সভ্যতাবিবর্জিত একটি জঘন্যতম অপকর্ম হলো প্রতারণা বা মানুষ ঠকানো। এটা এমন এক সামাজিক ব্যাধি, যা বিশেষ করে উন্নয়নশীল ও অনুন্নত দেশে বেশি চোখে পড়ে। প্রবণতাটি এসব সমাজে অর্থ উপার্জনের সহজ মাধ্যম হয়ে উঠেছে, যা বহু পরিবারকে নিঃস্ব-রিক্ত করে নামিয়ে আনছে রাস্তায়। একদল অপরাধী এটাকে খোদ পেশা হিসেবে গ্রহণ করে নিত্যনতুন কৌশল অবলম্বন করে চলেছে। তাদের এক নম্বর টার্গেট হলো সমাজের বিশেষ করে বেকার এবং তরুণ জনগোষ্ঠী। প্রতারণার ফাঁদে পড়ে ভুক্তভোগীর জীবন কতটা চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে যায়, তা আমরা পত্রপত্রিকাগুলোতে প্রায়ই দেখে থাকি। অবশ্য এ ধরনের প্রতারণার বিষয়ে সদাসর্বদা সতর্ক ও সচতেন থাকার পরামর্শ দিয়ে থাকেন সচেতন মহল কিংবা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। তবে মুশকিল হলো, অত্যন্ত ধূর্ত এই দুষ্কৃতকারীর দলকে যেন কোনোভাবেই দমানো যায় না। ন্যায়-অন্যায়ের তোয়াক্কা না করে এই প্রতারকদের পাতা ফাঁদে পড়ে যায় তারা।
সম্প্রতি মালয়েশিয়া গমন-ইচ্ছুক বাংলাদেশিদের সতর্ক করে একটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে মালয়েশিয়াস্থ বাংলাদেশ হাইকমিশন। বিজ্ঞপ্তিতে মালয়েশিয়ার সাবাহ প্রদেশে কর্মী পাঠানোর কথা বলে প্রতারণার বিষয়ে বাংলাদেশিদের সতর্ক করে মালয়েশিয়াস্থ বাংলাদেশ হাইকমিশন আহ্বান জানিয়েছে এই সকল অসাধু চক্রের ফাঁদে পা না দেওয়ার জন্য। বলা হয়েছে, একটি সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্র মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর কথা বলে মালয়েশিয়ায় গমনে ইচ্ছুক বাংলাদেশিদের নিকট থেতে পাসপোর্ট এবং নগদ টাকা সংগ্রহ করছে। জনসচেতনতার উদ্দেশ্যে বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয় যে, বাংলাদেশ থেকে মালয়েশিয়ার সাবাহ প্রদেশে কর্মী আনার লক্ষ্যে বর্তমানে মালয়েশিয়ার সরকারের সহিত বাংলাদেশ সরকারের কোনো চুক্তি বা সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) নেই এবং সাবাহ প্রদেশের কর্তৃপক্ষ থেকে বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগের সিদ্ধান্ত পাওয়া যায়নি।
হাইকমিশনের এই সতর্কবাণী থেকে পরিষ্কার বুঝা যাচ্ছে, বাংলাদেশে একটি অসাধু গোষ্ঠী নতুন কোনো ফাঁদ পেতে দেশের বেকার জনগোষ্ঠীকে প্রলোভনের টোপ গেলাবার পাঁয়তারা করছে। বলা বাহুল্য, এটা এমন এক টোপ, যা একবার গিলে ফেরলে, সেটা থেকে সহসা নিষ্কৃতি মিলে না! আমরা গভীর পর্যবেক্ষণের সাথে লক্ষ করে আসছি, একটি হীন গোষ্ঠী দেশের তরুণ বেকারদের ক্রমাগত এই ধরনের নানা প্রলোভন দেকিয়ে প্ররোচিত করে যাচ্ছে। বিদেশে ভালো কর্মসংস্থানের আশ্বাসে তারা তরুণদের এমনকি রাশিয়া বা ইউক্রেন কিংবা আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে চলমান প্রাণঘাতী যুদ্ধের ময়দানে নিয়োজিত পর্যন্ত করছে। দেশের বিপুলসংখ্যক তরুণ জেনে-বুঝে হোক কিংবা অবচেতন মনে সেই বিষমাখা বড়শির টোপ গিলছে এবং সহায়সম্বলহীন হয়ে কেউ দেশে ফেরত আসছে, কেউ-বা জীবন নিয়েও ফিরতে পারছে না। সবার চোখের সামনেই এই বাজে কাজটি যেন ক্রমশ সাধারণ চিত্র হয়ে উঠছে। সবশেষ লিবিয়া উপকূলে নৌকাডুবির ঘটনার কথা আমরা জানতে পেরেছি গণমাধ্যমে, যেখানে কয়েকজন বাংলাদেশীর মৃত্যু হয়েছে।
সন্দেহ নেই, এই প্রবণতার বিস্তারের পিছনে এক নম্বরে দায়ী হলো ‘লোভ‘’ এবং তা উভয় পক্ষের। ন্যায়-অন্যায়ের তোয়াক্কা না করে অপকর্মকারীরা খোদ স্বদেশিকে ঠেলে দিচ্ছে মৃত্যুর দিকে, আর কোনো ধরনের পরীক্ষানিরীক্ষা ছাড়াই কেবল অধিক উপার্জনের আশায় তাদের চটকদার কথার জালে জড়িয়ে পড়ছে সেই সকল ভুক্তভোগী। এমন একটি প্রেক্ষাপটে তাকিয়ে দেখতে হবে সেই সকল পরিবারগুলোর দিকে, যারা এই মরণফাঁদে পড়ে অবর্ণনীয় দুর্ভোগ-দুর্বিপাকের শিকার হচ্ছে।
যারা এই নোংরা খেলাটি খেলে থাকেন, তারা ‘অপরিচিত‘’ কেউ নয়। বরং এটা সবার জানা যে, এই প্রতারকদের থামাবার ব্যাপারে কেনো দিনই সঠিক নজরদারি চোখে পড়ে না। একদম নাকের ডগায় বছরের পর বছর তারা এহেন অপকর্ম করে যাচ্ছে; কিন্তু তা যেন কারো চোখে পড়ে না! এমতাবস্থায়, তাদের প্রতারণতার ব্যাপারে সবার সতর্ক হওয়ার কোনো বিকল্প নেই। চলমান ক্রন্তিকালে দেশের বেকার জনগোষ্ঠী বিদেশে কর্মসংস্থান করতে পারলে তা মঙ্গলজনক; কিন্তু সেসব ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত পরীক্ষানিরীক্ষা করে তবেই সিদ্ধান্ত এবং আর্থিক লেনদেন করতে হবে। প্রতারক চক্রের হাতে পড়ে সহায়হীন হওয়ার আগে এই কথা দুই বার ভাবার অবকাশ নেই।













