শিবরাম চক্রবর্তীর সেই মাস্টারমশাইকে মনে পড়ে। ভাষার শুদ্ধতা রক্ষায় তিনি এমনই তৎপর ছিলেন যে, সাধু আর চলিত ভাষা পাশাপাশি দেখলেই তাঁর মেজাজ খিঁচড়ে যেত। গুরুচণ্ডালী দোষ তাঁর কাছে প্রায় রাষ্ট্রদ্রোহের সমান অপরাধ। ছাত্ররা তাই তাঁর সামনে কথা বলার সময় শব্দের আগে ব্যাকরণ, ব্যাকরণের আগে অভিধান এবং অভিধানের আগে নিজেদের প্রাণ বাঁচানোর কথা ভাবত।
একদিন সেই মাস্টারমশাই রেশনের লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। লাইন এগোচ্ছে কচ্ছপের গতিতে। পিছন থেকে এক ছাত্র বারবার বলে উঠছে, মাস্টারমশাই ব্যগ্র হন কল্য। মাস্টারমশাই কিছুই বুঝতে পারছেন না। অনেকক্ষণ পরে রেশন দোকানের সামনে গিয়ে টাকা দিতে গিয়ে দেখলেন, মানিব্যাগ নেই। তখন ছাত্রটি এসে জানাল, সে আসলে বলেছিল ব্যাগ গ্রহণ করল। মাস্টারমশাই শুনেছেন ব্যগ্র হন কল্য।
গল্পের আসল মজা হলো, ছাত্রটি পকেটমারকে পকেটমার বলতে পারেনি। কারণ ওই শব্দটি মাস্টারমশাইয়ের ভাষাবোধের কাছে অশুদ্ধ, রুক্ষ এবং অমার্জিত। ফলে ভাষার শুদ্ধতা রক্ষা করতে গিয়ে মানিব্যাগটি গেল, কিন্তু ব্যাকরণ বেঁচে রইল।
বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক ভাষার দিকে তাকালে মনে হয়, আমরা সেই মাস্টারমশাইয়ের উত্তরসূরি। তবে আমাদের সমস্যা একটু উল্টো। আমরা আর ভাষার শুদ্ধতা নিয়ে খুব একটা মাথা ঘামাই না। বরং ভাষার অশুদ্ধতা, অশালীনতা এবং আক্রমণাত্মকতাকে রাজনৈতিক যোগ্যতার প্রমাণ বলে মনে করি। কে কত সুন্দর যুক্তি দিতে পারে, তার চেয়ে কে কত জোরে গালি দিতে পারে, কে কত দ্রুত প্রতিপক্ষকে অপমান করতে পারে, কে কত চমৎকারভাবে কাউকে হেয় করে ভাইরাল হতে পারে, সেটাই যেন নতুন রাজনৈতিক মেধার মাপকাঠি।
দ্বিচারিতা ভাষাকে শুধু নোংরা করছে না, আমাদের বিবেককেও প্রশিক্ষিত করছে। মানুষ ধীরে ধীরে শিখছে, সত্যের চেয়ে দল বড়, যুক্তির চেয়ে আনুগত্য বড়, শালীনতার চেয়ে পক্ষপাত বড়। আজ যে গালি নিজের দলের জন্য গ্রহণযোগ্য, কাল সেটিই অন্য দলের মুখে শুনে আমরা ক্ষুব্ধ হব। ফলে ভাষা আর নীতির বিষয় থাকছে না, ভাষা হয়ে যাচ্ছে দলীয় সম্পত্তি
আগে রাজনীতিতে বক্তৃতা লিখতে মানুষ কলম ধরত। এখন অনেকে মোবাইল ধরলেই বিপ্লবী হয়ে যায়। আগে বক্তৃতায় তথ্য থাকত, ইতিহাস থাকত, দর্শন থাকত, অর্থনীতি থাকত। এখন অনেক বক্তৃতায় থাকে তিনটি জিনিস। রাগ, গালি এবং আত্মবিশ্বাস। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই পরিবর্তনকে আরও মজার করে তুলেছে। ফেসবুকে একটি পোস্ট লিখতে এখন গবেষণা লাগে না, লাগে সাহস। সত্যতা যাচাইয়ের দরকার নেই, কারণ সত্যি হলে পোস্ট হয়তো দশজন পড়বে, আর মিথ্যা হলে দশ হাজার মানুষ শেয়ার করতে পারে। তথ্যের চেয়ে উত্তেজনার বাজারদর বেশি। ফলে যে যত বেশি উত্তেজক, সে তত বেশি জনপ্রিয়।
