বাংলাদেশের বেকারত্ব শুধু একটি সমস্যা নয়, এটি এক ভয়াবহ সংকট, যা প্রতি মুহূর্তে আমাদের সমাজের প্রতিটি স্তরকে গভীরভাবে প্রভাবিত করছে। বিশেষত দেশের যুবসমাজের মধ্যে বেকারত্বের হার যে মাত্রায় পৌঁছেছে, তা আমাদের ভবিষ্যতকেও হুমকির মুখে ফেলছে। আজও লাখো যুবক তাদের উচ্চশিক্ষা অর্জন করার পরও একটি ভালো চাকরি পেতে ব্যর্থ হচ্ছে। দেশের প্রায় ২৫ শতাংশ শিক্ষিত যুবক আজও বেকার। এই সংখ্যাটি শুধু পরিসংখ্যান নয়, এর পেছনে একেকটি দুঃখজনক গল্প লুকিয়ে আছে। শিক্ষিত যুবকরা যাদের চোখে চাকরি পাওয়ার স্বপ্ন, তাদের প্রায় সবার জন্য বাজারে উপযুক্ত কাজের অভাব রয়েছে। এর মাধ্যমে দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শ্রম ও শিক্ষা অবমূল্যায়িত হচ্ছে।
বাংলাদেশের শ্রমবাজারে বেকারত্ব ক্রমেই এক বহুমাত্রিক অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকটে পরিণত হয়েছে। ২০২৩ সালের বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর শ্রমবাজার জরিপ অনুযায়ী, ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সি শ্রমশক্তির সংখ্যা প্রায় ২ কোটি ৬৭ লাখ ৬০ হাজার, যার মধ্যে আনুমানিক ১৯ লাখ ৪০ হাজার বা ৭.২ শতাংশ তরুণ বেকার। একই জরিপে দেখা যায়, উচ্চশিক্ষিত তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার প্রায় ৩১.৫ শতাংশ, যা সামগ্রিক বেকারত্বের তুলনায় উদ্বেগজনকভাবে বেশি। গত বছর পত্রিকান্তরে প্রকাশিত এক রিপোর্ট অনুযায়ী, প্রতি বছর প্রায় ২২ থেকে ২৩ লাখ নতুন কর্মপ্রত্যাশী শ্রমবাজারে প্রবেশ করলেও, কর্মসংস্থান সৃষ্টির হার তার সমানুপাতে বৃদ্ধি পাচ্ছে না। ফলে, ২০২৪ সালের এক খবর অনুযায়ী, জাতীয় পর্যায়ে মোট বেকারের সংখ্যা প্রায় ২৬ লাখ ৬০ হাজার, যা আগের বছরের তুলনায় বৃদ্ধি পেয়েছে।
এই পরিসংখ্যানগুলো দেশের মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা ও শ্রমবাজারের কাঠামোগত দুর্বলতার ইঙ্গিত বহন করে। দক্ষতা উন্নয়ন ও চাকরির বাজারের চাহিদার মধ্যে স্পষ্ট অসামঞ্জস্যের কারণে উচ্চশিক্ষিত তরুণরা কর্মসংস্থানে যুক্ত হতে পারছে না, যা শ্রমবাজারে স্কিল মিসম্যাচের একটি সুস্পষ্ট উদাহরণ। অন্যদিকে, গ্রামীণ অঞ্চল থেকে শহরমুখী অভিবাসন এবং বিদেশে কর্মসংস্থানের প্রবণতা বাড়ায় অভ্যন্তরীণ শ্রমবাজার আরো চাপে পড়ছে। তদুপরি, বিদেশি শ্রমিকদের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি স্থানীয় শ্রমশক্তির প্রতিযোগিতাকে প্রভাবিত করছে। এই পরিস্থিতিতে, বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের জন্য জরুরি হয়ে পড়েছে শিল্প খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন এবং শিক্ষাব্যবস্থাকে শ্রমবাজারের বাস্তব চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা, যাতে দেশের বিপুল যুবসম্পদকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তিতে রূপান্তর করা যায়।
এর পাশাপাশি, গ্রামীণ এলাকা থেকে শহরে অভিবাসনের হার বৃদ্ধি পাচ্ছে, যেখানে কর্মসংস্থানের সুযোগ কম। ২০২২ সালের বাংলাদেশ বেকারত্ব রিপোর্টে বলা হয় যে, দেশীয় যুবকদের জন্য শহরে আসা যেমন একটি স্বপ্ন, তেমনই এটি এক গভীর হতাশার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শহরগুলোতে আসার পরও তারা চাকরি পায় না এবং যে কারণে তাদের ফিরে যাওয়ার আর কোনো পথ থাকে না। এই অবস্থা শুধু দেশীয় যুবকদের হতাশাই সৃষ্টি করছে না, বরং তরুণদের বিদেশে চলে যাওয়ার হারও বেড়ে যাচ্ছে।
২০২৩ সালে বাংলাদেশ শ্রমবাজার গবেষণা থেকে দেখা যায় যে, বিদেশি শ্রমিকরা দেশে এসে বাংলাদেশের শ্রম বাজারে প্রবেশ করছে এবং এ কারণে স্থানীয়দের জন্য আর কর্মসংস্থানের সুযোগ থাকছে না। এই সংকট আরো মারাত্মক হয়ে উঠছে, যখন দেখা যাচ্ছে বিদেশি শ্রমিকরা স্থানীয় শ্রমিকদের স্থান নিয়ে নিচ্ছে।
