রাজধানীর কারওয়ান বাজারে গত সপ্তাহে এক রিকশাচালক এবং এক রাজনৈতিক কর্মীর কথোপকথন কানে ভেসে এলো। রাজনৈতিক কর্মীটি বেশ উদ্দীপনা নিয়ে বলছিলেন, ‘ভাই, এবার দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সংসদ আর সকল সংস্কার বাস্তবায়ন না হলে প্রকৃত রাষ্ট্র সংস্কার হবে না।’ রিকশাচালক কিছুক্ষণ শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলতে শুরু করলেন, ‘বাবা রে, আপনাদের ঐসব প্যাঁচানো কথাবার্তা তো বুঝি না! শুধু এইটা বলেন, এরপর যে নির্বাচন হবে, সেখানে নিজের ভোটটা নিজে দিতে পারব তো? আর একটা কথা, রোজায় চাল-ডালের দামটাও তো কমলো না!’
এই যে দুই প্রান্তের দুই মানুষের আলাপ, এটাই আজকের বাংলাদেশের রাজনীতির প্রকৃত ব্যবচ্ছেদ। একদিকে নীতিনির্ধারণী উচ্চবর্গীয় ‘রাজনীতির ভাষা’ অন্যদিকে ডাল-ভাতের নিশ্চয়তা খোঁজা সাধারণ ‘জনগণের ভাষা’। এ দুই ভাষার দূরত্ব ঘোচানোটাই এখন বর্তমান সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
সাধারণ মানুষের আকাঙ্ক্ষা বিমূর্ত কোনো তত্ত্বে আটকে নেই। বাজারে গিয়ে যে মধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্ত মানুষটি পকেটের সীমিত আয় আর ব্যাগের ওজনের হিসাব মেলাতে পারে না, তার কাছে ‘ব্যালেন্স অব পাওয়ার’ বা ক্ষমতার ভারসাম্য একটি বিমূর্ত দর্শন ছাড়া আর কিছুই নয়
ইতিহাস সাক্ষী, যখনই রাজনীতির ভাষা এবং জনগণের ভাষা আলাদা পথ ধরে হেঁটেছে, তখনই রাষ্ট্রে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক ফাটল বা অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। রাজনীতিবিদরা প্রায়শই ভবিষ্যতের সোনালী স্বপ্ন দেখান, কিন্তু জনগণের ভাষা সব সময় বর্তমানের জীবন্ত ও দৈনন্দিন সংকট নিয়েই কথা বলে।
যখন নির্বাচন পরবর্তী রাজনৈতিক মহলে, রাজনৈতিক ভাষায় আলাপ হয়, ডেমোক্রেটিক রিকনসলিডেশন, ইনস্টিটিউশনাল ডিকে, ম্যান্ডেট, লিগ্যাল-রেশনাল অথরিটি, ক্যারিশমেটিক লিডারশিপ, ছায়া সরকার ইত্যাদি এই রকম ভারি ভারি শব্দের ঝনঝনানি বেজে ওঠে। অথচ জনগণের ভাষা সব সময় সরল, সুস্পষ্ট এবং জীবনঘনিষ্ঠ।
উচ্চপর্যায়ের ‘স্বাস্থ্যনীতি’ সংস্কারের চেয়েও প্রান্তিক মানুষের কাছে বড় সত্য হলো, সরকারি হাসপাতালে গিয়ে একটি বেড পাওয়ার জন্য দালালের দ্বারস্থ না হওয়া কিংবা জীবনরক্ষাকারী ওষুধের জন্য সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি না থাকা
সাধারণ মানুষের আকাঙ্ক্ষা বিমূর্ত কোনো তত্ত্বে আটকে নেই। বাজারে গিয়ে যে মধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্ত মানুষটি পকেটের সীমিত আয় আর ব্যাগের ওজনের হিসাব মেলাতে পারে না, তার কাছে ‘ব্যালেন্স অব পাওয়ার’ বা ক্ষমতার ভারসাম্য একটি বিমূর্ত দর্শন ছাড়া আর কিছুই নয়। রমজান মাসে, সাধারণ একজন শ্রমজীবী মানুষ যখন দেখেন যে, বাজারে পিয়াজ কিংবা চিনির কৃত্রিম সংকট তৈরি করে রাতারাতি দাম বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, তখন তারা সরকারের ‘পলিসি রিফর্ম’-এর চেয়ে ‘বাজার তদারকি, অর্থাৎ সিন্ডিকেট নির্মূলে কঠোর পদক্ষেপ দেখতে চায়। তাদের কাছে সংস্কারের প্রকৃত মাপকাঠি হলো, সারা মাস হাড়ভাঙা খাটুনির পর মাস শেষে পরিবারের মুখে ডাল-ভাতের নিশ্চয়তা দেওয়া এবং আয়ের সাথে ব্যয়ের একটি সম্মানজনক ভারসাম্য থাকা। যখন সরকারি পরিসংখ্যানে মুদ্রাস্ফীতি কমার দাবি করা হয়, অথচ বাজারে গিয়ে সাধারণ মানুষ ঘাম ঝরায়, তখনই রাজনীতির ভাষা তার বিশ্বাসযোগ্যতা হারায়। এই ‘ক্রেডিবিলিটি গ্যাপ’, তথা আস্থার সংকটই বর্তমানে সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় কাঁটা হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
