খবরে প্রকাশ, সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজারে এসএসসির নির্বাচনি পরীক্ষায় সাত বিষয়ে অকৃতকার্য হওয়ায় ফরম ফিলাপের অনুমতি না পেয়ে এক শিক্ষার্থী প্রধান শিক্ষকের কক্ষে তালা ঝুলিয়ে দিয়েছে। সংবাদটি পড়লে মনে হতে পারে, এটি হয়তো ক্ষুব্ধ কোনো কিশোরের হঠাৎ রাগের বহিঃপ্রকাশ। কিন্তু একটু গভীরে তাকালেই বোঝা যায়, ঘটনাটি মোটেই আকস্মিক নয়; বরং বর্তমানের নিঠুর বাস্তবতা। এখানে ফেল করা অপরাধ নয়, অপরাধ হলো ফেল মেনে নেওয়া। আর নিয়ম মানা কোনো গুণ নয়, বরং তা একধরনের আত্মসমর্পণ।
সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজারে সাত বিষয়ে ফেল করে এক শিক্ষার্থীর তালা ঝুলিয়ে দেওয়ার এই কাণ্ড নিছক একটি স্কুলঘটিত বিশৃঙ্খলা নয়, এটি একটি ঘোষণাপত্র। এই ঘোষণায় আছে একটি তালা, একটি কক্ষ, কিছু হতবাক শিক্ষক, একজন ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক, যার কক্ষে একজন ফেল করা শিক্ষার্থী তালা লাগিয়ে দেয়, একজন বাবা যিনি যথারীতি কিছুই জানেন না, আর একটি রাষ্ট্রীয় কাঠামো, যা সব দেখেও চোখ বুজে থাকার অনুশীলনে অভ্যস্ত। এই গল্পে শিক্ষার্থী পরীক্ষায় ফেল করেছে ঠিকই, কিন্তু মানসিকভাবে সে অকৃতকার্য নয়। কারণ ফেল করার সংজ্ঞা এখন আর খাতার লাল কালি পর্যন্ত সীমাবদ্ধ নেই। ফেল এখন ব্যাখ্যার বিষয়, তুলনার বিষয়, দরকষাকষির বিষয় এবং দরকার পড়লে তালা দিয়ে প্রমাণ করার বিষয়।
একসময় স্কুল ছিল শিখবার জায়গা। এখন স্কুল হয়ে উঠেছে দরজা আর তালার জায়গা। যার দরজা খুলে যায়, সে পাশ করে, যার দরজা বন্ধ থাকে সে ফেল করে। দরজা যদি বন্ধ থাকে, তাহলে তালা কার হাতে থাকবে, সেটাই মূল প্রশ্ন। শিক্ষার্থীর হাতে যদি তালা থাকে, তাহলে প্রধান শিক্ষকের কক্ষও অনিরাপদ। সাত বিষয়ে ফেল করা একজন শিক্ষার্থী যখন বন্ধুবান্ধব নিয়ে আসে, তখন তার সঙ্গে শুধু খাতা আর কলম থাকে না। থাকে আত্মবিশ্বাস, থাকে তুলনা করার ক্ষমতা, আর থাকে যুক্তি। যুক্তিটি খুব সাধারণ। ওরা যদি পারে, আমি কেন পারব না। এই যুক্তির সামনে পাঠ্যক্রম নতি স্বীকার করে। রেজাল্ট শিট সংকুচিত হয়। নিয়ম বইয়ে থাকে, বাস্তবতায় থাকে না।
এই শিক্ষার্থী নিজের ব্যর্থতাকে ব্যর্থতা হিসেবে মানতে রাজি নয়। কারণ সে দেখেছে ব্যর্থতারও শ্রেণিবিভাগ আছে। দুই বা তিন বিষয়ে ফেল করা একটি সম্মানজনক ব্যর্থতা। সাত বিষয়ে ফেল করা একটু বেশি সত্ ব্যর্থতা। কিন্তু সত্ ব্যর্থতার বাজারমূল্য কম। এখানে দরকার কৌশলগত ব্যর্থতা। যতটুকু ফেল করলে সুযোগ পাওয়া যায়, ঠিক ততটুকু। সাত বিষয়ে ফেল করে সে কৌশলগতভাবে ভুল করেছে। কিন্তু সে ভুল শুধরে নিতে চায়। সংশোধনের পদ্ধতি হিসেবে সে বেছে নিয়েছে তালা।
