মানবাধিকার শুধু আইনগত বিষয় নয়; এটি মানবিকতা, নৈতিকতা এবং সভ্যতার ভিত্তি। প্রতিটি মানুষ জন্মগতভাবে যে মৌলিক অধিকার নিয়ে পৃথিবীতে আসে এবং যা কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা রাষ্ট্র কেড়ে নিতে পারে না তাই মানবাধিকার। আমাদের মানবজীবনের মর্যাদা রক্ষা, স্বাধীনভাবে বাঁচার সুযোগ, নিরাপত্তা, শিক্ষা, স্বাস্থ্যের সুযোগ এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা আমাদের মানবাধিকারগুলো নিশ্চিত করে।
বাংলাদেশ একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে সবসময়ই মানবাধিকার রক্ষাকে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করেছে। মানুষ হিসেবে আমাদের যে মৌলিক অধিকার আছে, সেটা শুধু আইন দিয়ে নয়, মানবিক দায়িত্ব দিয়ে রক্ষা করাও আমাদের কর্তব্য। ১৯৪৮ সালের ১০ ডিসেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ‘সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণা’ গৃহীত হওয়ায় এই দিনটিকে গোটা বিশ্বে ‘মানবাধিকার দিবস’ হিসেবে পালন করা হয়ে আসছে। গতকাল আমাদের দেশেও এই দিবসটি পালিত হয়েছে। এ দিবস শুধু স্মরণীয় নয়, বরং মানব সমাজকে ন্যায়, স্বাধীনতা, মর্যাদা এবং নিরাপত্তার পথে এগিয়ে যেতে আহ্বান জানায়।
মানবাধিকার মূলত জীবন, স্বাধীনতা, নিরাপত্তা, মতপ্রকাশ, ধর্ম পালন, শিক্ষা গ্রহণ, কর্মসংস্থান, বৈষম্য থেকে মুক্ত থাকা এবং উন্নত জীবনের সুযোগ পাওয়ার অধিকারকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। জন্মগতভাবে প্রতিটি মানুষ যে অধিকার নিয়ে জন্মায় এবং সেটা কোনো রাষ্ট্র, কোনো ব্যক্তি বা কোনো সংগঠন তা থেকে বঞ্চিত করতে পারে না। মানবাধিকার দিবস পালনের গুরুত্ব সবচেয়ে বেড়ে যায় তখন, যখন বিশ্বের কোনো অংশে মানুষ বঞ্চনার শিকার হয়। অন্যায়, দারিদ্র্য, বৈষম্য, বর্ণবাদ, ধর্মীয় হিংসা, নারী এবং শিশু নির্যাতন, স্বাধীন মতপ্রকাশ দমনে মানুষ প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হয়। বাংলাদেশে নির্বাচনের আগে ও পরে মানবাধিকার লঙ্ঘনের চিত্র দেখা যায়। রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের পরিবর্তনের পরে হত্যা, ধর্ষণ, লুণ্ঠন ইত্যাদির খবর ব্যাপক হারে সামনে চলে আসে। এক সমীক্ষার মতে, গত নভেম্বর মাসে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের ধারায় কমপক্ষে ১ হাজার ৯৯৩ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে, যেখানে বিএনপির নেতাকর্মীরাও রয়েছেন। বিশেষ অভিযানে ৬ হাজারের অধিক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। কিন্তু অনেকের জামিনের বিষয়ে আপত্তি তোলার অভিযোগ রয়েছে।
বাংলাদেশে মানবাধিকার বিষয়টি বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। স্বাধীনতার পর থেকেই আমরা জাতি হিসেবে মানবাধিকারের প্রতি সম্মানের আহ্বান জানিয়ে এসেছি। আজও দেশের প্রতিটি নাগরিক নিরাপদ জীবন, স্বাধীনতা এবং সম্মানের অধিকার রাখেন। তবে বাস্তবে এখনো নারী নির্যাতন, শিশু শ্রম, দারিদ্র্য, বর্ণ বৈষম্য, লিঙ্গ বৈষম্য হ্রাস করা সম্ভব হয়নি। নভেম্বর মাসে বিভিন্ন তথ্যমতে, শিশু ও নারী সহিংসতার অংশ হিসেবে ১৭৭ জন নারী ও কন্যাশিশু যৌন নির্যাতনের মধ্যে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৪৮ জন যার মধ্যে ২৫ জন শিশু ও কিশোরী এবং ১৩ জন নারী ও কন্যাশিশু গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন। এমনকি দুই জনকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। ৩৬ জন নারী ও কন্যাশিশু যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ১১ জন শিশু। এছাড়াও বিভিন্ন ঘটনায় ১০৩ জন শিশু নির্যাতনের মধ্যে ২০ জন প্রাণহানি ও ৮৩ জন শিশু শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তবে এগুলো দূর করতে শুধু সরকারের নয়, বরং পুরো সমাজের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
