মানব শরীরের অন্যতম জটিল রোগ হলো ক্যানসার। বলা হয়, এই জীবনঘাতী রোগের চিকিৎসা সময়মতো করাতে না পারলে আক্রান্ত রোগীর মৃত্যু অনেকটাই অনিবার্য। একসময় ক্যানসারের নাম শুনলেই সবাই ভয়ে আঁতকে উঠতেন। এর প্রধানতম কারণ ছিল অসাধ্য চিকিত্সা এবং দেশে ক্যানসারের ওষুধের সহজলভ্যতা বা প্রাপ্যতা না থাকা। একই সঙ্গে দেশের বাইরে থেকে ভিন্ন পথে আসা ক্যানসারের ওষুধের অতিরিক্ত দাম বা উচ্চমূল্য। ফলে ক্যানসারের চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় ওষুধের জন্য প্রতিবেশী বাইরের দেশের দিকে সবসময় তাকিয়ে থাকতে হতো। কিন্তু সময় বদলে গেছে। দেশের শীর্ষ ওষুধ প্রস্ততকারী প্রতিষ্ঠানগুলো এখন ক্যানসারের অমূল্য সব ওষুধ দেশেই উৎপাদন করছে।
ওষুধ প্রস্ততকারী প্রতিষ্ঠান, চিকিৎসক এবং সরকারের সমন্বিত উদ্যোগের কারণে ক্যানসার নিয়ে যে বিশাল ভীতি ছিল তা অনেকটাই কমে এসেছে। দেশের অভ্যন্তরেই ক্যানসার প্রতিরোধে স্বল্পদামে নতুন নতুন ওষুধ তৈরি হওয়ার কারণে মানুষের মধ্যে আস্থা ও স্বস্তি দুইই বেড়েছে। প্রথমত: দেশে উত্পাদিত ওষুধগুলোর উচ্চমান বিদেশেও এখন প্রশংসিত হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, ক্যানসারের ওষুধ সুলভ মূল্যে বাজারে পাওয়ার পরিবেশ তৈরি হওয়া। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ক্যানসার সাপোর্টিভ কেয়ারের একটি অত্যবশ্যকীয় ওষুধ পেগফিলগ্রাসটিম একসময় ৪০ হাজার টাকার উপরে দাম ছিল। এখন দেশেই উত্পাদিত হওয়ার কারণে এই ওষুধ মাত্র ৩ থেকে সাড়ে ৩ হাজার টাকায় সুলভ মূল্যে পাওয়া যাচ্ছে। অন্য কেমোথেরাপির ওষুধগুলোও দেশে তৈরি হচ্ছে এবং এর মূল্য সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যেই রয়েছে। এতে করে রোগীরা এখন ওষুধের উচ্চমূল্যের জন্য চিকিত্সা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে না। এত কম দামে বা নাগালের মধ্যে ক্যানসারের ওষুধ পাওয়া যাবে—এটি ছিল একসময় কল্পনার বাইরে। কিন্তু ওষুধ কোম্পানিগুলোর মানুষের জীবন নিরাপত্তা ও সুরক্ষায় বড় প্রভাব রাখছে।
আবার ক্যানসারের বিরুদ্ধে লড়াই করার সেরা চিকিৎসা ইমিউনোথেরাপি একসময় বাংলাদেশে সহজলভ্য ছিল না। দেশের বাইরে গিয়ে এই চিকিত্সা নিতে হতো। খরচও হতো অনেক বেশি। এখন দেশের ফার্মাসিউটিক্যালস কোম্পানিগুলো এই ওষুধ দেশেই উত্পাদন ও সহজলভ্য করেছে। চিকিত্সকরা বলছেন, এ ধরনের ওষুধ উত্পাদনে বাংলাদেশ রীতিমতো ইতিহাস সৃষ্টি করেছে। হাতের নাগালে না থাকার কারণে একসময় এসব ওষুধের জন্য আক্রান্ত রোগীদের প্রচুর অস্বস্তিকর সময় ব্যয় করতে হয়েছে। দেশের দুই শীর্ষ ওষুধ প্রস্তুত কোম্পানি ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালস লি. এবং বীকন এই ধরনের ওষুধ অনেক কম দামে বাজারে এনেছে। আবার এ সব ওষুধ তৈরির ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক নিয়মকানুন বা প্রটোকল সঠিকভাবে মানা হয়। ক্যানসার আক্রান্ত রোগীর চিকিত্সায় ওষধের প্রাপ্যতা যে কোনো সময়ের তুলনায় অনেক বৃদ্ধি পাওয়ায় আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে বিদেশে গিয়ে চিকিত্সা নেওয়ার প্রবণতাও অনেক কমে এসেছে।
ক্যানসার বিশেষজ্ঞরা বিভিন্ন সময়ে মিডিয়া এমন কথাও বলেছেন, ‘আমি দায়িত্ব নিয়ে বলতে পারি, আমাদের বাংলাদেশেই বিশ্বমানের ক্যানসার চিকিত্সা রয়েছে। ক্যানসার চিকিত্সায় বিভিন্ন মডালিটির মধ্যে সার্জারিটাই বেশি ফলপ্রসূ। এরপর আছে কেমোথেরাপি, রেডিওথেরাপি, অ্যান্টিবডি ট্রিটমেন্ট ও ইমিউনোথেরাপি। তবে অনেক ক্ষেত্রে কিছুই লাগে না, শুধু হরমোন চিকিত্সাতেই ভালো ফল হয়।’
