মানুষের জ্ঞানলাভের ইতিহাসে সময় ও দূরত্ব একদা ছিল অতিক্রমণযোগ্য দেয়াল। এক গ্রাম হইতে আর-এক গ্রামে কী ঘটিল, তাহা জানিবার জন্য সপ্তাহ পার হইয়া যাইত। পাশের জনপদে কোনো রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ঘটিলেও বহু মানুষ অনেক ক্ষেত্রেই তাহা না-জানিয়াই থাকিত। ইতিহাসের পাতায় যাহাকে আমরা আজ ‘বড় ঘটনা’ বলিয়া চিহ্নিত করি, তাহার বহু অংশই সমকালীন সাধারণ মানুষের নিকট ছিল নিঃশব্দ, নীরব। রাজা পতিত হইয়াছেন, রাজ্য দখল হইয়াছে, ধর্মযুদ্ধ শুরু হইয়াছে—এই সমস্তই বহু শতাব্দী ধরিয়া ঘটিয়াছে এমনভাবে, যাহার অভিঘাত সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন চেতনাকে স্পর্শ করিতে পারে নাই।
কিন্তু সময় বদলাইয়াছে। প্রযুক্তির কল্যাণে আজ পৃথিবী সংকুচিত হইয়া এক মুহূর্তের দূরত্বে আসিয়াছে। মধ্যপ্রাচ্যের এক প্রান্তে গোলা পড়িলে, পূর্ব এশিয়ার এক নাগরিক তাহার ভিডিও দৃশ্য দেখিতে পায় কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে। লোহিত সাগরের জলপথে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা হইলে, ইউরোপের বাজারে মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কা মুহূর্তেই আলোচনার কেন্দ্রে উঠে আসে। সুদূর আফ্রিকার সাহেল অঞ্চলে সামরিক অভ্যুত্থান ঘটিলে, তাহার অভিঘাত অভিবাসন নীতিতে কাঁপন তোলে প্যারিস ও বার্লিনে। এই যে তাৎক্ষণিক জানিবার ক্ষমতা—ইহা কেবল প্রযুক্তিগত সুবিধা নহে, ইহা মানবচেতনার কাঠামোকেই আমূল রূপান্তর করিতেছে। আজ একজন সাধারণ মানুষ ঘুম ভাঙিয়াই জানিতে পারে—কোথাও গৃহযুদ্ধ তীব্রতর হইতেছে, কোথাও অর্থনীতি ভাঙিয়া পড়িতেছে, কোথাও সামরিক মহড়ার ভাষা ক্রমে যুদ্ধের দিকে ঝুঁকিতেছে। ইরানের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা, ইউক্রেন-রাশিয়া সংঘাত, ইসরায়েল-ফিলিস্তিন রক্তপাত, তাইওয়ান প্রশ্নে শক্তির প্রদর্শন, ভেনেজুয়েলার বিপর্যয়, সুদানের মানবিক ট্র্যাজেডি—এই সমস্তই আজ আর ‘বিদেশের খবর’ বলিয়া দূরে সরাইয়া রাখিবার উপায় নাই। কারণ সংবাদ এখন কেবল জানায় না—একইসঙ্গে সে মানসিক ভার বহন করায়।
ইহাই আমাদের সময়ের দার্শনিক দ্বন্দ্ব। একদিকে জ্ঞানের সর্বব্যাপী বিস্তার—অন্যদিকে সেই জ্ঞানের ভার বহনের অক্ষমতা। মানুষ জানিতেছে আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বহু বেশি, কিন্তু সেই জানিবার সঙ্গে সঙ্গে কী করিবে—সেই প্রশ্নের উত্তর আজ অস্পষ্ট। আগে অজ্ঞানতা ছিল নিয়তির অংশ, এখন অতিমাত্রায় সংবাদের স্রোত অনেক সময় মানসিক ক্লান্তির কারণ হইয়া উঠে। এই কারণে একেকটি সংকট এখন আর কেবল ঐ নির্দিষ্ট অঞ্চলের সমস্যা থাকিতেছে না—তাহারা একত্র হইয়া মানুষের চেতনাকে ক্রমাগত উৎকণ্ঠার মধ্যে রাখিতেছে। ইতিহাসে সাধারণ মানুষ যুদ্ধের সিদ্ধান্ত নিত না, কূটনীতির হিসাব রাখিত না। আজ সে ভোট দেয়, মত প্রকাশ করে, সামাজিক মাধ্যমে প্রতিক্রিয়া জানায়। যখন বিশ্বসংকটের সংখ্যা বাড়ে, তখন ব্যক্তি মানুষ নিজের সামান্য জীবনের উপর নিয়ন্ত্রণ হারাইবার ভয় অনুভব করে।
তবু এই অবস্থার এক ইতিবাচক দিকও আছে। যাহা নীরবে ঘটিয়া যাইত, আজ তাহা নথিভুক্ত হয়। যাহা চাপা পড়িয়া থাকিত, আজ তাহা আলোচনায় উঠিয়া আসে। রাষ্ট্রক্ষমতার গোপন সিদ্ধান্ত, সামরিক আগ্রাসন, মানবাধিকার লঙ্ঘন—সবকিছুই এখন আগের তুলনায় বেশি দৃশ্যমান। বিশ্বজনমত নামক এক বিমূর্ত শক্তি জন্ম লইয়াছে, যাহা অনেক সময় রাষ্ট্রকেও ব্যাখ্যা দিতে বাধ্য করে। কিন্তু এই বিশ্বজনমত তখনই অর্থবহ, যখন তাহার সঙ্গে বিবেক যুক্ত থাকে। শুধু জানা যথেষ্ট নহে; জানা বিষয়কে বুঝিবার ধৈর্য, বিশ্লেষণের সক্ষমতা এবং আবেগের উপর যুক্তির নিয়ন্ত্রণও প্রয়োজন। নচেৎ বিশ্বসংবাদ কেবল আতঙ্ক উৎপাদনের যন্ত্রে পরিণত হয়।
আজকের পৃথিবী এক অদ্ভুত যুগসন্ধিক্ষণে দাঁড়াইয়া আছে। সংকট বহু, তথ্য তার চাইতেও বেশি। মানুষ ইতিহাসের আর কেবল নীরব দর্শক নহে—সে সাক্ষী, সমালোচক, কখনো অভিযুক্তও। এই নূতন অবস্থানে দাঁড়াইয়া প্রশ্ন উঠিতেছে—আমরা কি জানিবার দায়িত্বটুকুই পালন করিব, না কি জানিবার সঙ্গে সঙ্গে উহা লইয়া চিন্তা করিবার সাহসও অর্জন করিব? সম্ভবত ভবিষ্যৎ ইতিহাস আমাদের বিচার করিবে এই প্রশ্নের উত্তর দিয়াই। কারণ বিবেকহীনভাবে অনেক কিছু জানিলে তাহা আমাদের মুক্তি দিবে না। এইজন্য এই যুগসন্ধিক্ষণে বিবেক জাগ্রত রাখা এই জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।













