বাংলাদেশে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মেয়াদ প্রায় শেষের দিকে। সরকারের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সফলতা বা ব্যর্থতা নিয়ে নানা বিতর্ক থাকলেও তারা কাঠামোগত কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ভিত্তি গড়ে তুলতে পেরেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত হলো ‘জাতীয় জুলাই সনদ’, যার বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশের রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও পরিবেশ অঙ্গনে একটি নতুন গুণগত রূপান্তরের সম্ভাবনা তৈরি হবে বলে সুধীজনদের অভিমত।
গণতন্ত্রের সৌন্দর্য রক্ষা করতে গেলে নির্বাচনের কোনো বিকল্প নেই, এই সত্য উপলব্ধি করেই রাজনৈতিক মাঠে এখন নির্বাচনি হাওয়া বইছে। জোট গঠন, ভোটের অঙ্ক, মেরুকরণ—এসবই এখন টকশো থেকে চায়ের দোকান পর্যন্ত আলোচনার প্রধান বিষয়। ফলে এই মুহূর্তে কোনো মহলেই তাত্ত্বিক আলাপ বা রাষ্ট্রদর্শন নিয়ে ভাবার সময় নেই বললেই চলে।

তার পরও ভুলে গেলে চলবে না, জুলাই অভ্যুত্থানের অন্যতম ম্যান্ডেট ছিল বাংলাদেশপন্থার ভিত্তিতে জাতীয় সম্মতি প্রতিষ্ঠা করা; একটি আত্মনির্ভর রাষ্ট্রীয় ও সাংস্কৃতিক দর্শন, যা বহিঃশক্তির প্রভাবমুক্ত থেকে নিজেদের আদর্শ, সংস্কৃতি ও সক্ষমতার ওপর দাঁড়ানোর অঙ্গীকার করে। ইতালীয় দার্শনিক অ্যান্টোনিও গ্রামসি তার ‘কালচারাল হেজিমনি’ তত্ত্বে দেখিয়েছিলেন, কোনো রাষ্ট্রকে নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো—ধারণা ও সংস্কৃতির মাধ্যমে আধিপত্য স্থাপন। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, এই সাংস্কৃতিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার লড়াই চলতে চলতেই সমাজতন্ত্র ও পুঁজিবাদের ঠান্ডা যুদ্ধ ১৯৯০ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের মাধ্যমেও থামেনি।
২১ শতকের শুরুতে বৈশ্বিক নয়া রাজনীতির উত্থানের সঙ্গে শুরু হয় মালটিপোলার ব্যবস্থার বিস্তার। সমাজতন্ত্র গণতন্ত্রের এই বায়ো-পোলার হেজিমনির পরিবর্তে তৈরি হয় বহুশক্তির বলয় এবং গড়ে ওঠে বহুমাত্রিক সাংস্কৃতিক হেজিমনি। বর্তমান সময়ের ডিপ স্টেটগুলো মোড়ল রাষ্ট্রে পরিণত হয়ে অপেক্ষাকৃত দুর্বল রাষ্ট্রগুলোর ভেতরে নিজেদের সংস্কৃতি ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে।
২৪-পরবর্তী বাংলাদেশের আকাঙ্ক্ষা তাই স্পষ্ট; নিজস্ব আদর্শ ও সংস্কৃতির শক্তিতে এই বহিঃশক্তির সাংস্কৃতিক আধিপত্যকে প্রতিহত করা। শক্তিধরদের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে এই প্রত্যাশা মূলত অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশপন্থার ওপর ভিত্তি করে একটি আত্মনির্ভর সাংস্কৃতিক দর্শন নির্মাণ ছিল ২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের অঘোষিত ম্যান্ডেট। যদিও একীভূত জাতি গঠনের পথে ‘বিভাজন’ সব সময়ই আমাদের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
২৪-পরবর্তী সময়ে তরুণ-প্রবীণ রাজনৈতিক কর্মী, বুদ্ধিজীবী এবং সচেতন নাগরিকেরা আবারও বাংলাদেশপন্থার মন্ত্রে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিলেন। কিন্তু নির্বাচনের আগমুহূর্তে আবারও ডিপ স্টেট ও বহিঃশক্তির গোপন প্রভাবের আশঙ্কা ক্রমশ বাড়ছে, যা জাতীয় ঐক্যের জন্য গুরুতর হুমকি! ২৪-এর গণঅভ্যুত্থানে সবাই এক ছাতার নিচে এসে বাংলাদেশপন্থার স্লোগান তুলেছিল; এখন যদি দলীয় স্বার্থে জাতীয় স্বার্থ বিসর্জন দেওয়া হয়, তাহলে ইতিহাস আবারও নিজের পুনরাবৃত্তি ঘটাবে।
ইতিহাস বলে, ৭১-পরবর্তী বাংলাদেশে আওয়ামী রাজনীতিকে ‘ভারতপন্থি’ আর বিরোধী রাজনীতিকে ‘পাকিস্তানপন্থি’ তকমা দেওয়ার সংস্কৃতি একীভূত জাতি গঠনের পথে অন্তরায় ছিল। ফলে ৭১-এর বিজয় সংকুচিত হয়ে পড়ে। ২৪-এ এসে আওয়ামী রাজনীতির প্রভাব হয়তো রাজনৈতিকভাবে দমন করা গেছে, কিন্তু মানসিকভাবে বা বিশ্বাসের জায়গায় কতটা পরিবর্তন এসেছে; সেটাই বড় প্রশ্ন। দলমত নির্বিশেষে বাংলাদেশপন্থায় বিশ্বাস স্থাপন না হলে ২৪-ও ৭১-এর মতো বিভাজনের শিকার হবে, সন্দেহ নেই। আজকের বাংলাদেশ ৫৪ বছরের একটি রাষ্ট্র, যে নিজের রাজনৈতিক আদর্শ ও সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করতে চায় এবং বহিঃবিশ্বের সাংস্কৃতিক আধিপত্য থেকে মুক্ত হতে চায়। তাই রাজনীতিকে ক্ষমতার নয়, নীতির রাজায় পরিণত করতে হবে।