রাজনৈতিক গালাগাল এখন আর নিছক গালাগাল নয়। এটি একটি পূর্ণাঙ্গ শিল্প। এর নিজস্ব ব্যাকরণ আছে, নিজস্ব অলংকার আছে, নিজস্ব শ্রোতা আছে, এমনকি নিজস্ব অর্থনীতিও আছে। একটি কদর্য শব্দ উচ্চারণ করা হলো, ভিডিও তৈরি হলো, কয়েকটি কাটছাঁট হলো, সঙ্গে উত্তেজক থাম্বনেইল, তারপর ইউটিউবে আপলোড। ঘণ্টাখানেকের মধ্যে কয়েক লাখ ভিউ। বক্তা খুশি, অনুসারীরা খুশি। শুধু ভাষা বেচারা কোথায় গেল, তার খোঁজ কেউ রাখল না।
আমাদের রাজনৈতিক অভিধানও বেশ সমৃদ্ধ হয়েছে। প্রতিপক্ষকে বুদ্ধিহীন বলা এখন পুরোনো ফ্যাশন। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরও নানা ধরনের বিশেষণ। কেউ রাজাকারের দোসর, কেউ দালাল, কেউ চামচা, কেউ চোর, কেউ পাগল, কেউ দেশদ্রোহী, কেউ আবার এমন কিছু শব্দের অধিকারী, যা সংবাদপত্রে লেখা যায় না কিন্তু ফেসবুকের কমেন্ট বক্সে অবলীলায় লেখা যায়। রাজনৈতিক মতভেদ এখন অনেক সময় এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে, প্রতিপক্ষের যুক্তির জবাব দিতে না পারলে তার বংশপরিচয়, পারিবারিক জীবন, ব্যক্তিগত সম্পর্ক, পোশাক, চেহারা এবং এমনকি তার মায়ের রান্না নিয়েও আলোচনা শুরু হয়ে যায়।
যুক্তি শেষ, আত্মীয়স্বজন শুরু। এখানেই সমস্যাটা গুরুতর। রাজনীতিতে তীব্র ভাষা থাকবে না, এমন কথা কেউ বলছে না। বরং ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্নীতি, অন্যায়, বৈষম্য, নিপীড়ন কিংবা রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার বিরুদ্ধে কঠোর ভাষায় কথা বলা গণতন্ত্রের স্বাভাবিক অংশ। কিন্তু কঠোর ভাষা আর কদর্য ভাষা এক জিনিস নয়। তীক্ষ্ণ সমালোচনা আর ব্যক্তিগত অপমানও এক জিনিস নয়। ছুরি দিয়ে অস্ত্রোপচার করা যায়, আবার কাউকে আঘাতও করা যায়। ছুরির দোষ নেই, ব্যবহারকারীই আসএখন যে সবচেয়ে বেশি চিৎকার করে, তাকেই সবচেয়ে সাহসী মনে হয়। যে সবচেয়ে বেশি গালি দেয়, তাকে মনে হচ্ছে সবচেয়ে নির্ভীক। যে সবচেয়ে বেশি অপমান করতে পারে, তার রাজনৈতিক জনপ্রিয়তা তত বেশি। ফলে ভদ্রতা হয়ে যাচ্ছে দুর্বলতার লক্ষণ, সংযম হয়ে যাচ্ছে ভীরুতার নাম, আর অশ্লীলতা হয়ে উঠছে বীরত্বের পদক।
টেলিভিশনের টকশোরও কম অবদান নেই। কিছু অনুষ্ঠান দেখে মনে হয়, দেশের সবচেয়ে বড় সংকট অর্থনীতি, বেকারত্ব, শিক্ষা, স্বাস্থ্য বা দুর্নীতি নয়। সবচেয়ে বড় সংকট হলো কে কার কথা শেষ করতে দেবে। একজন কথা শুরু করলেন, দ্বিতীয়জন মাঝখানে ঢুকলেন, তৃতীয়জন চিৎকার করলেন, উপস্থাপক সবাইকে থামাতে গিয়ে নিজেই চিৎকার শুরু করলেন। শেষে দর্শক বুঝলেন না কেউ কী বললেন, কিন্তু নিশ্চিত হলেন যে সবাই খুব বলেছেন!
