আমরা কি এমন এক পৃথিবীতে বাস করছি না, যেখানে যুদ্ধ ও সংঘাতের প্রবণতা ক্রমশ বাড়ছে? ২০২৫ সালের কথাই যদি ধরি, আমরা কি সংঘাত থেকে দূরে সরে আসার কোনো পদক্ষেপ দেখেছি বছরটিতে? বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে যা হচ্ছে, তার সমাধান এবং প্রতিরোধের দিকে কতটা গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে? এ ধরনের নিম্নমানের সংঘাত ব্যবস্থাপনা দিয়ে কি যুদ্ধের মীমাংসা হতে পারে?
বর্তমানে বিশ্বব্যাপী সব মিলিয়ে প্রায় ১২২ মিলিয়ন মানুষ যুদ্ধ, নিপীড়ন বা দুর্যোগের কারণে বাস্তুচ্যুত। এটা যে সংঘাতের ভয়াবহতার ইঙ্গিত, সে কথা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। কারণ, প্রমাণ রয়েছে চোখের সামনে—মধ্যপ্রাচ্যের দিকে তাকান। চলতি বছর, তথা ২০২৫ সালে ইরানের ওপর এক নজিরবিহীন বড় আকারের হামলা চালিয়ে বসে ইসরাইল, যা থেকে শেষ পর্যন্ত দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধ লেগে যায়। আর সেই যুদ্ধ টেনে আনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকেও। অবস্থাদৃষ্টে, নতুন বছর ’২৬-এ আরেক দফা ইরান-ইসরাইল যুদ্ধের আশঙ্কা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে।
এদিকে, ’২৪ সালের নভেম্বরে লেবাননের যুদ্ধবিরতি শেষ হয়ে গেছে। গাজার মাটিতে ইসরাইলি গণহত্যা ধীর হয়ে গেছে বটে, কিন্তু তা শেষ হয়৪নি। অন্যদিকে আবার, থেমে থেমে আগুন জ্বলে উঠছে সুদানে। দেশটি সম্পূর্ণরূপে যুদ্ধরত দুটি গোষ্ঠীর মধ্যে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। এর ফলে সুদানের বেশির ভাগ মানুষ এক ভয়াবহ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে, যা খার্তুমকে বিশ্বের সবচেয়ে খারাপ মানবিক সংকটের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।
এসব সংঘাতের কারণ কী? প্রথমেই জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি স্বীকার করতে হবে। অন্যদিকে, ‘অর্থনৈতিক পরিস্থিতি’ বিভিন্ন শক্তিকে সামরিক শক্তিমত্তা প্রদর্শন করার রসদ জোগাচ্ছে। এর মধ্যে আবার অনেক সমাজ আরো গভীর মেরুকরণের রাজনীতির মধ্যে ঢুকে বিভক্ত হয়ে পড়ছে। এমন একটি পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্য যেন টালমাটাল।
ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর প্রশাসন এ বছর মধ্যপ্রাচ্যের পাঁচ পাঁচটি রাজধানী শহরে বোমা হামলা চালিয়েছে। অথচ এসব ক্ষেত্রে সৃষ্ট অস্থিরতা মিটমাট করতে চোখে পড়েনি তেমন কূটনৈতিক পদক্ষেপ। অথচ ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার খারাপ পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে কূটনীতি বা সমঝোতা কতটা ফলপ্রসূ ভূমিকা রেখেছে, তা সবাই দেখেছেন। যদিও ‘কূটনীতি’ সংঘাতকে কেবল সীমিত করে, কিন্তু শেষ করতে পারে না।
