মধ্যপ্রাচ্য বহুকাল ধরিয়া বিশ্বরাজনীতির এক অস্থির ও সংবেদনশীল ক্ষেত্ররূপে পরিগণিত হইয়া আসিতেছে। যুদ্ধ, সংঘাত, প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও শক্তির রাজনীতি এবং কূটনৈতিক টানাপড়েন এই অঞ্চলকে পরিণত করিয়াছে নানামুখী সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে। ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের চলমান সামরিক উত্তেজনা সেই বাস্তবতাকে যেন আবারও স্মরণ করাইয়া দিল। প্রশ্ন উঠিতে পারে, মধ্যপ্রাচ্য কেন এইভাবে বারংবার সংঘাতের মঞ্চে পরিণত হইতেছে? এই অঞ্চলের বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদ, বিশেষত তেল ও গ্যাসের সম্ভার এবং লোলুপ দৃষ্টিই কি ইহার জন্য দায়ী? নাকি আঞ্চলিক বিরোধ কিংবা বৃহত্তর আন্তর্জাতিক শক্তির স্বার্থ ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাই শুধু নহে, বরং গোটা মধ্যপ্রাচ্যের প্রতি হিংসাত্মক মনোভাবও এইখানে সংঘাত বৃদ্ধির পিছনে অগ্নস্ফুিলিঙ্গের ন্যায় কাজ করে?
পৃথিবীর বৃহত্তম জ্বালানিভান্ডারের অধিকারী মধ্যপ্রাচ্যের বহু রাষ্ট্র—বিশেষ করিয়া সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলি তেল ও গ্যাস রপ্তানির মাধ্যমে অল্প কয়েক দশকের মধ্যেই অর্থনৈতিকভাবে ব্যাপক সমৃদ্ধি অর্জন করিয়াছে। মরুপ্রধান ভূখণ্ডে গড়িয়া উঠিয়াছে আধুনিক নগরসভ্যতা, উন্নত অবকাঠামো, আকাশচুম্বী অট্টালিকা এবং বিলাসবহুল জীবনযাত্রার এক নতুন চিত্র। ফলে বিশ্ব অর্থনীতিতে এই অঞ্চলের প্রভাব ক্রমেই বৃদ্ধি পাইতেছে। যেইখানকার বেশির ভাগ বাসিন্দা একসময় ধু-ধু মরুভূমির বুকে পশু চরাইত, অতি সাধারণ জীবন যাপন করিত, সেই তাহারা রাতারাতি ক্রোড়পতি বনিয়া গেল এবং তাহাদের জীবনচিত্রও গেল বদলাইয়া—ইহা কি অনেকের ঈর্ষার কারণ হইয়া উঠিয়াছে? কারণ, ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, বিপুল সম্পদ অনেক সময় আশীর্বাদের পাশাপাশি অভিশাপও হইয়া উঠিতে পারে। যেই সকল অঞ্চলে মূল্যবান প্রাকৃতিক সম্পদের প্রাচুর্য রহিয়াছে, সেই সকল অঞ্চল বৃহৎ শক্তিসমূহের কৌশলগত আগ্রহ বা স্বার্থের কেন্দ্রবিন্দু হইয়া উঠিতে পারে।
বিখ্যাত ব্রিটিশ রাজনীতিক উইনস্টিন চার্চিল একসময় বলিয়াছিলেন, ‘Safety and certainty in oil lie in variety and variety alone.’ অর্থাত্ জ্বালানি সরবরাহের নিরাপত্তা বহুমাত্রিক উেসর উপর নির্ভরশীল। তবে বাস্তবতা হইল, বিশ্বের শিল্পোন্নত অর্থনীতির একটি বড় অংশ এখনো মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সম্পদের উপর সরাসরি নির্ভরশীল। ফলে এই অঞ্চল আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও শক্তির রাজনীতিতে সর্বদাই গুরুত্ববহ। আধুনিক কূটনীতির প্রখ্যাত বিশ্লেষক হেনরি কিসিঞ্জার যেমন মন্তব্য করিয়াছিলেন, ‘Control oil and you control nations.’ অর্থাত্, তেলের উপর যার নিয়ন্ত্রণ, জাতিগুলির উপরেও তাহার নিয়ন্ত্রণ। উক্তিটি বিতর্কিত বটে, তথাপি বিশ্বরাজনীতিতে জ্বালানিসম্পদের গুরুত্ব যে কতখানি গভীর, তাহা এই কথার মধ্য দিয়াই প্রতিফলিত হয়।
শিল্পোন্নত পশ্চিমা বিশ্ব মূলত বহুদিন ধরিয়াই জ্বালানি নিরাপত্তাকে তাহাদের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার অন্যতম ভিত্তি বলিয়া বিবেচনা করিয়া আসিতেছে। এইজন্য মধ্যপ্রাচ্যের তেল ও গ্যাসের উপর প্রভাব বিস্তার কিংবা সরবরাহ নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন হইয়া উঠিয়াছে আন্তর্জাতিক কূটনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা এমনই এক বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতিফলন। সম্পদকে কেন্দ্র করিয়া শক্তিধর রাষ্ট্রসমূহের প্রতিযোগিতা যে অনেক সময় আঞ্চলিক রাজনীতিকে অস্থির করিয়া তুলিতে পারে, ইরান বা মধ্যপ্রাচ্যের ঘটনাবলি তাহাই প্রমাণ করে। মধ্যপ্রাচ্যের ভিতরে রাজনৈতিক বিভাজন, মতপার্থক্য ও ক্ষমতার দ্বন্দ্ব রহিয়াছে বটে, কিন্তু একই সঙ্গে ইহাও অনস্বীকার্য যে, বহিরাগত শক্তির ‘হিংসাত্মক প্রতিদ্বন্দ্বিতা’ এই সংকটকে আরো জটিল করিয়া তোলে, শান্তি প্রতিষ্ঠার পথকে করিয়া তোলে দীর্ঘতর। অতএব, মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্বনেতাদের প্রতি এই গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা ছুড়িয়া দিতেছে যে, শক্তির রাজনীতির পাশাপাশি কৌশলগত অবস্থান ও সম্পদের প্রতিযোগিতা এবং ইহা হইতে উদ্ভূত হিংসাত্মক মনোভাবও জাতিগুলিকে বৃহত্তর সংঘাতের ময়দানে টানিয়া আনিতে পারে যে কোনো মুহূর্তে! প্রাকৃতিক সম্পদের প্রতি পক্ষগুলির এই লিপ্সা বা হিংসাত্মক মনোভাব একবিংশ শতকের জাতিগুলি এবং সচেতন মহলকে ভাবাইয়া তুলিতেছে।













