বিশ্বজুড়ে ফি বছর ৮ মার্চের মঞ্চগুলো যখন নারীর ক্ষমতায়ন আর সমতার রঙিন স্লোগানে উদ্ভাসিত হয়ে উঠছে, বাংলাদেশের বিচারিক বাস্তবতায় নারীর অস্তিত্ব তখন যেন এক চরম সংকটের মুখে পর্যবসিত। বিশ্ব যখন নারীকে মহাকাশে পাঠানোর স্বপ্ন দেখাচ্ছে, ঠিক তখন এই জনপদের বিভিন্ন প্রান্তে হয়তো নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বারান্দায় কোনো ধর্ষিতা নারীকে প্রহর গুনতে হচ্ছে বছরের পর বছর! তার আকাঙ্ক্ষা কেবলই একটি ন্যায়সঙ্গত রায়ের। পাশবিকতার শিকার হয়েও বিচার না পাওয়ার এই সংস্কৃতি এ দেশে কোনো নতুন দৃশ্য নয়। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে এই সংকটের ভয়াবহতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটের তথ্য বলছে, গত অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর; অর্থাৎ মাত্র ৩ মাসে শুধু ঢাকা মহানগরীতেই মোট ১৬৮টি ধর্ষণ মামলা এবং মোট ২৪৫টি অন্যান্য নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলা দায়ের হয়েছে। বাংলাদেশ পুলিশের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত অক্টোবর থেকে জানুয়ারি—এই ৪ মাসে মোট ৬২১২টি নারী ও শিশু নির্যাতন মামলা দায়ের হয়েছে। চার মাসে দায়ের হওয়া মামলার এই বিশাল পাহাড় আমাদের সামনে এই অনিবার্য ও নির্মম প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয় যে, এই বিপুল সংখ্যক অভিযোগের বিপরীতে কত জন ভুক্তভোগী নারী শেষ পর্যন্ত প্রকৃত ন্যায়বিচারের দেখা পান?
সময়ের পরিক্রমায় স্বাধীনতার ৫৫ বছর পার হয়ে গেছে, কিন্তু আজও আমাদের মা-বোনেরা তথাকথিত ন্যায়বিচারের কামনায় দিন গুনছেন। আজও ঠুনকো সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির বিষাক্ত শিকলে বন্দী আমাদের চেতনা। অধিকার আদায়েও নারীদের বিলিয়ে দিতে হয় মর্যাদা— এ কেমন কথা?
যখন আমরা আদালতের বারান্দায় এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে যাই, তখন প্রচলিত আইনের কাগুজে কঠোরতা আর বিচারিক বাস্তবতার মধ্যকার এক বিশাল, অন্ধকার শূন্যতা ফুটে ওঠে। আমাদের সংবিধানের পাতা উল্টালে আইনি সুরক্ষার এক মজবুত প্রতিশ্রুতি চোখে পড়ে। সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদ অত্যন্ত স্পষ্টভাবে আমাদের নিশ্চয়তা দেয়— ‘সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী।’ একই সাথে সংবিধানের ২৮(২) অনুচ্ছেদ রাষ্ট্র ও গণজীবনের সর্বস্তরে নারীর সমান অধিকারের কথা বলে। আইনের ভাষায় ‘জীবন’ মানে কেবল শ্বাস-প্রশ্বাস নিয়ে বেঁচে থাকা নয়, বরং সম্মান ও মর্যাদার সাথে বেঁচে থাকা— সংবিধানের ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদ তাই জীবনের নিরাপত্তা ও আইনি সুরক্ষা নিশ্চয়তা দেয়। শুধু তাই নয়, বিচার প্রার্থীর ভোগান্তি কমাতে সংবিধানের ৩৫ অনুচ্ছেদে একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ আদালতে ‘দ্রুত ও উন্মুক্ত বিচার’ পাওয়ার মৌলিক অধিকারটিও সুনির্দিষ্ট করা হয়েছে।
যখন একজন অপরাধী জানে যে, আমাদের বিচার ব্যবস্থায় তদন্তের গাফিলতি, ফরেনসিক প্রমাণের অভাব, কিংবা বিচারিক দীর্ঘসূত্রিতার সুযোগ নিয়ে সে অনায়াসেই আইনের ফাঁক গলে বেরিয়ে যেতে পারবে, তখন ফাঁসির দড়ির ভয় তাকে আদৌ নিবৃত্ত করতে পারে না। বরং কোনো সাক্ষী বা প্রমাণ যেন না থাকে— এই লক্ষ্যে ধর্ষণের পর ভুক্তভোগীকে নৃশংসভাবে হত্যার প্রবণতা বাড়ে
আমাদের আইনি কাঠামোর দিকে তাকালে মনে হয়, সুরক্ষার কোনো কমতি নেই। ঔপনিবেশিক আমলের ১৮৬০ সালের দণ্ডবিধির ৩৭৫ ও ৩৭৬ ধারায় ধর্ষণের সংজ্ঞা থেকে শুরু করে শাস্তির সীমানা সযতনে আঁকা আছে। সময়ের আবর্তনে এই সুরক্ষার দেয়ালকে আরও দুর্ভেদ্য করতে প্রণীত হয়েছে বিশেষায়িত ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০’। এই আইনের পরতে পরতে কেবল ধর্ষণই নয়, বরং নারীর জীবনের ওপর নেমে আসা যৌতুকের অভিশাপ, অপহরণের আতঙ্ক, পাচারের অন্ধকার কিংবা এসিড নিক্ষেপের মতো বীভৎসতার বিরুদ্ধেও কঠোর সাজার বিধান নিপুণভাবে গাঁথা হয়েছে। অর্থাৎ, সাংবিধানিক প্রতিশ্রুতির সুউচ্চ মিনার থেকে শুরু করে প্রচলিত আইনের প্রতিটি অনুচ্ছেদে— কোথাও দণ্ড বা শাস্তির বিধানের কোনো খামতি নেই। যেন আইনের প্রতিটি শব্দই এক একটি ইস্পাতের ঢাল। কিন্তু এই কাগুজে ইস্পাত কি বাস্তবে একজন ভুক্তভোগী নারীকে সমান আশ্রয়ের ছায়া দিতে পারছে?