যুদ্ধের মধ্যে দাঁড়িয়ে ‘শান্তি প্রতিষ্ঠার শিল্প’ নিয়ে সেভাবে আলোচনা করা দুষ্কর। তবে ডোনাল্ড ট্রাম্প নোবেল শান্তি পুরস্কারের লোভেই হোক কিংবা নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি রক্ষার প্রশ্নে, যুদ্ধ থামাতে তিনি লেনদেনমূলক পদ্ধতির মাধ্যমে কিছু চুক্তি সম্পন্ন করেছেন। এক জন চুক্তিকারী বা শান্তি প্রতিষ্ঠাকারী হিসেবে ট্রাম্পের ক্ষমতার ওপর অগাধ আস্থা রয়েছে অনেকের। শান্তি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তার দৃষ্টিভঙ্গি অতি-ব্যক্তিগত। শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিদের চোখে চোখ রেখে কথা বলতে পারেন তিনি। তবে তিনি স্পষ্টতই হামাসের সঙ্গে সেটি করে দেখাতে পারেননি। নিজের প্রথম মেয়াদে ট্রাম্প উত্তর কোরিয়ার নেতার সঙ্গে সাক্ষাত্ করেছিলেন। মার্কিন প্রেসিডেন্টের এরকম মুখোমুখি আলোচনায় বসার স্পৃহা সংঘাত নিরসনে বেশ কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে আগামী দিনগুলোতে।
অন্য অনেকের চেয়ে ট্রাম্প যেখানে আলাদা, সেটা হলো, তিনি কল্পিত নতুন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে (নিউ ওয়ার্ল্ড অর্ডার) ঘৃণার চোখে দেখেন। কিছু আন্তর্জাতিক আইনকে উপেক্ষা করেন, স্বীকৃতি দিতে চান না। বরং এসব থেকে তিনি ওয়াশিংটনকে দূরে রাখতে চান। এসব কারণে ২০২৫ সালে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বা সংস্থা প্রত্যাশিত মার্কিন তহবিল পায়নি। অথচ যে যাই যুক্তি দেখান না কেন, এসব প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন এখনো ফুরিয়ে যায়নি।
হোয়াইট হাউজ বর্তমানে গাজা শান্তি পরিকল্পনা নিয়ে যে মনোভাব পোষণ করছে, তা খুবই অস্পষ্ট এবং হালকা। এটা ট্রাম্পের শক্তি কিংবা দুর্বলতা উভয়ই হতে পারে। তবে অস্পষ্টতার কারণে ইসরাইল এবং হামাসের মধ্যে এই মতৈক্যের পরিবেশ সৃষ্টি হচ্ছে তো, এই ভেঙে যাচ্ছে, উভয় পক্ষ তর্কবিতর্কে জড়িয়ে পড়ছে।
ইউক্রেনে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য ট্রাম্প-ঘোষিত ২৮ দফা পরিকল্পনার ক্ষেত্রেও একই কথা বলা যায়। এটা যেন ট্রাম্পের চুক্তি করার এক নব্য-ধারণা। মনে হচ্ছে, তিনি নমনীয় আচরণ শিখে গেছেন! কারণ, ইউক্রেন এবং প্রধান ইউরোপীয় শক্তিগুলোর সঙ্গে আলাপ-আলোচনার পর ২৮ দফা ১৯ দফায় নেমে এসেছে!
গণহত্যার অভিযোগ নিয়ে যদি কথা বলতে হয়, তাহলে তাকাতে হবে দুই সংঘাতপ্রবণ অঞ্চল গাজা এবং সুদানের দিকে। এ দুই ভূখণ্ডে ব্যাপক গণহত্যা চালানোর অভিযোগ উঠেছে। উভয় সংঘাতই ব্যাপক মানবিক বিপর্যয় এবং দুর্ভিক্ষ বয়ে এনেছে। দুঃখজনকভাবে এসব ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া প্রায় নেই বললেই চলে কিংবা তা দুঃখজনকভাবে অকার্যকর। শান্তি প্রচেষ্টায় ফিলিস্তিন বা সুদান কেউই একটি অর্থপূর্ণ অংশগ্রহণের পথে হাঁটছে না।
ফিলিস্তিন সংঘাত প্রতিরোধ করা উচিত ছিল। তাতে করে হয়তো-বা এর সমাধান করা যেত। অথচ সে ধরনের উদ্যোগ চোখে পড়ছে না। গাজা বা ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড কীভাবে পরিচালিত হবে, সে বিষয়েই নেই কার্যকর পরিকল্পনা। গাজা উপত্যকায় সব ধরনের বিদেশি সাহায্যের পাইপলাইনের নিয়ন্ত্রণ এখনো ইসরাইলের হাতেই রয়ে গেছে, যার ফলে তেল আবিব এটা নিজের ইচ্ছামতো বন্ধ বা হ্রাস করতে পারে। তাহলে গাজা যুদ্ধের মীমাংসা কতটা হলো?
