পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি অঞ্চলে ঘূর্ণিঝড়, তাপপ্রবাহ, বন্যা, খরা, বনানল, বরফ গলার দ্রুততা, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, চরম আবহাওয়া, খাদ্যসংকট, স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং বাস্তুসংস্থানের ধ্বংসের মতো পরিস্থিতি দৃশ্যমান। বৈশ্বিক এই সংকট মোকাবিলায় বিশ্বের প্রধান প্ল্যাটফরম হলো জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন-বিষয়ক ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন (ইউএনএফসিসিসি) এবং তার বার্ষিক সম্মেলন ‘কনফারেন্স অব পার্টিস (কপ)’।
প্রতি বছর বিশ্বনেতা, বিজ্ঞানী, আন্তর্জাতিক সংস্থা, সিভিল সোসাইটি ও বিশেষজ্ঞদের নিয়ে কপ-এর আয়োজন করা হয়। ২০২৫ সালে অনুষ্ঠিতব্য এই কপ-৩০ আগের যে কোনো সম্মেলনের তুলনায় আরো তাত্পর্যপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। কারণ এটি এমন একসময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যখন প্যারিস চুক্তির লক্ষ্য, নিঃসারণ হ্রাসের অগ্রগতি, জলবায়ু অর্থায়ন, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং লস ও ড্যামেজ ফান্ডের বাস্তবায়ন আন্তর্জাতিকভাবে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কপ-২৮ থেকে কপ-২৯-এর ধারাবাহিকতায় আসছে কপ-৩০, যা ১০ থেকে ২১ নভেম্বর ব্রাজিলের আমাজনের রেইনফরেস্ট অঞ্চলের কোল ঘেঁষে অবস্থিত বেলেমে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এবারের কপ-৩০ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এটি বৈশ্বিক জ্বালানি খাতে ন্যায্যভিত্তিক রূপান্তরের প্রক্রিয়াকে সামনে নিয়ে আসবে। বর্তমানে বিশ্বে ব্যবহূত শক্তির বৃহত্তর অংশই কয়লা, তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। জীবাশ্ম জ্বালানি পৃথিবীর উষ্ণায়নের প্রধান উত্স হলেও অনেক দেশ তাদের অর্থনীতি এই জ্বালানির ওপরই টিকিয়ে রেখেছে। তবে এই কয়লা, গ্যাস ও তেলের ওপর নির্ভরতা কমাতে আন্তর্জাতিক নীতি, অর্থায়ন ও প্রযুক্তি সহযোগিতা অপরিহার্য। উন্নত ও শিল্পোন্নত দেশগুলোকে শুধু নিজেদের নিঃসারণ কমানোই নয়, বরং উন্নয়নশীল দেশগুলোর কাছে প্রযুক্তি ও আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। বর্তমানে অনেক দেশ নবায়নযোগ্য শক্তির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও অবকাঠামো এখনো অসম। তাই কপ-৩০ বৈশ্বিক জ্বালানি রূপান্তরের গতিকে ত্বরান্বিত করার একটি কৌশলগত টার্নিং পয়েন্ট হয়ে উঠতে পারে।
লস অ্যান্ড ড্যামেজ তহবিলের সঠিক স্বীকৃতি এবং ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর জন্য পূর্ণাঙ্গ এবং কার্যকর ক্ষতিপূরণ কাঠামো তৈরিও কপ-৩০-এর আরেকটি বড় লক্ষ্য। উন্নত দেশগুলো শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে শিল্পায়নের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ কার্বন নিঃসারণ করেছে, যার ফল ভোগ করছে উন্নয়নশীল ও ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলো। ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, নদীভাঙন, কৃষিক্ষতি, অবকাঠামো ধ্বংস, পানির সংকট, উপকূল ভাঙনে সবকিছুর ক্ষতি পূরণে আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিশ্রুতি দীর্ঘদিন ধরেই অসম্পূর্ণ। কপ-২৮-এ লস অ্যান্ড ড্যামেজ তহবিল প্রতিষ্ঠিত হলেও সেটি কীভাবে পরিচালিত হবে, কোন দেশের কত অবদান থাকবে, অর্থ কীভাবে বণ্টিত হবে—এসব গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত কপ-৩০-এ আসতে পারে, যা সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর পক্ষে একটি ঐতিহাসিক সাফল্য হিসেবে ধরা দেবে।