তালা দেওয়ার ঘটনা শুনে অনেকে ভাবতে পারেন, এটি রাগের বহিঃপ্রকাশ। আসলে এটি একটি আবেদনপত্র। মৌখিক আবেদন, লিখিত আবেদন, সুপারিশ এসবের পরও যখন কাজ হয় না, তখন তালা একটি দৃশ্যমান আবেদন। এটি প্রশাসনিক ভাষায় বলা যায়—একধরনের বিকল্প যোগাযোগ পদ্ধতি। যেখানে শব্দের বদলে লোহা কথা বলে। তালার শব্দে একটি বার্তা থাকে। আপনি যদি দরজা বন্ধ করেন, আমিও দরজা বন্ধ করব। আপনি যদি সুযোগ না দেন, আমিও অবকাশ দেব না।
শিক্ষকরা প্রতিবাদ করেছেন। প্রতিবাদ করা এখন শিক্ষকদের একটি অতিরিক্ত কারিকুলাম। পাঠদানের পাশাপাশি প্রতিবাদ সহ্য করা, অসদাচরণ মেনে নেওয়া, এবং সবশেষে বিষয়টি ছেড়ে দেওয়া। ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক প্রতিবাদ করেছিলেন। তার প্রতিবাদে কোনো নম্বর যোগ হয়নি। বরং তার কক্ষের দরজায় একটি তালা যোগ হয়েছে। এটি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার একটি নতুন মূল্যায়ন পদ্ধতি। যেখানে শিক্ষক নয়, শিক্ষার্থী শিক্ষককে ক্লাসরুমে আটকে রাখতে পারে।
শিক্ষার্থীর বক্তব্যটি খুবই আধুনিক। তিনি বলেছেন, ‘দুই-তিন বিষয়ে যারা ফেল করেছে তাদের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। আমরা সাত বিষয়ে ফেল করেছি, আমাদের কেন দেওয়া হবে না। এটি সমতার দাবি। এটি বৈষম্যবিরোধী অবস্থান।’ তিনি সংখ্যার ভিত্তিতে বঞ্চিত হতে চান না। তার কাছে ফেল করা মানেই ফেল করা। সংখ্যা বড় বা ছোট হওয়া এখানে অপ্রাসঙ্গিক। এই যুক্তি যদি উচ্চশিক্ষায় প্রয়োগ করা হয়, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় নতুন ধারা চালু হতে পারে। যারা কম নম্বর পেয়ে ভর্তি হয়েছে, তারা যদি পারে, যারা আরো কম পেয়েছে তারা কেন পারবে না।
এই শিক্ষার্থীর বাবার ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি স্থানীয়ভাবে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। কিন্তু তিনি কিছুই ‘জানেন না।’ জানার এই অজ্ঞতা আমাদের সমাজে একটি প্রতিষ্ঠিত অবস্থান। ‘কিছু জানি না’ বলা মানে সব জানার দায় থেকে মুক্তি। ‘যদি ছেলে এমন কাজ করে থাকে, তাহলে সেটি নিন্দনীয়।’ এই বাক্যে একটি সম্ভাবনা আছে। যদি করে থাকে। এখানে নিশ্চিতকরণ নেই। ছেলে তালা দিয়েছে, শিক্ষক বলেছেন, প্রত্যক্ষদর্শী বলেছেন, কিন্তু বাবার জ্ঞানে এখনো এটি সম্ভাবনার পর্যায়ে। রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকার ফলে এই সম্ভাবনাকে দীর্ঘদিন সম্ভাবনা হিসেবেই রাখা যায়।
জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার বক্তব্যটি আরো পরিপূর্ণ। তিনিও কিছুই জানেন না বলেছেন। তবে যদি কেউ সন্ত্রাসী কাজ করে, আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হলে তিনি সরকারকে জানাবেন। এখানে একটি শর্ত আছে। আগে কেউ আইনগত ব্যবস্থা নিক। তারপর তিনি জানবেন। এই বক্তব্যে দায়িত্ব একটি বৃত্তে ঘোরে। স্কুল বলবে শিক্ষা অফিসে, শিক্ষা অফিস বলবে আইনগত ব্যবস্থা নিলে জানাব। আইন বলবে অভিযোগ আসেনি। অভিযোগ বলবে তালা খুলে দেওয়া হয়েছে। তালা খুলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ঘটনাটি ইতিহাসে পরিণত হয়।
