যুদ্ধ মানে সংঘাত এবং শান্তি বিনষ্ট। যুদ্ধ কখনো ভালো কোনো কিছু বয়ে আনতে পারে না। শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ১৯৪৮ সালে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী মিশন শুরু হয়। শান্তিরক্ষা মিশন কার্যকর করার অন্যতম শর্ত হলো সংঘাত পক্ষসমূহের সম্মতি। এছাড়াও শান্তিরক্ষীদের নিরপেক্ষতা বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শান্তিরক্ষীদের একটি সাধারণ সংকল্প হলো ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে সম্প্রদায়সমূহকে রক্ষা করা এবং সংঘাত থেকে শান্তির পথে আসার জন্য তাদের প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করা।
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের এক বিরল অর্জন হলো শান্তিরক্ষা মিশনে অংশগ্রহণের মাধ্যমে বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠায় অনন্য অবদান রাখা। যে কয়েকটি বিষয়ে বাংলাদেশ বিশ্বদরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পেরেছে, তাদের মধ্যে শান্তিরক্ষী মিশন অন্যতম; যার মূল দাবিদার বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী মিশনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী একটি উজ্জ্বল নাম, একটি জনপ্রিয় ব্র্যান্ড। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর শান্তিরক্ষীদের পেশাগত দক্ষতা, মানবিকতা, নিরপেক্ষতা, সততা, সাহস ও দূরদর্শিতা আজ বিশ্বের কাছে এক রোল মডেল। শান্তিরক্ষী মিশনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ইতিবাচক ভাবমূর্তি প্রদর্শন করায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের মর্যাদা বৃদ্ধি পেয়েছে। সশস্ত্র মিলিশিয়া বাহিনীর রক্তচক্ষু, এইডস-ইবোলা থেকে শুরু করে বিভিন্ন প্রাণঘাতী জীবাণুর ঝুঁকি, দুর্গম বিভিন্ন প্রান্তরে অজস্র বিনিদ্র রাত কাটানো, পরিবারের সঙ্গে বিচ্ছিন্নতা, খাবারের কষ্ট, পানির কষ্টসহ সবকিছু জয় করে সেনাবাহিনীর শান্তিরক্ষীরা বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তরে ছড়িয়ে যাচ্ছে শান্তির বার্তা।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনী দেশের অভ্যন্তরে বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে দেশের মানুষের আস্থা অর্জনের পাশাপাশি পেশাদারিত্ব এবং পরিশ্রমী মনোভাবের মাধ্যমে বিদেশিদেরও আস্থা অর্জন করেছে। তারা দুর্গত মানবতার সেবায় যেমন কাজ করেছে, তেমনি শান্তি বিনষ্টকারী আগ্রাসী বাহিনীকে মোকাবিলা করার ক্ষেত্রে অসামান্য দক্ষতা প্রদর্শন করেছে। পেশাদারিত্ব, নিষ্ঠা ও সাহসিকতার জন্য প্রশংসিত বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর শান্তিরক্ষীরা মানবিক সহায়তা, চিকিত্সা সহায়তা, প্রকৌশল সহায়তা এবং সংঘাত-পরবর্তী সহায়তা প্রদানের মাধ্যমে সংঘাতময় দেশে শান্তি এবং নিরাপত্তায় সর্বদা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। বিশ্বের প্রায় সব সংঘাতপূর্ণ এলাকায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর শান্তিরক্ষীদের পদচারণা রয়েছে। সুদান, মধ্য আফ্রিকা, হাইতি, সোমালিয়া, জর্জিয়া, কঙ্গো, মালি, লাইবেরিয়া, আইভরিকোস্ট, সিয়েরালিয়নসহ সব শান্তিরক্ষা মিশনে লাল-সবুজের পতাকা উড়েছে গৌরবের সঙ্গে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর শান্তিরক্ষীরা মানিয়ে নিয়েছে সাহারা মরুভূমির দুঃসহ গরম কিংবা আফ্রিকার বৈরী আবহাওয়ার সঙ্গে। সব বাধাকে জয় করে তারা বিশ্বমানবতার সেবায় নিজেদের উত্সর্গ করে ছড়িয়েছে শান্তির সুবাতাস।