বাংলাদেশে বেকারত্বের মহাসংকট এক নতুন দুঃখজনক রূপ ধারণ করছে অথচ তরুণরাই আমাদের আশার প্রতীক, যাদের উদ্যোগী মনোভাব রয়েছে। সরকার যদি দেশে শিল্প খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি না করে, তবে কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি পাবে না। শুধু তা-ই নয়, দেশের অর্থনীতি শক্তিশালী হতে পারবে না। এমনকি বর্তমান অবস্থা যদি চলতে থাকে, তাহলে দেশের অর্থনৈতিক মুক্তির একমাত্র পথও বন্ধ হয়ে যাবে। যদি শিল্প খাতের উন্নয়ন না ঘটে, তাহলে শিক্ষা, অভ্যন্তরীণ নীতির সঠিক বাস্তবায়ন এবং প্রযুক্তিভিত্তিক আউটসোর্সিং খাতেও কিছুই অর্জন হবে না।
যুবকদের দক্ষতা উন্নয়নের জন্য সরকারকে প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করতে হবে। দেশের যুবসমাজ যদি সঠিকভাবে প্রশিক্ষিত না হয়, তাহলে তাদের জন্য কোনো ধরনের চাকরি তৈরি করা সম্ভব হবে না। এই কারণে, সরকারের পক্ষে এখনই প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ এবং দক্ষতা উন্নয়ন কার্যক্রম গ্রহণ করা উচিত। যুবকরা যদি সহজেই দক্ষ হয়ে ওঠে, তবে তারা দ্রুত তাদের কর্মজীবনে প্রবেশ করতে সক্ষম হবে এবং তাদের হাত ধরে দেশ উন্নতির পথে এগিয়ে যাবে। এজন্য স্থানীয় শিল্পকে উত্সাহিত করার মাধ্যমে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করতে হবে। স্থানীয় শিল্পের প্রসার ঘটলে শুধু কর্মসংস্থানের সুযোগই বৃদ্ধি পাবে না, বরং এটি দেশের জন্য অর্থনৈতিক বৃদ্ধি তৈরি করবে এবং অভ্যন্তরীণ বাজারও শক্তিশালী হবে। দেশের শিল্পের ওপর সরকারের আরো মনোযোগ দেওয়া উচিত, বিশেষ করে এমন সেক্টরে, যেখানে স্থানীয় উদ্যোক্তারা নতুন ব্যবসা শুরু করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, বাংলাদেশের কুটিরশিল্প, হস্তশিল্প এবং কৃষি খাতের উন্নয়ন ঘটালে কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি পাবে এবং এর মাধ্যমে জাতি আত্মনির্ভর হতে পারবে।
২০২২ সালে বাংলাদেশ উদ্যোক্তা উন্নয়ন ফোরামে বলা হয় যে, নতুন উদ্যোক্তা তৈরি করতে সরকারি প্রণোদনা প্রদান করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন নতুন উদ্যোগের জন্য সরকার যদি সুবিধা এবং প্রণোদনা দেয়, তাহলে তরুণরা নতুন ব্যবসা শুরু করতে আরো উত্সাহিত হবে। এই উদ্যোগের মাধ্যমে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং জাতীয় অর্থনীতি আরো শক্তিশালী হবে। আউটসোর্সিং খাতের সুযোগ তৈরি করাও গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের তরুণরা প্রযুক্তিগত দক্ষতা অর্জন করে যে কোনো আন্তর্জাতিক কোম্পানিতে কাজ করতে সক্ষম হচ্ছে। এটি দেশের অর্থনীতিতে নতুন উৎস হিসেবে কাজ করছে। তবে সরকারের উচিত, আউটসোর্সিং খাতে আরো বিনিয়োগ বাড়ানো এবং প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা। যদি আমাদের তরুণরা তাদের দক্ষতা আরো বাড়াতে পারে, তাহলে তারা আন্তর্জাতিক শ্রম বাজারে অধিক ভালো অবস্থানে পৌঁছাতে সক্ষম হবে।
সর্বোপরি, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় কাজের বাজারের সঙ্গে সিলেবাসের সমন্বয় ঘটাতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রম যদি বাস্তব কর্মজীবনের সঙ্গে সংযুক্ত থাকে, তাহলে শিক্ষার্থীদের চাকরি পাওয়া আরো সহজ হতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সিলেবাসের মধ্যে বাস্তব জ্ঞান এবং অভিজ্ঞতা অন্তর্ভুক্ত করলে, শিক্ষার্থীরা প্রশিক্ষণ ছাড়াই দ্রুত চাকরির বাজারে প্রবেশ করতে পারবে এবং দেশীয় কর্মসংস্থানে অংশগ্রহণ করতে সক্ষম হবে।
এই সমস্যার সমাধান কঠিন হলেও, আমাদের একসঙ্গে কাজ করতে হবে। সরকারের পাশাপাশি, দেশের জনগণ যদি নিজেদের ইতিবাচক ভূমিকা পালন করে, তবে আমরা বেকারত্বের এই ভয়াবহ সংকট থেকে বেরিয়ে আসতে পারব। তরুণদের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারব। আমাদের উদ্দেশ্য যদি এক হয়, তাহলে সাফল্য আসবেই। এক্ষেত্রে আমাদের সর্বাত্মক উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।













