গতকাল সমগ্র দেশে ত্রয়োদশ উত্সবমুখর পরিবেশে অনুষ্ঠিত হইয়াছে ‘জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট-২০২৬’। বিচ্ছিন্ন কয়েকটি ঘটনা ছাড়া সার্বিকভাবে ভোটগ্রহণ ছিল অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দেড় বৎসর পর একটি নির্বাচিত সরকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে গতকাল সকাল সাড়ে ৭টা হইতে বিকাল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত এই ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। ইহার পাশাপাশি ভোটারেরা গণভোটের মাধ্যমে সংবিধানের বেশ কিছু মৌলিক পরিবর্তন আনয়নের প্রস্তাবের পক্ষে-বিপক্ষে ‘হ্যাঁ’-‘না’ ভোট দিয়া নিজেদের মতামত ব্যক্ত করিয়াছেন।
গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত হইবার পাশাপাশি এই নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করিয়াছে। বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে নির্বাচনে ভূমিধ্বস সাফল্য তুলিয়া লইয়াছে দলট। সর্বশেষ ফলাফল পর্যন্ত, বিএনপি মোট ২১২ টি আসনে জয়লাভ করিয়াছে, যেইখানে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে ১১ দলীয় জোট পাইয়াছে ৭৭টি আসন। বিএনপির এই অভূতপূর্ব সাফল্য লাভের জন্য দলটিকে আমরা শুভেচ্ছা জানাই; বিএনপির কর্ণধার তারেক রহমানকে অভিনন্দন। পাশাপাশি ধন্যবাদ জানাইতে হয় অন্তবর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা, আইনশৃঙ্খলাবাহিনী, সেনাবাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে। নির্বাচন-পরবর্তী বাংলাদেশে নূতন সরকারের হাত ধরিয়া সংবিধানের মৌলিক সংস্কার বাস্তবায়নের শুভসূচনা ঘটিবে বলিয়া আমাদের কামনা।
দেড় দশকেরও অধিক সময় পর বাংলাদেশের মানুষ একটি জাতীয় নির্বাচনে স্বতঃস্ফূর্তভাবে ও নির্ভয়ে ভোট প্রদানে সক্ষম হইলেন। এই বার বিপুলসংখ্যক তরুণ ভোটার জীবনে প্রথম বারের মতো সুযোগ পান ভোটাধিকার প্রয়োগের। সারাদেশে ২৯৯টি আসনে শান্তিপূর্ণভাবে ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হইয়াছে। বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ছাড়া বড় কোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতির খবর পাওয়া যায় নাই। প্রাথমিক গণনা শেষে জানা যায়, এইবারের নির্বাচনে প্রদত্ত ভোটের হার ৫৯ দশমিক ৪৪ শতাংশ।
এই বার সমগ্র দেশে মোট ভোটকেন্দ্র ছিল ৪২ হাজার ৭৭৯টি। এই সকল কেন্দ্রে ভোটকক্ষ ছিল ২ লক্ষ ৪৭ হাজার ৪৮২টি। এই নির্বাচনে নিবন্ধিত মোট ৬০টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে ৫০টি দল অংশগ্রহণ করে, যেইখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন মোট ২ হাজার ২৮ জন প্রার্থী। ইহাতে মোট ভোটার ছিল ১২ কোটি ৭৭ লক্ষ ১১ হাজার ৮৯৩ জন। তাহার মধ্যে পুরুষ ভোটার ৬ কোটি ৪৮ লক্ষ ২৫ হাজার ৩৬১ জন, নারী ভোটার ৬ কোটি ২৮ লক্ষ ৮৫ হাজার ২০০ জন এবং হিজড়া ১ হাজার ২৩২ জন।
এই বার ভোটারদের মধ্যে যথেষ্ট উত্সাহ-উদ্দীপনা পরিলক্ষিত হইয়াছে। কেননা, দেশের মানুষ দীর্ঘ দিন ধরিয়া তাহাদের ভোটাধিকার হইতে বঞ্চিত ছিলেন। এই কারণে প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস নিজের ভোট প্রদানের পর এই নির্বাচনি উত্সবকে ঈদ উত্সবের সহিত তুলনাপূর্বক সকলকে ‘ঈদ মোবারক’ জানান। যদিও নির্বাচনের পূর্বে বলা হইয়াছিল, আমাদের পার্শ্ববর্তী একটি দেশ হইতে এই নির্বাচন বানচাল করিবার চেষ্টা হইতে পারে।
কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় অন্যতম বৃহত্ একটি রাজনৈতিক দল এই বারের নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করিতে পারিবার কারণে মূলত কিছুটা আতঙ্ক বিরাজ করিতেছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত ইহার তেমন কোনো নেতিবাচক প্রভাব পরিলক্ষিত হয় নাই। দেশ জুড়িয়া যেই সকল বিক্ষিপ্ত সহিংসতার ঘটনা ঘটিয়াছে, তাহা আসলে উল্লেখ করিবার মতো নহে। এমনিতে উপমহাদেশের নির্বাচনি সংস্কৃতি অনুযায়ী, বিশেষ করিয়া পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশে প্রতিটি নির্বাচনে মারামারি, হানাহানি লাগিয়াই থাকে। সেই দৃষ্টিকোণ হইতেও এই নির্বাচন তুলনামূলকভাবে সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ হইয়াছে। নির্বাচনে সেনাবাহিনীসহ ১০ লক্ষ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দৃঢ়, নিরপেক্ষ ও দায়িত্বশীল ভূমিকা সর্বমহলে প্রশংসিত হইয়াছে।
এইখানে একটি কথা না বলিলেই নহে; উহা হইল, আমাদের নির্বাচনি সংস্কৃতিতে নির্বাচনপূর্ব, নির্বাচনের সময় ও নির্বাচনের পর সহিংসতা বিরাজ করে। সেই দৃষ্টিকোণ হইতে দুইটি ধাপে বড় ধরনের সহিংস ঘটনা না ঘটিলেও এখন নির্বাচনোত্তর পরিবেশ ও পরিস্থিতি যেন অনুকূলে ও শান্তিপূর্ণ থাকে, সেই দিকে বিশেষ দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন। ভিন্নধর্মাবলম্বী ও ভিন্নমতের প্রতি যাহাতে অসহিষ্ণুতা বৃদ্ধি না পায়, সেই ব্যাপারেও সতর্কতা অবলম্বন করিতে হইবে।
সুষ্ঠু নির্বাচনের পর এখন আমরা চাই ক্ষমতার হস্তান্তরও মসৃণ ও শান্তিপূর্ণ হউক। এমন নির্বাচন আয়োজনের জন্য নির্বাচন কমিশন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, সশস্ত্র বাহিনী, প্রশাসন, পর্যবেক্ষক দল, গণমাধ্যমকর্মী ও ভোটগ্রহণে যুক্ত সকল কর্মকর্তা-কর্মচারীকে আমরা ধন্যবাদ জানাই। ধন্যবাদ জানাই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকেও। এখন সর্বত্র গণতান্ত্রিক শালীনতা, সহনশীলতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ বজায় থাকিবে বলিয়া আমরা একান্তভাবে প্রত্যাশা করি।