এই ঘটনার মাধ্যমে আমরা একটি নতুন শিক্ষা পেয়েছি। পরীক্ষায় ফেল করার চেয়ে নিয়মে ফেল করা বেশি কষ্টের। নিয়ম মানতে না পারা এখন ব্যর্থতা নয়, বরং প্রতিবাদের ভাষা। যে নিয়ম মানে সে দুর্বল। যে নিয়ম ভাঙে সে সাহসী। তালা দেওয়ার মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থী দেখিয়ে দিয়েছে সে আর কেবল ছাত্র নয়। সে একজন দরকষাকষিকারী নাগরিক। তার দাবি আছে, তার তুলনা আছে, তার বন্ধুরা আছে।
এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে, বলা হয়। চাঞ্চল্য শব্দটি খুব নরম। এটি এমন একটি শব্দ যা দিয়ে বড় অসংগতি ঢেকে রাখা যায়। আসলে এলাকাবাসী অবাক হয়নি। তারা অভ্যস্ত। তারা জানে এখন আর ফেল মানেই ফেল নয়। ফেল মানে আলোচনার শুরু। আলোচনার ফলাফল অনিশ্চিত, কিন্তু আলোচনা না করলে সুযোগ নিশ্চিতভাবে পাওয়া যাবে না।
এই গল্পে সবচেয়ে নিরীহ চরিত্র সম্ভবত তালা। তালা কোনো রাজনীতি করে না। তালা কোনো ফেল-পাশ বোঝে না। তালা শুধু বন্ধ করে। কিন্তু তালাকে ব্যবহার করে মানুষ। আজ সে তালা দিয়ে একটি কক্ষ বন্ধ করেছে। কাল হয়তো সে তালা দিয়ে নিয়ম বন্ধ করবে। পরশু হয়তো সে তালা দিয়ে যুক্তি বন্ধ করবে। তালা আমাদের সমাজে দ্রুত একটি প্রতীকে পরিণত হচ্ছে। তালা মানে ক্ষমতা। যার হাতে তালা, তার হাতে দরজা।
সাত বিষয়ে ফেল করা এই শিক্ষার্থী হয়তো পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়েছে, কিন্তু সমাজ পরীক্ষায় সে পুরোপুরি প্রস্তুত। সে জানে কোথায় চাপ দিতে হয়। সে জানে কীভাবে তুলনা টানতে হয়। সে জানে কীভাবে বন্ধু জোগাড় করতে হয়। সে জানে বাবা কিছু জানেন না বললে পরিস্থিতি হালকা হয়। সে জানে কর্মকর্তারা না জানলে বিষয়টি ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায়।
এই ঘটনা আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার একটি আয়না। আয়নায় আমরা দেখি পরীক্ষার ফল নয়, বরং মনোভাবের ফলাফল। এখানে কেউ পাশ করে না, কেউ ফেল করে না। এখানে সবাই শুধু দরজা খোঁজে। কেউ দরজা পেলে খুশি, কেউ দরজা না পেলে তালা লাগায়।
শেষ পর্যন্ত তালা খুলে দেওয়া হয়েছে। এই বাক্যটি খুব আশ্বস্ত করে। তালা খুলে দেওয়া হয়েছে মানে সমস্যা শেষ। কিন্তু আসলে তালা খুলে গেছে, তালা দেওয়ার মানসিকতা খোলা হয়নি। সেটি থেকে গেছে। সেটি অপেক্ষা করছে পরের পরীক্ষার, পরের দরজার, পরের কক্ষের জন্য।
সুনামগঞ্জের এই স্কুলে হয়তো আবার নিয়মিত ক্লাস হবে। শিক্ষকরা পড়াবেন। শিক্ষার্থীরা শুনবে। কেউ ফেল করবে, কেউ পাশ করবে। কিন্তু এই একটি তালা আমাদের মনে দীর্ঘদিন ঝুলে থাকবে। মনে করিয়ে দেবে যে, আমরা এমন এক সময়ের মধ্যে আছি, যেখানে সাত বিষয়ে ফেল করাও দরকষাকষির বিষয়, আর তালা হয়ে উঠেছে যুক্তির শেষ অধ্যায়।