এখন আবার টকশোর সংক্ষিপ্ত সংস্করণ এসেছে ইউটিউবে। সেখানে বিশ মিনিটের আলোচনা থেকে সবচেয়ে উত্তপ্ত বিশ সেকেন্ড কেটে নেওয়া হয়। তারপর শিরোনাম হয় এমন, যা দেখে মনে হবে দেশের ভাগ্য নির্ধারণ হয়ে গেছে। থাম্বনেইলে দুজন রাজনীতিবিদের মুখ, একজনের মুখে বিস্ময়, অন্যজনের মুখে ক্রোধ, মাঝখানে আগুনের ছবি। নিচে লেখা আজ ধুয়ে দিলেন, কাঁপিয়ে দিলেন, মুখোশ খুলে দিলেন। মনে হয়, রাষ্ট্র নয়, প্রতিদিন যেন কারও না কারও মুখোশ খোলাই আমাদের জাতীয় উৎপাদন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কমেন্ট বক্সে আবার গণতন্ত্রের এক অভিনব সংস্করণ তৈরি হয়েছে। এখানে ভোট নেই, নির্বাচন নেই, সংসদ নেই। আছে কেবল মন্তব্য। আপনি কিছু লিখলেন, কেউ আপনাকে পছন্দ করল না, সঙ্গে সঙ্গে আপনার রাজনৈতিক পরিচয় নির্ধারিত হয়ে গেল। আপনি যদি এক দলের সমালোচনা করেন, আপনি অন্য দলের লোক। অন্য দলের সমালোচনা করলে আবার প্রথম দলের লোক। দুই দলেরই সমালোচনা করলে সন্দেহ আরও বেড়ে যায়। তখন আপনি নিশ্চয়ই কোনো গোপন এজেন্ডার লোক।
অর্থাৎ আমাদের দেশে এখন নিরপেক্ষ থাকারও বিপদ আছে। আরেকটি মজার ব্যাপার হলো, রাজনৈতিক আনুগত্য মানুষের ভাষাবোধকেও বদলে দিয়েছে। নিজের দলের নেতা একই শব্দ ব্যবহার করলে সেটি সাহসী বক্তব্য। প্রতিপক্ষ ব্যবহার করলে সেটিই অশ্লীলতা। নিজের দলের লোক কাউকে অপমান করলে সেটি রাজনৈতিক রসিকতা। প্রতিপক্ষ করলে সেটি চরিত্রহীনতা। নিজের দলের লোক গুজব ছড়ালে সেটি তথ্যযুদ্ধ। অন্য পক্ষ করলে সেটি অপপ্রচার। একই শব্দ, দুই অভিধান।
এই দ্বিচারিতা ভাষাকে শুধু নোংরা করছে না, আমাদের বিবেককেও প্রশিক্ষিত করছে। মানুষ ধীরে ধীরে শিখছে, সত্যের চেয়ে দল বড়, যুক্তির চেয়ে আনুগত্য বড়, শালীনতার চেয়ে পক্ষপাত বড়। আজ যে গালি নিজের দলের জন্য গ্রহণযোগ্য, কাল সেটিই অন্য দলের মুখে শুনে আমরা ক্ষুব্ধ হব। ফলে ভাষা আর নীতির বিষয় থাকছে না, ভাষা হয়ে যাচ্ছে দলীয় সম্পত্তি।
একজন বক্তা যদি জানেন যে একটি অশ্লীল শব্দ বললে তাঁর ভিডিও বেশি ছড়াবে, তাহলে তিনি পরদিন আরও বড় শব্দ খুঁজবেন। এরপর আরও বড়। এভাবে একসময় ভাষারও মূল্যস্ফীতি ঘটে। পাঁচ বছর আগে যে শব্দে মানুষ চমকে উঠত, এখন সেটিতে কেউ চমকায় না। ফলে আরও কদর্য শব্দ দরকার হয়। এই প্রবণতার সবচেয়ে বড় শিকার তরুণরা। কারণ তারা রাজনীতির অনেক কিছু শিখছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে। সেখানে যদি তারা দেখে রাজনীতি মানেই কাউকে অপমান করা, মতভেদ মানেই শত্রুতা, বিতর্ক মানেই গালাগাল, তাহলে ভবিষ্যতের রাজনৈতিক সংস্কৃতিও সেই ছাঁচে তৈরি হবে। তখন সংসদে যুক্তি কমবে, শব্দের তাপমাত্রা বাড়বে। নির্বাচনী ইশতেহার ছোট হবে, ব্যক্তিগত আক্রমণের তালিকা বড় হবে। রাজনৈতিক সভায় নীতি নিয়ে আলোচনা কমে গিয়ে কে কাকে কী বলেছে তার হিসাব বাড়বে। আর জনগণ ভাববে, দেশটা তাহলে কারা চালাচ্ছে, রাজনীতিবিদরা নাকি কমেন্ট বক্সের বীরেরা।
অথচ রাজনীতির সবচেয়ে কঠিন কাজ হলো নিজের ভাষাকে নিয়ন্ত্রণ করা। অন্যকে গালি দেওয়া খুব সহজ। নিজের রাগকে সামলানো কঠিন। প্রতিপক্ষকে ছোট করা সহজ। তার যুক্তির উত্তর দেওয়া কঠিন। চিৎকার করা সহজ। শোনা কঠিন।
লেখক : রম্যরচয়িতা
(এই লেখা লেখকের একান্ত ব্যক্তিগত অভিমত; এ সংক্রান্ত কোনো দায় দৈনিক মূলধারা বহন করবে না)













