মুসলমানদের প্রধান দুটি ধর্মীয় উৎসব হলো ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা। ঈদ মানেই আনন্দ, মিলন আর উচ্ছ্বাস—এটাই আমাদের পরিচিত সামাজিক বাস্তবতা। নতুন পোশাক, সুস্বাদু খাবার, আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে দেখা—সব মিলিয়ে ঈদ যেন এক সামষ্টিক আনন্দের উৎসব। কিন্তু এই আনন্দের আবরণের আড়ালেও লুকিয়ে থাকে কিছু মানুষের নীরব বেদনা। বিশেষ করে যেসব সন্তান তাদের বাবাকে হারিয়েছেন, তাদের কাছে ঈদ অনেক সময় আনন্দের নয়, বরং গভীর স্মৃতি ও শূন্যতার এক দিন হয়ে ওঠে। তেমনই এক গল্প আমার নিজের জীবনের।
২০২১ সালের পর থেকে প্রতিটি ঈদ কাটছে আব্বুকে ছাড়া। সময় যতই পেরিয়ে যাক, ঈদ এলেই মনে হয় যেন সবকিছু থেমে গেছে। বাবা নেই—তাই যেন ঈদের আনন্দও আর আগের মতো নেই। বাবাকে হারানোর পর প্রথম ঈদের স্মৃতিটা আজও হৃদয়ে গভীরভাবে রয়ে গেছে।
একটি পরিবারের ঈদ প্রস্তুতি থেকে শুরু করে নানা আয়োজনের তদারকিতে সাধারণত বাবার উপস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু যেসব সন্তানদের বাবা নেই, তাদের ঈদ প্রায়ই হয়ে ওঠে স্মৃতিচারণ আর নীরবতার এক সময়
বাবাকে হারানোর পরের বছরের ঈদ ছিল বিষণ্ণতা আর স্মৃতিতে ভারাক্রান্ত। ঈদের স্বাভাবিক আনন্দ যেন কোথাও হারিয়ে গিয়েছিল। মনে হতো, আমি যেন শুধু স্মৃতির ভেতরেই বাস করছি। শৈশবে বাবার সঙ্গে ঈদের দিন ঘুরতে যাওয়া, মায়ের হাতে সাজিয়ে-গুছিয়ে দেওয়া—এসব ছোট ছোট স্মৃতিই তখন মনে ভেসে উঠত। আগের ঈদগুলো ছিল বাবা-মায়ের আদর, স্নেহ আর ভালোবাসায় পূর্ণ। কিন্তু এখন সেই জায়গায় শুধু শূন্যতা। বাবা ছাড়া ঈদ আসে, আবার চলে যায়—কিন্তু হৃদয়ের শূন্যতা আর পূরণ হয় না। এমন শূন্যতায় ভরা ঈদ যেন আর কারও জীবনে না আসে।
আমার মতো অনেক সন্তানই বাবাকে হারানোর পর প্রথম ঈদ কাটিয়েছেন শোক ও স্মৃতির ভার নিয়ে। মৃত্যুর এই নির্মম সত্য আমরা কেউই চাই না, তবু একসময় তা মেনে নিতে হয়। তাই অনেক সন্তানের কাছে ঈদ কেবল আনন্দের দিন নয়, বরং বেদনায় ভরা এক উপলক্ষ। একটি পরিবারের ঈদ প্রস্তুতি থেকে শুরু করে নানা আয়োজনের তদারকিতে সাধারণত বাবার উপস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু যেসব সন্তানদের বাবা নেই, তাদের ঈদ প্রায়ই হয়ে ওঠে স্মৃতিচারণ আর নীরবতার এক সময়।
বাবাকে হারানোর পর থেকে যেন এক কঠিন বাস্তবতার পথে হাঁটতে শিখেছি। ঈদ এলেই মনে হয়, অদৃশ্য এক হাহাকার পুরো পরিবারজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। ঈদের নামাজের সময় সবাই যখন মসজিদে যায়, তখন বাবার সঙ্গে পরিবারের অন্য সদস্যদের নামাজে যাওয়ার সেই পুরোনো দৃশ্যগুলো মনে পড়ে। নামাজ শেষে বাড়ি ফিরে আর তাকে সালাম করা হবে না—এই ভাবনাটা গভীর কষ্ট দেয়। একসঙ্গে বসে খাবার খাওয়া, হাসি-আনন্দ ভাগ করে নেওয়া—সবকিছুই যেন এখন শুধু স্মৃতির অংশ। এই শূন্যতা পূরণের কোনো পথ নেই।
তবুও অনেক কষ্ট সামলে ঈদের সময় বাড়িতে যাই—শুধু মায়ের মুখে একটু হাসি দেখার আশায়। কিন্তু বাবা না থাকায় এখন আর আগের মতো বাড়ি যাওয়ার সেই উচ্ছ্বাসও অনুভব করি না। আসলে মা-বাবার মধ্যে যেকোনো একজন না থাকলে জীবনের অনেক আনন্দই স্মৃতির পাতায় সীমাবদ্ধ হয়ে যায়। তখন ঈদের আনন্দও অনেকটাই ফিকে হয়ে পড়ে।
ঈদ মূলত আনন্দ ও মিলনের উৎসব। কিন্তু কিছু মানুষের জীবনে এই আনন্দের ভেতরেও লুকিয়ে থাকে না বলা অনেক কষ্ট। সেই নীরব কষ্টের গল্পই হয়তো আমাদের মনে করিয়ে দেয়—পরিবারের মানুষগুলোই আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় সম্পদ।