১৯৮৮ সালে ইরান-ইরাক (ইউনিমগ) শান্তি মিশনে অংশগ্রহণের মাধ্যমে বাংলাদেশ ‘নীল হেলমেট’ জগতে নাম লেখায়, যেখানে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ১৫ জন চৌকশ অফিসার শান্তিরক্ষা মিশনে একতাবদ্ধ হয়। এরপর বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে আর পেছনে তাকাতে হয়নি। শান্তিরক্ষা মিশনে সর্বদা তারা অগ্রভাগে রয়েছে। দেশের পতাকা শীর্ষে রেখে তারা বিশ্বদরবারে কাজ করছে। বর্তমানে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশ তৃতীয় বৃহত্তম সৈন্য প্রেরণকারী দেশ, যার মুখ্য অবদান বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর। বর্তমানে ৯টি মিশনে ৩ হাজার ৮১৮ জন সেনাসদস্য শান্তিরক্ষী মিশনে মোতায়েন রয়েছে, যার মধ্যে ৩৬৬ জন মহিলা সদস্য। এখন পর্যন্ত ৪০টি দেশে জাতিসংঘের ৫৬টি শান্তি মিশনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মোট ১ লাখ ৬৪ হাজার ৩৯৩ জন সেনাসদস্য অংশগ্রহণ করেছে, যার মধ্যে ১ হাজার ৫৩০ জন মহিলা সৈনিক। প্রাণ হারিয়েছেন ১৩৭ জন সেনাসদস্য এবং আহত হয়েছেন ২৫৬ জন। বড় দুর্ঘটনার মধ্যে বেনিন দুর্ঘটনা, মালির আইইডি বিস্ফোরণ কিংবা সুদানের আবেই (Abyei) প্রদেশের লজিস্টিক বেইজে ড্রোন হামলা পুরো বিশ্বকে করেছে শোকে মুহ্যমান। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে অসামান্য অবদান রেখে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী বৃদ্ধি করেছে দেশের মর্যাদা। মধ্য আফ্রিকা, কঙ্গো, মালি, সুদানের দার্ফু, দক্ষিণ সুদান, আইভরিকোস্ট, সিয়েরালিয়ন কিংবা লাইবেরিয়ার মতো চ্যালেঞ্জিং কন্ডিশনে তারা ধৈর্যের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে পেয়েছে ঈর্ষণীয় সাফল্য। ফলে তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে শান্তিরক্ষা মিশনে নেতৃত্বের ভূমিকায় রয়েছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী।
২০১৪ সাল থেকে অদ্যাবধি বাংলাদেশ অন্যতম শীর্ষ শান্তিরক্ষী প্রেরণকারী দেশ হিসেবে অবদান রেখেছে। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী মিশনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে নির্বাচিত করার অনেক যুক্তিসংগত কারণ রয়েছে। গভীর প্রতিশ্রুতি, সক্রিয় অপারেশনাল ব্যবস্থা, কঠোর পেশাদারিত্বের ছাপ এবং দক্ষ প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার জন্য বাংলাদেশ সেনাবাহিনী অধিক সমাদৃত। রুয়ান্ডা, সোমালিয়া ও বসনিয়া শান্তি মিশনের মাধ্যমে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী আলোচনার শীর্ষে আসে। সোমালিয়ায় আমেরিকান, রুয়ান্ডায় বেলজিয়াম এবং বসনিয়ায় ফরাসি সেনাবাহিনীর সঙ্গে টক্কর দিয়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সামরিক দক্ষতা জাতিসংঘসহ সংশ্লিষ্ট দেশের কর্মকর্তাদের অবাক করে দেয়। ফলে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অবস্থান হয়ে ওঠে শক্তিশালী। ১৯৯৪ সালে রুয়ান্ডায় গৃহযুদ্ধ শুরু হলে বেলজিয়ামসহ অন্যান্য দেশ তাদের মিশন প্রত্যাহার করে নিলেও বাংলাদেশ সেনাবাহিনী সাহসের সঙ্গে মিশন চালিয়ে যায়। কম্বোডিয়ায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর শান্তিরক্ষী দল তাদের সুশৃঙ্খল এবং মানবিক আচরণের মাধ্যমে স্থানীয় জনগণের অকুণ্ঠ ভালোবাসা এবং প্রশংসা কুড়িয়েছিল। বসনিয়া ও হারজেগোভিনায় প্রয়োজনের তুলনায় কম জনবল নিয়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর শান্তিরক্ষীরা অসাধারণ সাহসিকতা প্রদর্শন করে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে। আইভরিকোস্ট, কম্বোডিয়া, সিয়েরালিয়ন, জর্জিয়া, লাইবেরিয়া, সুদান, দক্ষিণ সুদান, মালি, মধ্য আফ্রিকা, কুয়েত, হাইতি, কসোভো, রুয়ান্ডা, সোমালিয়া বা কঙ্গোতে শান্তি প্রতিষ্ঠা, নিরাপত্তা বজায় এবং বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ভূমিকা জাতিসংঘের সর্বস্তরে প্রশংসিত হয়েছে।