চকচক করলেই যেমন সোনা হয় না, ঠিক তেমনি কঠোর আইনের বিধান থাকলেও অপরাধ প্রবণতা কমে না। আইনের কাজ যেখানে দৃষ্টান্ত স্থাপনের মাধ্যমে অপরাধ প্রবণতা কমানো, বাস্তবতার সমীকরণ বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তখন ভিন্ন। দ্য ডেইলি স্টারের এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের তুলনায় ’২৫-এর প্রথম ৭ মাসে শিশু ধর্ষণের ঘটনা বেড়েছে প্রায় ৭৫ শতাংশ।
সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকার হাতিরঝিল এলাকায় ৬ বছরের শিশু জান্নাত ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনাসহ নরসিংদীর ১৫ বছরের কিশোরী ও ময়মনসিংহের ৬৫ বছরের বৃদ্ধের দ্বারা ১০ বছরের শিশু ধর্ষণের ঘটনা দেশব্যাপী সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। মানুষের পাশবিক বর্বরতার সাক্ষী আজ চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড। পহেলা মার্চ দুপুরে এক শিশুকে ধর্ষণের পর গলা কেটে হত্যার চেষ্টা চালায় দুর্বৃত্তরা। মনে স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে— আমার মা-বোনের জীবন ও ইজ্জতের সুরক্ষা কি আদৌ এদেশের তথাকথিত কঠোর আইন দিতে পারছে?
আইনের এই কাগুজে কঠোরতা আর বাস্তব প্রয়োগের মাঝখানের এই বিভ্রম বুঝতে হলে আমাদের অপরাধবিজ্ঞানের অমোঘ সত্যের মুখোমুখি হতে হবে। অপরাধতত্ত্বের একটি সর্বজনীন ও প্রতিষ্ঠিত নীতি হলো— অপরাধ দমনে ‘সাজার কঠোরতার’ তুলনায় ‘সাজার নিশ্চয়তা’ বেশ কার্যকরী। অপরাধবিজ্ঞানীরা দেখেছেন, কেবল শাস্তির মাত্রা বাড়িয়ে অপরাধ কমানো যায় না। যখন একজন অপরাধী জানে যে, আমাদের বিচার ব্যবস্থায় তদন্তের গাফিলতি, ফরেনসিক প্রমাণের অভাব, কিংবা বিচারিক দীর্ঘসূত্রিতার সুযোগ নিয়ে সে অনায়াসেই আইনের ফাঁক গলে বেরিয়ে যেতে পারবে, তখন ফাঁসির দড়ির ভয় তাকে আদৌ নিবৃত্ত করতে পারে না। বরং কোনো সাক্ষী বা প্রমাণ যেন না থাকে— এই লক্ষ্যে ধর্ষণের পর ভুক্তভোগীকে নৃশংসভাবে হত্যার প্রবণতা বাড়ে। অর্থাৎ, দ্রুত ও নিশ্চিত ‘বিচার গ্যারান্টি’ ছাড়া আইনের এই কাঠামোগত কঠোরতা নারীকে সুরক্ষা দেওয়ার বদলে এক নতুন ও মর্মান্তিক সংকটের জন্ম দিয়েছে।
‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০’-এর ২০ ধারায় অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলা আছে যে, ট্রাইব্যুনালকে ১৮০ দিনের মধ্যে বিচারকাজ শেষ করতে হবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আদালতে এই ১৮০ দিনের আইনি বাধ্যবাধকতা যেন এক নিছক উপহাস। ফৌজদারি কার্যবিধির (CrPC) ৩৪৪ ধারার অপব্যবহার করে বারবার সময় নেওয়া, ফরেনসিক বা মেডিকেল প্রতিবেদনে গাফিলতি আর সাক্ষীর অনুপস্থিতির অজুহাতে মামলাগুলো বছরের পর বছর ধুলোপড়া ফাইলে বন্দী হয়ে থাকে। বিচারের এই অন্তহীন দীর্ঘসূত্রিতা একজন ভুক্তভোগীর জন্য কতটা যন্ত্রণাদায়ক, তা কেবল নারী ট্রাইব্যুনালের সেই জীর্ণ বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকলেই অনুভব করা যায়। এর চেয়েও ভয়াবহ হলো আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়ানো একজন নারীর মানসিক রক্তক্ষরণ।
