মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের সাম্প্রতিক এক স্বীকারোক্তি বিশ্ব অর্থনীতির কেন্দ্র-পরিধি বৈষম্যের দীর্ঘদিনের সত্যকে নতুন করে উন্মোচন করেছে, যা ডিপেন্ডেন্সি থিওরির মূল বক্তব্যকে সমর্থন করে। যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য পরবর্তী প্রেসিডেন্ট বিবেচিত ভ্যান্স সিলিকন ভ্যালির টেকজায়ান্টদের কাছে অকপটেই স্বীকার করেছেন যে পশ্চিমা বিশ্ব, বিশেষত যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক শ্রমবিভাজনকে এমনভাবে স্থায়ী করতে চায়, যাতে উন্নয়নশীল দেশগুলো গ্লোবাল ভ্যালু চেইনের নিম্ন ধাপেই অর্থাৎ কম মূল্যসংযোজন ক্ষমতা, কাঁচামাল বা স্বল্প-প্রক্রিয়াজাত পণ্যের উৎপাদনে আটকে থাকে। এর বিপরীতে ধনী দেশগুলো উচ্চপ্রযুক্তি, ডিজাইন ও বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদের ওপর একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখে উচ্চ মুনাফা ভোগ করবে।
উন্নয়নশীল ও সাবেক উপনিবেশভুক্ত দেশগুলোর বহু গবেষক, অর্থনীতিবিদ ও নির্ভরতা তত্ত্ব বা ডিপেন্ডেন্সি থিওরির তাত্ত্বিকেরা দীর্ঘদিন ভ্যান্সের কথাটাই বলে আসছেন, পশ্চিমা বিশ্ব আন্তর্জাতিক শ্রমবিভাজনকে এমনভাবে স্থায়ী করে তুলেছে, যাতে তৃতীয় বিশ্ব বৈশ্বিক মূল্য শৃঙ্খলের নিচের ধাপেই আটকে থাকে। এই তত্ত্বের সারমর্ম হলো উন্নত দেশগুলোর উচ্চপ্রযুক্তি, মেধাস্বত্ব, অ্যালগরিদম, পেটেন্ট ও ডিজাইনের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে হবে এবং দরিদ্র দেশগুলোকে সীমাবদ্ধ রাখতে হবে কম মূল্য সংযোজনশীল উত্পাদনে। এই কাঠামো শুধু বৈশ্বিক অর্থনীতি নয়, বাংলাদেশসহ বহু দেশের অভ্যন্তরীণ উন্নয়নকাঠামোতেও প্রবলভাবে দৃশ্যমান।
রাজধানী ঢাকা ও চট্টগ্রামকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা উন্নয়নের বিস্তার এবং দেশের উত্তর-দক্ষিণের পরিধি অঞ্চলের স্থায়ী পশ্চাত্পদতা ডিপেন্ডেন্সি থিওরি ও কেন্দ্র-পরিধির বৈষম্যের জীবন্ত উদাহরণ। বাংলাদেশে এর প্রকাশ ঘটছে অন্যভাবে। আর্থসামাজিক-রাজনৈতিক এবং জলবায়ু সংকটের ক্রমবর্ধমান বহুমাত্রিক সংকটের মাধ্যমে। অনেক বছর ধরেই বারবার ঢাকা বিশ্বের শীর্ষ দুই বা তিনটি সবচেয়ে দূষিত নগরীর তালিকায় উঠে আসছে, গত ১১ নভেম্বর ঢাকা ছিল বিশ্বের তৃতীয় সর্বাধিক দূষিত বড় শহর; চট্টগ্রামের বায়ুমানও দীর্ঘদিন ধরে বিশ্ব সূচকে ‘অস্বাস্থ্যকর’ হিসেবে চিহ্নিত। ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগর এলাকায় অপরাধের মাত্রা বাংলাদেশের অন্যান্য মহানগরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। ২০২৪ সালে ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ যথাক্রমে প্রতি মাসে গড়ে ২০০০ ও ৫০০ মামলা নথিভুক্ত করেছে, যেখানে হত্যা, ডাকাতি, নারী ও শিশু নির্যাতন, মাদক ও চুরি-ডাকাতির ঘটনাই বেশি। দুই নগরেই সংঘবদ্ধ অপরাধ, মাদক ও চুরির হার উদ্বেগজনকভাবে ক্রমবর্ধমান।