শান্তিরক্ষা মিশনে টিকে থাকার জন্য বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে শান্তি রক্ষায় তাদের দক্ষতার প্রমাণ দিতে হয়েছে। ১৯৯৫ সালে বসনিয়া থেকে ফ্রান্স সৈন্য প্রত্যাহার করলেও বাংলাদেশি সেনারা দৃঢ় মনোবল নিয়ে তাদের প্রতিস্থাপন করে, যেখানে সবার ধারণা ছিল বাংলাদেশি সেনারা ফ্রান্স সেনাবাহিনীর উপযুক্ত প্রতিস্থাপক হবে না। বসনিয়ার দুটি শহর স্রেব্রেনিকা এবং জেপাতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী অনেক হালকা অস্ত্র নিয়ে সাহস এবং দক্ষতার সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলা করে গণহত্যা বন্ধ করে সবার ধারণা ভুল প্রমাণ করেছিল। সোমালিয়ার শান্তি রক্ষা মিশন প্রত্যাহারের সময় আমেরিকান সেনারা দাবি করে—তারা সোমালিয়া ত্যাগ করা পর্যন্ত বাংলাদেশি সেনারা তাদের সঙ্গে থাকবে। স্থানীয় জনগণের আস্থা এবং ভালোবাসা সংঘাতময় এলাকায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান শক্তি। প্রতিটি মিশনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্যদের দক্ষতা, কর্মস্পৃহা, মানবতা ও দায়িত্বশীলতা জাতিসংঘের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মুগ্ধ করেছে। শান্তিরক্ষা মিশনে বিভিন্ন দেশের ফোর্স কমান্ডারগণ বৈরী পরিস্থিতিতেও বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর শৃঙ্খলা, পেশাদারী মনোভাব এবং দক্ষতার প্রশংসা করেছেন।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সাত জন অফিসার ফোর্স কমান্ডার এবং ৯ জন ডেপুটি ফোর্স কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করে শান্তিরক্ষী মিশনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ক্রমবর্ধমান নেতৃত্বের প্রতিফলন করেছেন। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সাফল্যের উল্লেখযোগ্য কারণসমূহ হলো যোগ্য সদস্যদের শান্তিরক্ষী হিসেবে নির্বাচন, কঠোর শৃঙ্খলা অনুসরণ, নিরপেক্ষতা বজায় রাখা, স্থানীয় সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধা, জাতিসংঘ ম্যান্ডেট সুচারুভাবে মেনে চলা, স্থানীয়দের প্রতি মানবিক আচরণ, সর্বত্র পেশাদারিত্বের মনোভাব প্রদর্শন, নিরপেক্ষতা, সততা, যে কোনো পরিবেশে নিজেদের মানিয়ে নেওয়া, সহানুভূতিশীল মনোভাব এবং সর্বোপরি দেশের পতাকা সমুন্নত রাখার প্রবল ইচ্ছাশক্তি। মেডিক্যাল ক্যাম্পেইন, বই বিতরণ, খাবার বিতরণ, গবাদি পশুর চিকিত্সা, খেলাধুলার উপকরণ বিতরণ, কম্পিউটার সামগ্রী বিতরণ এবং প্রশিক্ষণ, কৃষিসামগ্রী বিতরণ ইত্যাদি কার্যক্রম বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে সংঘাতময় দেশসমূহের জনগণের আস্থা অর্জনে নিদারুণ সহায়তা করেছে। এছাড়াও দ্রুত প্রভাব প্রকল্পসহ উন্নয়নমূলক কাজ বাস্তবায়ন করে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী দক্ষতার পরিচয় দিয়েছে। একমাত্র বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর রয়েছে দরিদ্র মানুষের সঙ্গে নিজেদের আহার ভাগ করে খাদ্য কষ্ট লাঘব করার ইতিহাস। অন্যান্য দেশের সেনাবাহিনী মূলত এখানে অনেক পিছিয়ে রয়েছে। ফলে যখনই শান্তিরক্ষা মিশনের জন্য জরুরিভাবে সেনার প্রয়োজন হয়, তখনই জাতিসংঘ প্রথমে বাংলাদেশের দরজায় কড়া নাড়ে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী কখনো জাতিসংঘের আহ্বানে সাড়া দিতে ব্যর্থ হয়নি, এমনকি স্বল্প সময়ের নোটিশেও শান্তিরক্ষী পাঠিয়েছে। পরিস্থিতি প্রতিকূল দেখে অন্যান্য দেশ যখন শান্তিরক্ষী পাঠাতে অনিচ্ছা পোষণ করেছে, সেখানেও বাংলাদেশ সেনাবাহিনী শান্তিরক্ষী প্রেরণের ক্ষেত্রে ইতিবাচক মনোভাব প্রদর্শন করেছে।
জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী মিশনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর নারী সদস্যদের অংশগ্রহণ বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি মাইল ফলক। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী নারী শান্তিরক্ষীদের মিশনে মোতায়েন করে সংঘাত নিরসনে অনন্য অবদান রেখেছে। জানুয়ারি ২০১৯ থেকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রতিটি কন্টিজেন্টে ‘মহিলা এনগেজমেন্ট টিম’ অন্তর্ভুক্ত করা শুরু করেছে এবং মোতায়েন অব্যাহত রেখেছে। বর্তমানে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৩৬৬ জন নারী সদস্য জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে কর্মরত রয়েছেন, যাদের মধ্যে ৮০ জন নারী কর্মকর্তা। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর বেশ কয়েক জন নারী চিকিত্সক ইতিমধ্যে শান্তিরক্ষী মিশনে দক্ষতার পরিচয় দিয়ে ভূয়সী প্রশংসা অর্জন করেছে। এছাড়াও সেনাবাহিনীর নারী কর্মকর্তাগণও আভিযানিক ক্ষেত্রে দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। ফলে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী থেকে অধিক মহিলা শান্তিরক্ষী নেওয়ার ব্যাপারে জাতিসংঘ বরাবর আগ্রহ প্রকাশ করছে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী যদি আরো মহিলা শান্তিরক্ষীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে পারে, তাহলে তা দেশের জন্য অনেক বড় সুবিধা বয়ে আনবে।
জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী মিশন আমাদের জাতীয় আয়ের একটি অন্যতম খাত। শান্তিরক্ষী এবং বিভিন্ন সরঞ্জামাদি পাঠিয়ে বাংলাদেশ প্রতি বছর প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে। অস্ত্র, সরঞ্জাম, যানবাহন এবং অন্যান্য আইটেমের জন্য জাতিসংঘ কর্তৃক অর্থ পরিশোধ (রিইমবার্সমেন্ট) করা হয়। দেশের অর্থনীতিকে চাঙ্গা রাখতে শান্তিরক্ষীদের দ্বারা অর্জিত আর্থিক সুবিধা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে, যার অন্যতম দাবিদার বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। শান্তিরক্ষীদের পারিশ্রমিক এবং অন্যান্য আর্থিক সুবিধা বৈদেশিক মুদ্রায় প্রদানের ফলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার মজুত বৃদ্ধি করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। শান্তিরক্ষা মিশনের মাধ্যমে বর্তমানে দুই বিলিয়ন কোটি টাকার বেশি রেমিট্যান্স অর্জন করা সম্ভব হচ্ছে।
শান্তিরক্ষী মিশনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অবদান কখনো অস্বীকৃত থাকেনি। অসাধারণ আভিযানিক কর্মকাণ্ডের জন্য বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর শান্তিরক্ষীরা সব মিশনে পুরস্কারস্বরূপ জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মেডেল প্রাপ্ত হয়েছে। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশি সেনাদের অংশগ্রহণের ফলে বিশ্বে বাংলা ভাষার স্বীকৃতি বৃদ্ধি বাংলাদেশের জন্য আরেকটি মাইলফলক। সিয়েরালিয়ন সাংবিধানিকভাবে বাংলা ভাষাকে দ্বিতীয় রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এছাড়াও সেখানে বেশ কয়েকটি স্কুলের নামকরণ করা হয়েছে বাংলাদেশের নাম উল্লেখ করে। আইভরিকোস্টে একটি গ্রামের নাম রাখা হয়েছে রূপসী বাংলা। লাইবেরিয়া, আইভরিকোস্ট, সুদান, দক্ষিণ সুদান, কঙ্গো, মালি ও মধ্য আফ্রিকায় বাংলাদেশের নামে বিভিন্ন সড়কের নামকরণ করা হয়েছে। এসব কিছু বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর শান্তিরক্ষীদের প্রতি উল্লিখিত দেশসমূহের জনগণের ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার বহিঃপ্রকাশ। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর শান্তিরক্ষীদের পেশাদারিত্ব এবং নিষ্ঠার পাশাপাশি বন্ধুত্বসুলভ মনোভাব, আতিথেয়তা এবং মানবিক আচরণের জন্য শান্তিরক্ষা মিশনে সুপরিচিত। জাতিসংঘের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, স্বাগতিক দেশের সরকার এবং আন্তর্জাতিক সামরিক বিশেষজ্ঞরা বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর শান্তিরক্ষীদের অবদানের নিদারুণ প্রশংসা করেছে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কয়েক শত শান্তিরক্ষীকে তাদের সাহসিকতা এবং দক্ষতার জন্য জাতিসংঘ বিভিন্নভাবে পুরস্কৃত করেছে। জাতিসংঘের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অকুণ্ঠ প্রশংসা বাংলাদেশের পতাকাকে বিশ্বের দরবারে আরো সমুন্নত করেছে।
শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে বর্তমান অবস্থানে পৌঁছাতে অনেক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়েছে। মিলিশিয়াদের বৈরী মনোভাব, বিভিন্ন প্রাণঘাতী জীবাণু এবং ভাইরাসের আক্রমণ, শান্তিরক্ষীদের লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ কিংবা আইইডি স্থাপন, দূষিত পরিবেশ, বৈরী আবহাওয়া, ভাষাগত বাধা ইত্যাদি সামাল দিয়ে সামনে অগ্রসর হতে হয়েছে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্যরা দৃঢ়তার সঙ্গে সব বাধা মোকাবিলা করে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের অবস্থান সমুন্নত রেখেছে। এছাড়াও অপর্যাপ্ত প্রশাসনিক এবং আভিযানিক সরঞ্জামের কারণে বাংলাদেশি সেনাদের জাতিসংঘের সরবরাহ সহায়তার ওপর নির্ভরশীল হতে হয়। তথাপিও মানসিক ইচ্ছাশক্তির দ্বারা বাংলাদেশি সেনারা সব সীমাবদ্ধতা জয় করে অর্পিত সব দায়িত্ব আন্তরিকভাবে পালন করে যাচ্ছে।
দুর্দশাগ্রস্ত ও সংঘাতময় এলাকায় শান্তি বজায় রাখার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ‘নীল হেলমেট পরিবারে’ এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। বিশ্ব শান্তিরক্ষায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ভূমিকা সর্বদা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ে প্রশংসিত হয়েছে। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে ধারাবাহিকভাবে নিজেদের সুনাম অর্জন এবং সাফল্য ধরে রাখার এক বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। উল্লেখযোগ্যসংখ্যক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েও বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্যরা তাদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বিশ্বমানবতার সেবায় নিরন্তর কাজ করে যাচ্ছে। লাল-সবুজ পতাকা বুকে ধারণ করে তারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শান্তির দূত হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে। সেনাবাহিনীর শান্তিরক্ষীদের মহান ত্যাগের মাধ্যমে বাংলাদেশ এবং বাংলা ভাষা আজ বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী সর্বদা বিশ্ব জুড়ে শান্তির জন্য অবদান রাখতে সর্বদা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। পেশাদারিত্ব, শৃঙ্খলা, নিরপেক্ষতা প্রদর্শন, আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখা এবং ম্যান্ডেটের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করে কাজ করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী অতুলনীয়। আন্তর্জাতিক এবং বহুমাত্রিক পরিবেশে কাজ করার মাধ্যমে তারা বহুমাত্রিক সক্ষমতা অর্জনেও সক্ষম হয়েছে। এছাড়াও শান্তিপ্রয়াসী এবং সংঘাত-পরবর্তী পুনর্বাসন কার্যক্রম বেগবান করে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী শান্তিরক্ষী মিশনে তাদের অবস্থান আরো সুসংহত করতে বদ্ধপরিকর।
লেখক : বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একজন কর্মকর্তা