সময়ের পরিক্রমায় স্বাধীনতার ৫৫ বছর পার হয়ে গেছে, কিন্তু আজও আমাদের মা-বোনেরা তথাকথিত ন্যায়বিচারের কামনায় দিন গুনছেন। আজও ঠুনকো সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির বিষাক্ত শিকলে বন্দী আমাদের চেতনা। অধিকার আদায়েও নারীদের বিলিয়ে দিতে হয় মর্যাদা। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও আইনি বিশেষজ্ঞ আয়েশা আক্তারের মতে সামাজিক কুসংস্কার, পারিবারিক চাপ এবং দুর্বল আইনি প্রক্রিয়ার কারণে অনেক ঘটনায় নারীরা মামলা করতে বাধার শিকার হন। তাই দরকার ভুক্তভোগী ও সাক্ষীর নিরাপত্তাবিধানের। ভুক্তভোগী শুধু যে অপরাধীর দ্বারাই নির্যাতনের শিকার হন তা কিন্তু নয়। অপরাধ সংঘটনের পর আমাদের সমাজে জেঁকে বসা কুসংস্কারাচ্ছন্ন দৃষ্টিভঙ্গির মানুষের দ্বারা মানসিক নির্যাতনেরও শিকার হন। একমাত্র আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনই পারে নারীদের অধিকারকে সুসজ্জিত করতে। পাশাপাশি প্রয়োজন শক্তিশালী বিচারব্যবস্থা। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ২০ ধারার ১৮০ দিনে রায় ঘোষণার স্বপ্ন পূরণে ট্রাইব্যুনালগুলোতে ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৪৪ ধারার যথেচ্ছ ব্যবহার বন্ধ করে অবিচ্ছিন্ন বিচার বা ‘ডে-টু-ডে হিয়ারিং’ নিশ্চিত করতে হবে; আর এর জন্য বিচারকের সংখ্যা ও কাঠামোগত সক্ষমতা বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। এছাড়া আদালতের পবিত্র প্রাঙ্গণে আসামিপক্ষের আইনজীবীর জেরার নামে অপমানজনক মন্তব্যকে অপরাধবিজ্ঞানের ভাষায় ‘সেকেন্ডারি ট্রমা’ বা দ্বিতীয়বার মানসিক ধর্ষণ হিসেবে ধরা হয়। তাই নারীর মর্যাদা রক্ষার্থে আইনজীবী ও বিচারকদের সজাগ চেতনা খুবই প্রয়োজন।
স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশসমূহ কিংবা ইউরোপের দেশগুলোতে পুলিশিং ব্যবস্থা এবং প্রযুক্তিগত নজরদারি অত্যন্ত দক্ষ। ফলে অপরাধ করে পার পেয়ে যাওয়ার বা আইনের চোখ ফাঁকি দেওয়ার সুযোগ খুবই কম। নরওয়ের মতো দেশে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা মৃত্যুদণ্ড নেই; কিছু বিশেষ ক্ষেত্র ছাড়া সর্বোচ্চ জেলের মেয়াদ সাধারণত ২১ বছর। তাদের কারাগারগুলো শাস্তির বদলে সংশোধনাগার হিসেবে কাজ করে। এর ফলাফল হিসেবে এসব দেশে পুনরায় অপরাধ করার হার বিশ্বে সবচেয়ে কম। নেদারল্যান্ডসে বিচারিক প্রক্রিয়া অত্যন্ত দ্রুত এবং স্বচ্ছ। অপরাধ করলে আইনি পরিণতির মুখোমুখি হতেই হবে—এই নিশ্চয়তা ঐ সমাজে শক্তভাবে প্রতিষ্ঠিত।
বাংলাদেশের পুলিশিং ব্যবস্থায় দরকার শক্তিশালী প্রযুক্তিগত ও নজরদারি কাঠামো। আমাদের বিচার ব্যবস্থায় বিজ্ঞানভিত্তিক বিচার প্রক্রিয়ার গুরুত্ব অস্বীকার করা যাবে না। রাষ্ট্রের দায়িত্ব কেবল কঠোর আইন প্রণয়নেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং কাঠামোগত সংস্কারের মাধ্যমে সেই আইনের শতভাগ প্রয়োগ নিশ্চিত করাই রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় দায়। যেদিন রাষ্ট্রযন্ত্রের দ্রুত ও বিজ্ঞানভিত্তিক বিচার প্রক্রিয়াই হয়ে উঠবে নারীর সুরক্ষার সবচেয়ে বড় ঢাল, যেদিন ন্যায়বিচারের আশায় কোনো নারীকে আর আদালতের জীর্ণ বারান্দায় চোখের জল ফেলতে হবে না— কেবল সেদিনই আটই মার্চের সমতার স্লোগান প্রকৃত সার্থকতা পাবে।