কপ-৩০ বাংলাদেশের জন্য বৈশ্বিক পর্যায়ে জলবায়ু ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ। বিশ্বব্যাপী জলবায়ু ক্ষতিগ্রস্ত দেশের তালিকার শীর্ষে থাকা বাংলাদেশ প্রতি বছর বড় ধরনের বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন, লবণাক্ততা বৃদ্ধি এবং কৃষি উত্পাদন হ্রাসের মতো সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা এক মিটার বৃদ্ধি হলে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ স্থায়ীভাবে পানির নিচে চলে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে এবং লাখ লাখ মানুষের বাস্তুচ্যুত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই কপ-৩০-এ বাংলাদেশের মূল দাবি হবে :
১. অ্যাডাপটেশন ফান্ড, লস অ্যান্ড ড্যামেজ তহবিল এবং জলবায়ু অর্থায়নে বৈষম্য কমিয়ে সহজ শর্তে অর্থ বরাদ্দ নিশ্চিত করা। কারণ বাংলাদেশের মতো ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য উপকূল সুরক্ষা, বাঁধ নির্মাণ, ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র বৃদ্ধি, নদী খনন, লবণাক্ততা সহনশীল ফসল, পানিসংরক্ষণ এবং সবুজ অবকাঠামো নির্মাণের জন্য বড় বিনিয়োগ দরকার;
২. অন্যদিকে কপ-৩০ বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য শক্তি খাতে উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করার সুযোগ এনে দিতে পারে। এশিয়ার অন্যতম কার্বন ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে বাংলাদেশ বিদ্যুত্ উত্পাদনে সৌর ও বায়ুশক্তির পরিধি বাড়াচ্ছে, তবে প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি, অর্থায়ন এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এখনো পর্যাপ্ত নয়;
৩. কপ-৩০-এ প্রযুক্তি হস্তান্তর, গ্রিন এনার্জি ফান্ড এবং গ্লোবাল কার্বন ট্রেডিংয়ের মতো সিদ্ধান্ত বাংলাদেশকে পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ব্যবস্থায় এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
৪. কপ-৩০ শুধু একটি বৈশ্বিক জলবায়ু সম্মেলন নয়, বরং এটি পৃথিবীর ভবিষ্যত্ অস্তিত্ব রক্ষার জন্য একটি বৈশ্বিক জবাবদিহির প্ল্যাটফরম। উন্নয়নশীল দেশগুলো সাধারণত অর্থায়নে বৈষম্যের কারণে বড় সমস্যায় পড়ে। উন্নত রাষ্ট্রগুলোকে তাদের প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে বাধ্য করা, কার্বন নিঃসারণ দ্রুত কমানো, নবায়নযোগ্য শক্তিতে রূপান্তর ত্বরান্বিত করা এবং জলবায়ু-ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর অর্থনৈতিক সহায়তা নিশ্চিত করাই এর কেন্দ্রীয় লক্ষ্য।
৫. কপ-৩০-এ নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তরের জন্য সমন্বিত আন্তর্জাতিক নীতি, প্রযুক্তি হস্তান্তর, কার্বন বাজার উন্নয়ন এবং বিনিয়োগ সহজীকরণের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।