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, বাংলাদেশে বছরে ১ লাখ ৬৭ হাজার ২৫৬ জন ক্যানসারে আক্রান্ত হচ্ছে। আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে পুরুষের সংখ্যা বেশি। বছরে ক্যানসারে মারা যাচ্ছে ১ লাখ ১৬ হাজার ৫৯৮ জন। বিশ্বে যত মৃত্যুর ঘটনা ঘটে তার ১২ ভাগ হয় ক্যানসারের কারণে। উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশে ক্যানসারকে যথাক্রমে মৃত্যুর দ্বিতীয় ও তৃতীয় কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ক্যানসার হলে আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরের কোষ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে চারপাশের টিস্যু এমনকি দূরবর্তী কোনো অঙ্গেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। পরিণতিতে আক্রান্ত ব্যক্তি একপর্যায়ে মৃত্যুবরণ করে। বর্তমানে আমাদের দেশে স্তন, জরায়ু, অন্ত্রনালি, প্রোস্টেট, ফুসফুস, পাকস্থলী, ডিম্বাশয়, যকৃত্, অন্ননালি, মুখগহ্বর, ত্বকে ক্যানসার আক্রান্ত হন। দেশে প্রায় ৪০ ভাগ ক্যানসারের প্রধান কারণ ধূমপান। ধূমপানের প্রভাবে ফুসফুস, মুখগহ্বর, খাদ্যনালি, প্যানক্রিয়াস, কিডনি, মূত্রথলির, পাকস্থলী, এমনকি ব্লাড ক্যানসারও হয়ে থাকে। এছাড়া অ্যালকোহল মুখের ক্যানসার, লিভারের ক্যানসার, পরিপাকতন্ত্রের ক্যানসার এবং কিডনির ক্যানসার ঘটাতে পারে। ডায়াবেটিস রোগীদের ক্যানসার হওয়ার সম্ভাবনা আরো অনেক বেশি। ডায়াবেটিস রোগীদের ক্ষেত্রে প্যানক্রিয়াটিক ক্যানসার, হেপাটোবিলিয়ারি ক্যানসারের ঝুঁকি বেড়ে যায়। কেউ কেউ মাংস জাতীয় খাবার বা চর্বিযুক্ত মাংস বেশি খাওয়ার কারণে ক্যানসার ঝুঁকিতে থাকেন।
ক্যানসারের কারণ হিসেবে পান-সুপারি, জর্দা, তামাকপাতা, ধূমপান, মদ্যপান, অনিয়ন্ত্রিত খাদ্য গ্রহণ, ক্ষতিকর রাসায়নিক দ্রব্যের সংস্পর্শ, কিছু কিছু ভাইরাস (হেপাটাইটিস বি ও সি, এইচআইভি, এবস্টেইন বার ভাইরাস, সাইটোমেগালো ভাইরাস), কিছু পরজীবী (সিস্টোসোমিয়াসিস), সূর্যকিরণ, তেজস্ক্রিয়তা, কীটনাশক, রঙিন খাবার, বায়ুদূষণ প্রভৃতিকে চিহ্নিত করা হয়েছে।
ক্যানসার চিকিত্সার কয়েকটি পর্ব বা অংশ রয়েছে। এর মধ্যে সার্জারি, রেডিওথেরাপি, কেমোথেরাপি, হরমোনথেরাপি এবং টারগেটেড থেরাপি প্রধান। কিন্তু এরপরের অংশটি অনেক গুরুত্বপূর্ণ আর তা হলো ক্যানসারের চিকিত্সকের কাছে আজীবন ফলোআপ। দুঃখজনক হলেও সত্য যে আমাদের দেশে এই কাজটি কাউকেই ঠিকমতো করতে দেখা যায় না। নিয়মিত ফলোআপের মাধ্যমে চিকিত্সা পরবর্তী ক্যানসারের পুনরাবির্ভাব শুরুতেই নির্ণয় করা যায় এবং প্রয়োজনীয় চিকিত্সা নেওয়া যায়। ফলে রোগী দীর্ঘদিন সুস্থভাবে জীবনযাপন করতে পারে।
এদিকে কিছু কিছু ক্যানসারের আগাম সুরক্ষা ও নিরাময়ের বার্তাও এনেছে দেশীয় ফার্মা কোম্পানিগুলো। যেমন ‘জরায়ু মুখের ক্যানসার’। এই ক্যানসার নিরাময়ে দেশের ফার্মা কোম্পানিই ভ্যাকসিন উত্পাদন করেছে। প্রতিবছর গড়ে প্রায় ১২ হাজার বিভিন্ন বয়সি মেয়ে বা নারী এই রোগে আক্রান্ত হয় বলে শনাক্ত হয়ে থাকে। দুঃখজনক হলেও সত্য, একই সঙ্গে প্রায় অর্ধেক অর্থাত্ ৫০ শতাংশ এই রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করে থাকে। তবে প্রাথমিক অবস্থায় এই রোগ শনাক্ত হলে চিকিত্সার মাধ্যমে এই রোগপ্রতিরোধ করা সম্ভব। একটি মাত্র টিকার মাধ্যমে এই রোগ শতভাগ নির্মূল করা সম্ভব। দেশে উত্পাদিত ভ্যাকসিন নির্দিষ্ট বয়সি মেয়েদের সুন্দরভাবে বেঁচে থাকার বার্তা দিচ্ছে।
যারা কম বয়সে বিবাহ করে, যাদের অনিয়মিত মাসিক, যারা ধূমপান করেন, যাদের একের অধিক যৌনসঙ্গী রয়েছে এবং যারা অধিক সন্তান ধারণ করে থাকে তাদের এই রোগ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। যদিও সচেতনতা তৈরি এবং জরায়ুমুখ টিকা দেওয়ার পর্যাপ্ত সুবিধা হওয়ার কারণে আক্রান্তের সংখ্যা ধীরে ধীরে কমে আসছে।













