরু হয় ভোজনবিলাসের আরেক নতুন উৎসব। কাবাবের কয়লার ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে নাজিরাবাজার থেকে লালবাগ পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকা। নাজিরাবাজার মোড়ের বিসমিল্লাহর বটি কাবাব ও গুরদা, গেন্ডারিয়ার রহমানিয়া কাবাব কিংবা লালবাগ মোড়ের মীরা মিঞার চিকেন ফ্রাই ও গরুর শিক কাবাবের ঘ্রাণে চারপাশের বাতাস যেন ম-ম করে
সূর্য যখন ঠিক মাথার ওপর, দুপুর গড়ালে এই এলাকা যেন পরিণত হয় বিরিয়ানি আর পোলাওয়ের এক সুবাসিত রাজ্যে। দুপুরের কাঠফাটা রোদও এখানকার ভোজনরসিকদের ভিড় ও উৎসাহ কমাতে পারে না। নাজিরাবাজারের হাজীর বিরিয়ানি বা হানিফ বিরিয়ানির সুবাস যে কাউকেই মাতোয়ারা করতে বাধ্য। অন্যদিকে বেচারাম দেউড়ির নান্না মিয়ার মোরগ পোলাও, চানখারপুলের মামুন হোটেলের স্পেশাল কাচ্চি কিংবা তাঁতীবাজারের কাশ্মীরের কাচ্চি যেন আভিজাত্য ও তৃপ্তির এক অনন্য মেলবন্ধন। মাংসের নানা পদের জন্য সিদ্দিক বাজারের বরিশাল মুসলিম হোটেলের গরুর কালা ভুনা বা লাল ভুনার কোনো তুলনা হয় না। বংশালের শমসের আলীর ভুনা খিচুড়ি ও কাটারি পোলাও কিংবা রায়সাহেব বাজারের গলিতে মাখন মিয়ার পোলাওয়ের স্বাদ দীর্ঘক্ষণ মুখে লেগে থাকার মতো। আর যারা দেশীয় স্বাদের এক বিশাল সমারোহ খোঁজেন, নাজিমুদ্দিন রোডের হোটেল নীরব-এর অসংখ্য পদের ভর্তা তাঁদের এনে দেয় এক অনবদ্য ও ঝালরসে পরিপূর্ণ অভিজ্ঞতা।

বিকেল নামতেই পুরান ঢাকার অলিতে-গলিতে শুরু হয় ভোজনবিলাসের আরেক নতুন উৎসব। কাবাবের কয়লার ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে নাজিরাবাজার থেকে লালবাগ পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকা। নাজিরাবাজার মোড়ের বিসমিল্লাহর বটি কাবাব ও গুরদা, গেন্ডারিয়ার রহমানিয়া কাবাব কিংবা লালবাগ মোড়ের মীরা মিঞার চিকেন ফ্রাই ও গরুর শিক কাবাবের ঘ্রাণে চারপাশের বাতাস যেন ম-ম করে। আরমানিটোলার ঐতিহাসিক তারা মসজিদের পাশে জুম্মন মামার চটপটি বিকেলের আড্ডায় এনে দেয় এক অন্যরকম প্রাণোচ্ছলতা। পাশাপাশি টিপু সুলতান রোডের হোটেল খানের টাকি মাছের পুরি, লালবাগ চৌরাস্তার খেতাপুরি বা গেন্ডারিয়ার ভাটিখানার হাসেম বাঙালির ডালপুরি বিকেলের নাশতাকে করে তোলে আরও মুখরোচক।
ঝাল আর মসলাদার খাবারের পর মিষ্টিমুখ এবং প্রাণজুড়ানো পানীয় ছাড়া পুরান ঢাকার ভোজনপর্ব কখনোই সম্পূর্ণ হয় না। রায়সাহেব বাজার বা জনসন রোডের ঐতিহ্যবাহী বিউটির লাচ্ছি, লালবাগ রয়্যাল হোটেলের পেস্তা-বাদামের শরবত কিংবা চকবাজারের নূরানী কোল্ড ড্রিংকসের শরবত এক চুমুকেই দূর করে দেয় সারা দিনের সব ক্লান্তি। মিষ্টিপ্রেমীদের জন্য এখানে রয়েছে এক বিশাল ও রাজকীয় আয়োজন। নবাবপুরের মরণচাঁদ মিষ্টির টক দই, গেন্ডারিয়ার সোনা মিয়ার দই কিংবা ঠাটারি বাজারের গ্রিন সুইটসের অমৃতি ও রসে টইটম্বুর জিলাপি রসনাবিলাসে পূর্ণতা প্রদান করে। আবুল হাসনাত রোডের দয়াল সুইটস বা সিদ্দিক বাজারের মাজাহার সুইটসের নানা পদের মিষ্টিও ভোজনরসিকদের কাছে ভীষণ সমাদৃত।
পুরান ঢাকা কেবল কিছু পুরোনো ভবনের সমষ্টি বা ঘিঞ্জি গলির আস্তানা নয়; এটি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে সযত্নে বয়ে চলা এক জীবন্ত সংস্কৃতি। এখানকার প্রতিটি খাবারের দোকান, প্রতিটি সরু গলি যেন এক-একটি ইতিহাসের জ্বলন্ত সাক্ষী। আধুনিকতার আগ্রাসন আর ফাস্ট ফুডের চাকচিক্যের ভিড়েও ৪০০ বছরের এই ঐতিহ্যবাহী রন্ধনশৈলীর আকর্ষণ এতটুকুও ম্লান হয়নি, বরং সময়ের সাথে সাথে এর কদর ও জৌলুস আরও বেড়েছে। স্বাদের জাদুকরী শহর পুরান ঢাকা তাই আজও বাংলার ভোজনরসিকদের হৃদয়ে এক অটুট সিংহাসনে অধিষ্ঠিত। এখানকার খাবার শুধু মানুষের ক্ষুধাই মেটায় না, বরং যুগ যুগ ধরে এক গভীর প্রশান্তিতে তৃপ্ত করে চলেছে প্রতিটি ভোজনরসিকের আত্মাকে।