তেল আবিব গাজার ওপর একটি নব্য ঔপনিবেশিক কাঠামো চাপিয়ে দিয়েছে। জাতিসংঘের সংস্থাগুলোকে কেবল সাহায্য বিতরণকারী হিসেবে সীমাবদ্ধ করে রাখা হয়েছে। সংঘর্ষ-পরবর্তী পরিস্থিতির উত্তরণে তাদের দীর্ঘমেয়াদি অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো হচ্ছে না। দাবি করা হয়েছিল যে, ব্যাপক ‘গাজা পরিকল্পনা’ হাতে নেওয়া হয়েছে, কিন্তু এখন ঠিকই বোঝা যাচ্ছে, এটা ছিল কেবল কথার কথা! এ অবস্থায় ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ যেন নেহাত নিষ্ক্রিয় দর্শক হয়ে উঠেছে। আঞ্চলিক এবং ইউরোপীয় উভয় শক্তিই এই অবস্থাকে ঝাঁকুনি দেওয়ার চেষ্টা করেছে বটে, কিন্তু তাতে খুব একটা সাফল্য আসেনি।
গাজায় যেভাবে ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়েছে এবং তার ফলে যেভাবে গাজার অবকাঠামো মাটির সঙ্গে মিশে গেছে, সেই নাজুক অবস্থার উত্তরণ ঘটানো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একার পক্ষে সম্ভব নয় স্বাভাবিকভাবেই। আশা করি, হোয়াইট হাউজ বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে সমন্বয় ও সহযোগিতার ভিত্তিতে কাজ করবে। এ ধরনের বড় সংঘাতে যেন ওয়াশিংটনকে টেনে আনা না হয়, সেদিকে যেমন ট্রাম্পকে দৃষ্টি দিতে হবে, তেমনিভাবে আরো ভালো কৌশল গ্রহণের পাশাপাশি রাখতে হবে ধৈর্য। মনে রাখা দরকার, যুদ্ধ ২৪ ঘণ্টার মধ্যে শেষ হওয়ার জিনিস নয়।
গাজায় তো ‘একটা ব্যবস্থা’ হয়েছে, কিন্তু সুদানের কী হবে? এখানে দুই পক্ষের কেউই সমাধানের পথে হাঁটতে চাইছে না। বরং উভয় পক্ষের প্রধানই বিশ্বাস করেন যে, তারা জয়লাভ করবেন। এ কারণে সংঘাত ভিন্ন অন্য কিছু সুদানে এখন চিন্তারও বাইরে!
গাজা, সুদান কিংবা লেবানন বা অন্য যে কোনো সমস্যাসংকুল অঞ্চলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যদি সত্যি সত্যিই সংঘাতের অবসান ঘটাতে চায়, তাহলে তাদের যথেষ্ট সময়, সাহস, শক্তি এবং সম্পদ বিনিয়োগ করতে হবে। সর্বোপরি, ফিরিয়ে আনতে হবে কূটনৈতিক পদক্ষেপ আর তার জন্য প্রয়োজন সঠিক পরিকল্পনা ও সাহস।
-
আরব নিউজ থেকে নেওয়া (ইংরেজি থেকে অনূদিত)