৬. পৃথিবীর জন্য যেমন এই সম্মেলন অত্যন্ত তাত্পর্যপূর্ণ, তেমনি বাংলাদেশের জন্যও এটি টিকে থাকার লড়াইকে আন্তর্জাতিকভাবে আরো শক্তিশালী করার এক মহাসুযোগ। তাই কপ-৩০ সফল হওয়া মানে শুধু একটি বৈশ্বিক সিদ্ধান্ত নয়, এটি ভবিষ্যত্ প্রজন্মের জন্য নিরাপদ পৃথিবী নিশ্চিত করার একটি অনন্য প্রচেষ্টা।
১৯৯২ সালে ব্রাজিল বিশ্ব সামিটের আয়োজন করেছিল যেখানে জলবায়ু, জীববৈচিত্র্য ও মরুকরণ-সংক্রান্ত কনভেনশনগুলো অনুমোদন হয়েছে, যা আমাদের গ্রহ ও মানবতার সুরক্ষা দিতে একটি নতুন দৃষ্টান্ত তুলে ধরে। গত ৩৩ বছর ধরে এসব সম্মেলন গ্রিনহাউজ গ্যাস নির্গমন হ্রাস করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি ও অভীষ্ট তৈরি করেছে, যেখানে আছে ২০৩০ সালের মধ্যে বন উজাড় বন্ধ থেকে শুরু করে নবায়নযোগ্য শক্তির ক্ষমতা তিন গুণ করার মতো বিষয়। তিন দশকেরও বেশি সময় পর জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বিশ্ব আজ আবারও ব্রাজিলের কাছে এসেছে। এটা কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়, কপ-৩০ আমাজন রেইনফরেস্টের কেন্দ্রস্থলে অনুষ্ঠিত হয়েছে। রাজনীতিবিদ, কূটনীতিক, বিজ্ঞানী, কর্মী ও সাংবাদিকদের জন্য আমাজনের বাস্তবতা প্রত্যক্ষ করার এটি অনন্য সুযোগ।
আমরা চাই বিশ্ব বন, গ্রহের বৃহত্তম নদীর অববাহিকা এবং এ অঞ্চলে বসবাসকারী লাখ লাখ মানুষের প্রকৃত অবস্থা দেখুক। কপ কেবল ভালো ভালো চিন্তার প্রদর্শনী বা আলোচকদের জন্য বার্ষিক সমাবেশ হতে পারে না। এগুলো বাস্তবতার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপের মুহূর্ত হতে হবে। এ সংকট একসঙ্গে মোকাবিলায় সম্পদের প্রয়োজন। এ কথা স্বীকার করতে হবে, সাধারণ কিন্তু পৃথক দায়িত্বের নীতিটি যে কোনো জলবায়ু চুক্তির আপস-অযোগ্য ভিত্তি। এ কারণেই গ্লোবাল সাউথ বা বিশ্বের দক্ষিণাংশ সম্পদের বৃহত্তর সুযোগ পাওয়ার দাবি করে এবং তা হবে দানখয়রাত নয়, ন্যায়বিচার হিসেবে। ধনী দেশগুলো কার্বনভিত্তিক অর্থনীতি থেকে সবচেয়ে বেশি উপকৃত। তাদের এখন নিজেদের দায়িত্ব পালন করতে হবে, কেবল প্রতিশ্রুতি দিয়ে নয়, বরং তাদের ঋণ পরিশোধ করে। ব্রাজিল তার ভূমিকা রাখছে। মাত্র দুই বছরে ইতিমধ্যে আমাজনে বন উজাড় অর্ধেকে নামানো হয়েছে, যা প্রমাণ করে—জলবায়ু-সংক্রান্ত পদক্ষেপ বাস্তবে সম্ভব।
বেলেমে বন সংরক্ষণে একটি উদ্ভাবনী উদ্যোগ চালু করার প্রয়াশ চালানো হবে। এটি হলো ট্রপিক্যাল ফরেস্টস ফরেভার ফ্যাসিলিটি (টিএফএফএফ); কারণ এটি বিনিয়োগ তহবিল হিসেবে কাজ করে; অনুদানের ব্যবস্থা হিসেবে নয়। টিএফএফএফ তাদের পুরস্কৃত করবে, যারা তাদের বন টিকিয়ে রাখে এবং যারা তহবিলে বিনিয়োগ করে। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় এটি একটি প্রকৃত লাভজনক পদ্ধতি; যেমন—ব্রাজিল টিএফএফএফে এক বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে এবং আমরা অন্যান্য দেশ থেকেও অনুরূপ উচ্চাকাঙ্ক্ষী ঘোষণা আশা করি। এ কথা ভুলে গেলে চলবে না, এখনো দুই বিলিয়ন মানুষ রান্নার জন্য পরিষ্কার প্রযুক্তি ও জ্বালানির সুযোগ থেকে বঞ্চিত। এছাড়া ৬৭৩ মিলিয়ন মানুষ এখনো ক্ষুধার্ত অবস্থায় দিন কাটায়। বিশ্ব উষ্ণায়নের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে প্রতিশ্রুতি অবশ্যই ক্ষুধার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকতে হবে।