যুক্তরাষ্ট্র তার সংকট ঠেকাতে সিলিকন ভ্যালির প্রযুক্তি-জায়ান্টদের দ্বারস্থ হয়েছে এবং নিজেদের প্রাধান্য বজায় রাখার নতুন কৌশল খুঁজছে। কিন্তু বাংলাদেশ তার আভন্তরীণ সংকট কীভাবে মোকাবিলা করছে কিংবা আদৌ করছে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। কারণ পাশ্চাত্যের প্রভাবশালী দেশগুলোর বাস্তবতার সঙ্গে বাংলাদেশের ভৌগোলিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক কাঠামো বিশ্লেষণ করলে কেন্দ্র-পরিধি বৈষম্যের নির্মম রূপ ও তার প্রকাশ আরো স্পষ্ট হয়। সাম্প্রতিক তথ্য অনুসারে, দেশের মোট জিডিপির প্রায় ৩৭-৪০ শতাংশ শুধু ঢাকা বিভাগ থেকে আসে, যেখানে রংপুর বিভাগের অবদান ৮ শতাংশেরও কম এবং বরিশাল বিভাগের অবদান ৬ শতাংশের নিচে। আবার ঢাকা জেলা একাই মোট জিডিপির প্রায় ৪৬ শতাংশ উত্পাদন করে। শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর ৬৫ শতাংশ ঢাকা ও চট্টগ্রামকেন্দ্রিক, অথচ উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলে শিল্পায়নের হার ১৫ শতাংশেরও কম। আয় বৈষম্য চিত্র বলছে, দেশের মানুষের গড় মাথাপিছু আয় যেখানে ২ হাজার ৮২০ মার্কিন ডলার, সেখানে ঢাকার মানুষের মাথাপিছু আয় বর্তমানে ৫ হাজার ১৬৩ মার্কিন ডলার।
অর্থাত্ দেশের গড় মাথাপিছু আয়ের প্রায় দুই গুণের কাছাকাছি ঢাকার মানুষের আয়। এছাড়া, দেশের মোট জিডিপির ৪৬ শতাংশই ঢাকাকেন্দ্রিক, আর মোট কর্মসংস্থানের ৪০ শতাংশ রয়েছে কেবল রাজধানীতে। দেশের মোট পণ্য রপ্তানির ৪০ শতাংশের বেশি হয় এ জেলা থেকে। স্বাস্থ্যে বৈষম্য আরো প্রকট। ডিসেম্বর ২০২৩-এর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের জাতীয় গড় ডাক্তার-জনসংখ্যা অনুপাত ছিল প্রতি ১ হাজার জনে ০.৮৩ জন। ২০২৩ সালের শেষ নাগাদ দেশে সরকারি স্বাস্থ্যসেবা কর্মী ছিলেন প্রায় ১ লাখ ২২ হাজার জন। একই বছর পর্যন্ত দেশে মোট নিবন্ধিত এমবিবিএস ডাক্তারের আনুমানিক সংখ্যা ছিল ১ লাখ ১ হাজার ৫৫৯ জন। কিন্তু রাজধানীতে প্রতি ১০ হাজার জনে ১২ জন চিকিত্সক থাকলেও উপকূলীয় অঞ্চল ও উত্তরে এ সংখ্যা ৪-৬ জন। উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষা অবকাঠামো ও প্রতিষ্ঠানের মানেও কেন্দ্র-পরিধির এই ব্যবধান দৃশ্যমান, যা পরবর্তীতে উচ্চশিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানে সরাসরি প্রভাব ফেলছে।