রাষ্ট্রের উচ্চমহল যখন আইনি কাঠামো পুনর্গঠনে ব্যস্ত, সাধারণ মানুষের কাছে ‘বিচারের প্রকৃত স্বাদ’ হলো, মধ্যরাতে বিপদে পড়ে থানায় গিয়ে ওসির ধমক না খাওয়া। বড় বড় ট্রাইব্যুনাল গঠনের চেয়েও তাদের কাছে বেশি জরুরি হলো, বিনা পয়সায় এবং কোনো রাজনৈতিক ‘বড় ভাই’-এর সুপারিশ ছাড়া একটি জিডি করতে পারা। তাদের কাছে আইনি সুরক্ষা মানে হলো আইনের হাত প্রভাবশালীর পকেটে না থাকা।
একজন সাধারণ ভুক্তভোগী যখন পাসপোর্ট অফিসে গিয়ে দালালের খপ্পরে না পড়ে, নির্দিষ্ট সময়ে নিজের পাসপোর্টটি হাতে পান, কিংবা রাষ্ট্র যখন ‘মৌলিক অধিকার’ নিয়ে তাত্ত্বিক বয়ান দেয়, একজন সাধারণ কৃষক বা মধ্যবিত্তের কাছে তার বাস্তব অনুবাদ হলো, ভূমি অফিসে গিয়ে বাড়তি টাকা (স্পিড মানি) না দিয়ে নিজের জমির পর্চা বা মিউটেশন সম্পন্ন করতে পারা। প্রতিটি টেবিলে হয়রানির অবসানই হলো তার কাছে প্রকৃত ‘জুলাই স্পিরিট’।
উচ্চপর্যায়ের ‘স্বাস্থ্যনীতি’ সংস্কারের চেয়েও প্রান্তিক মানুষের কাছে বড় সত্য হলো, সরকারি হাসপাতালে গিয়ে একটি বেড পাওয়ার জন্য দালালের দ্বারস্থ না হওয়া কিংবা জীবনরক্ষাকারী ওষুধের জন্য সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি না থাকা।
পাশাপাশি, জুলাই বিপ্লবের অন্যতম প্রধান কারিগর তরুণ প্রজন্মের কাছে সংস্কারের প্রকৃত অর্থ হলো ‘কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা’। একজন মেধাবী তরুণ যখন দেখেন যে, তার যোগ্যতার চেয়ে রাজনৈতিক তকমা কিংবা অর্থের প্রভাব বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে, তখন তার মধ্যে রাষ্ট্র নিয়ে বিতৃষ্ণা জন্মায়। পিএসসি বা ব্যাংকের নিয়োগ পরীক্ষায় যখন সামান্যতম অস্বচ্ছতার খবর বের হবে, তখন সেই তরুণের কাছে ‘নির্বাচনী ইশতেহার’ কেবল একটি কাগজের দলিল বলে মনে হবে। বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরি এবং উদ্যোক্তা হওয়ার পথে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও চড়া সুদের ঋণের বাধা দূর করাও তরুণদের অন্যতম চাওয়া।
তাই নতুন সরকারকে বুঝতে হবে, যদি এই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রশাসনিক সংস্কারগুলো মানুষের দৈনন্দিন হয়রানি ও বঞ্চনা কমাতে ব্যর্থ হয়, তাহলে বড় মাপের রাজনৈতিক পরিবর্তনগুলো সাধারণ মানুষের হৃদয়ে কোনো স্থায়ী আসন পাবে না। এজন্য সরকারের উচিত, সাধারণ মানুষের কাছে, যেটি সংস্কারের প্রথম মাপকাঠি, সেই চাল-ডালের দাম ও সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা। রমজানসহ সারা বছর নিত্যপণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়িয়ে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টিকারী সিন্ডিকেটগুলো ভেঙে দিতে হবে। সরকারি দপ্তরে ডিজিটাল স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য নির্মূল করা অপরিহার্য। সরকারি ও বেসরকারি কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, বিনিয়োগে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রোধ করা এবং সর্বোপরি স্বাস্থ্য খাতের যে স্বাস্থ্য ভালো নেই, তা প্রতিরোধে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করা।জনগণের এই ভাষা তারেক রহমানের সরকারের কান পর্যন্ত পৌঁছাবে কি?
লেখক : তরুণ কলামিস্ট ও শিক্ষার্থী, গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
ই-মেইল : [email protected]
(এই লেখা লেখকের একান্ত ব্যক্তিগত অভিমত; এ সংক্রান্ত কোনো দায় দৈনিক মূলধারা বহন করবে না)