অবকাঠামোগত বিনিয়োগের অসম বণ্টনও এরই প্রতিফলন; মোট সরকারি উন্নয়ন ব্যয়ের অর্ধেকের বেশি ঢাকাকেন্দ্রিক খাত-ক্ষেত্রে ব্যয় হলেও নদীভাঙন, জলবায়ু ঝুঁকি, আঞ্চলিক সড়ক যোগাযোগ, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা উন্নয়ন কিংবা কৃষিভিত্তিক মূল্যসংযোজন খাতে বরাদ্দ তুলনামূলকভাবে অনেক কম। ফলে দারিদ্র্যও অঞ্চলে অঞ্চলে অসমভাবে বিস্তৃত হয়েছে। জাতীয় দারিদ্র্য হার ২০-২৫ শতাংশ হলেও রংপুর, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট ও উপকূলীয় ভোলা-পটুয়াখালী অঞ্চলে দারিদ্র্য হার ৫০-৭০ শতাংশ পর্যন্ত। এই বৈষম্য শুধু অর্থনৈতিক নয়; এটি সামাজিক, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অংশগ্রহণের ক্ষেত্রেও প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে, যার ফলে উন্নয়ন কেন্দ্রীকরণ আরো বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং পরিধি আরো দুর্বল হয়ে পড়ছে।
বিশ্বব্যাপী চলমান অসম উন্নয়নকাঠামো ও এর পতনের ব্যাখ্যায় ডিপেন্ডেন্সি থিওরি বহু দশক ধরে একটি শক্তিশালী বিশ্লেষণাত্মক কাঠামো হিসেবে ব্যবহূত হয়ে আসছে। আন্দ্রে গুন্টার ফ্রাঙ্ক, সামির আমিন, রাউল প্রেবিশ থেকে শুরু করে ইমানুয়েল ওয়ালারস্টাইনের ওয়ার্ল্ড সিস্টেম থিওরি কাঠামো দেখায় যে, পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থায় গ্লোবাল নর্থ ধীরে ধীরে উত্পাদন, শ্রম এবং প্রযুক্তির ওপর এমন নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে, যার ফলে গ্লোবাল সাউথ ক্রমাগত নির্ভরশীল অবস্থায় টিকে থাকছে। কৃষিপণ্য, কাঁচামাল ও স্বল্পমূল্যের প্রস্তুত পণ্য রপ্তানি করে দক্ষিণের দেশগুলো যে আয় অর্জন করে, তার বহুগুণ বেশি মুনাফা উত্তরের দেশগুলো অর্জন করে তাদের প্রযুক্তি, পেটেন্ট, বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ এবং ডিজাইনের মাধ্যমে। ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ‘টার্মস অব ট্রেড’ দীর্ঘ মেয়াদে সব সময় উত্তর দেশের পক্ষে থাকে।
তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো যত বেশি রপ্তানি বাড়ায়, উত্তর আরো বেশি মুনাফা করে। একুশ শতকের শুরুর দিকে অনেকেরই ধারণা ছিল, বিশ্বায়ন এই নির্ভরতার কাঠামো ভেঙে দেবে, কিন্তু পশ্চিমা দেশের কৌশলগত উচ্চপ্রযুক্তি খাতের কড়াকড়ি, সাপ্লাই চেইনের ওপর নিয়ন্ত্রণ এবং মেধাস্বত্বের একচেটিয়া মালিকানা নতুন করে এই অসম কাঠামোকে আরো শক্তিশালী করে তুলেছে। দক্ষিণ কোরিয়া, ভিয়েতনাম ও চীনের সাফল্যের পর পশ্চিমা বিশ্ব যে প্রযুক্তি-রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ, ট্যারিফ যুদ্ধ, পেটেন্ট সীমাবদ্ধতা ও নিরাপত্তাজনিত নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে, তা ডিপেন্ডেন্সি-কাঠামো টিকিয়ে রাখারই আরেক রূপ।
এই নির্ভরতা স্তর অটুট রাখতেই ধ্রুপদী অর্থশাস্ত্রের জনক অ্যাডাম স্মিথের তুলনামূলক সুবিধার তত্ত্ব (থিওরি অব কমপ্যারাটিভ অ্যাডভান্টেজ) তৃতীয় বিশ্বকে এই বলে উপদেশ দিয়েছিল যে, তারা কৃষি কাজ বা স্বল্প-প্রক্রিয়াজাত শিল্পে মনোনিবেশ করুক, আর সমৃদ্ধ দেশগুলো উচ্চ প্রক্রিয়াকরণ শিল্পজাত পণ্য উত্পাদন করুক। কৃষির জায়গায় এখন তৈরি পোশাক এসেছে, কিন্তু বৈষম্য একই রয়ে গেছে। উদাহরণ, বাংলাদেশে উত্পাদিত একটি বিশ্বখ্যাত ডেনিম জিনসের প্যান্ট পাশ্চাত্যের খুচরা বাজারে প্রায় ৫০ ডলারে (৬ হাজার টাকা) বিক্রি হলেও, কাঁচামালসহ উত্পাদন ও পরিবহনে খরচ হয় সর্বোচ্চ ২৩ ডলার (২ হাজার ৭৬০ টাকা)। নির্ভরতার কাঠামোয় পরিধির দেশগুলোর শ্রমশক্তি সব সময় কম দামে কেনা হয় এবং তাদের উত্পাদিত পণ্য উচ্চ দামে বৈশ্বিক বাজারে বিক্রি হয়।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের জন্য যে প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তা হচ্ছে কেন্দ্র-পরিধির বৈষম্যের এই কাঠামোতে বাংলাদেশ কোথায় দাঁড়িয়ে আছে এবং এর অবশ্যম্ভাবী পতনের সময় ও সুযোগকে বাংলাদেশ কীভাবে কাজে লাগাতে পারে? তবে মনে রাখতে হবে, দেশের অভ্যন্তরে চলমান বৈষম্যের কাঠামো ভেঙে না দিলে বৈশ্বিক ব্যবস্থায় আমাদের অবস্থানের পরিবর্তন সম্ভব নয়। একদিকে ঢাকা-চট্টগ্রামকেন্দ্রিক অর্থনীতি অস্বাভাবিক ঘনত্ব সৃষ্টি করছে, অন্যদিকে উত্তরাঞ্চল কৃষিনির্ভর, দক্ষিণাঞ্চল জলবায়ুজনিত ঝুঁকি-আক্রান্ত এবং উপকূলীয় অঞ্চল অবকাঠামোগতভাবে দুর্বল। কেন্দ্র-পরিধির এই অভ্যন্তরীণ বৈষম্য ভাঙতে হলে প্রয়োজন প্রযুক্তিস্বয়ম্ভরতা, আঞ্চলিক যোগাযোগ সম্প্রসারণ, কৃষিভিত্তিক শিল্পায়ন, কর্মসংস্থানের কাঠামোগত রূপান্তর এবং শিক্ষা বিনিয়োগের ব্যাপক পুনর্বিন্যাস।
বৈশ্বিক মূল্য শৃঙ্খলে ওপরের ধাপে উঠতে হলে প্রয়োজন গবেষণা, ডিজাইন, ব্র্যান্ডিং ও প্রযুক্তি-সৃজনক্ষমতা, যা দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত রয়েছে। ডিপেন্ডেন্সি থিওরি যে সতর্কবার্তা দেয় তা হলো উন্নয়ন তখনই সম্ভব, যখন দেশগুলো বৈশ্বিক ব্যবস্থার ভেতরে থেকে নিজেদের অভ্যন্তরের কাঠামো নতুন করে বিন্যস্ত করতে পারবে। কারণ অভ্যন্তরীণ কেন্দ্র-পরিধি কাঠামো যতদিন অটুট থাকবে, ততদিন বৈশ্বিক ব্যবস্থায় বাংলাদেশের অবস্থানও নির্ভরতার ঘূর্ণিতে আটকে থাকবে।