শিক্ষা মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় সবচেয়ে বড় শক্তি। মানুষ শিক্ষার মাধ্যমে যখন জানবে তার অধিকার কী এবং সেই অধিকার বঞ্চিত হলে কীভাবে প্রতিরোধ বা প্রতিকার পাবে, তখনই মানবাধিকার কার্যকরভাবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। সে জন্য জনগণকে সচেতন তথা বিদ্যালয়, কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে মানবাধিকার বিষয়ে শিক্ষা দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। একইভাবে পরিবারের ভেতরেও মানুষকে সম্মান, সহনশীলতা এবং পারস্পরিক বোঝাপড়ার শিক্ষা দেওয়া হলে মানবাধিকার লঙ্ঘনের সংখ্যা হ্রাস পাবে।
মানবাধিকার রক্ষা করা যেমন ব্যক্তির দায়িত্ব, তেমনি রাষ্ট্রেরও দায়িত্ব। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো নাগরিককে নিরাপত্তা দেওয়া, বিচার পাওয়ার সুযোগ দেওয়া, বৈষম্য বন্ধ করা, দারিদ্র্য হ্রাস করা এবং স্বাধীনভাবে বাঁচার সুযোগ সৃষ্টি করা, স্বচ্ছ বিচারব্যবস্থা নিশ্চিত করা। আইন সঠিকভাবে প্রয়োগ হলে দুর্নীতি কমে আসবে, নিশ্চিত হবে মানবাধিকার।
আজকের ডিজিটাল বিশ্বের মানবাধিকার নতুন চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। প্রায়ই মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় সীমাবদ্ধতা দেখা যায়। তারই ধারাবাহিকতায় গত নভেম্বর মাসে সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ-২০২৫-এর অধীনে সাতটি মামলায় ৯ জনকে গ্রেফতার ও ২৭ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। এছাড়াও সারা দেশে ২৩টি ঘটনায় ৩৬ জন সাংবাদিককে নির্যাতন ও হয়রানির ঘটনায় ২২ জন আহত, ১১ জন সাংবাদিককে হুমকি ও এক জনকে গ্রেফতার করা হয়। প্রায়ই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানহানি, গোপনীয়তা লঙ্ঘন, সাইবার বুলিং ইত্যাদি সমস্যা দিনদিন বেড়ে যাচ্ছে। এসব সমস্যা নিয়ন্ত্রণের আইন প্রয়োগ এবং সচেতনতা দুটোই প্রয়োজন। একই সঙ্গে সবার প্রযুক্তি ব্যবহারে দায়িত্বশীল আচরণও মানবাধিকার রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
মানবাধিকার রক্ষায় আমাদের প্রত্যেকের কিছু দায়িত্ব রয়েছে। প্রথমত, অন্যের অধিকারের প্রতি সম্মান দেখানো। কাউকে বর্ণ, ধর্ম, লিঙ্গ বা আর্থিক অবস্থার ভিত্তিতে বৈষম্য করা মানবাধিকার লঙ্ঘন বটে। অর্থনৈতিক খাতে শ্রমিকদের অবদান গুরুত্বপূর্ণ। তাই রাষ্ট্রে শ্রমিকদের অধিকার ও নিরাপদ কর্মক্ষেত্র নিশ্চিত করা জরুরি। তবে বিভিন্ন তথ্যমতে, গত নভেম্বরে অনিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং চরম অবহেলায় দুর্ঘটনার শিকার হয়ে ১৪ জন শ্রমিক কর্মক্ষেত্রে মারা যান। দ্বিতীয়ত, অন্যায় দেখা দিলে চুপ না থাকা। অন্যের ওপর অন্যায় হলে সেটা শুধু তার সমস্যা নয়। তৃতীয়ত, নিজের অধিকার জানার পাশাপাশি দায়িত্ব পালন করা। স্বাধীনতা শুধু পাওয়ার নয়, দায়িত্বও বহন করার বিষয়।
ব্যক্তি, সমাজ এবং রাষ্ট্র—এ তিন স্তরেই মানবাধিকার সুরক্ষা নিশ্চিত না করলে জনকল্যাণকর রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। ব্যক্তি অন্যকে সম্মান দিলে, সমাজ অন্যায় প্রতিরোধ করলে এবং রাষ্ট্র আইন প্রয়োগ করলে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা পাবে। মানবাধিকার শুধু কোনো দিবসে নয়, বরং প্রতিদিন পালনীয়। প্রতিটি ক্ষেত্রেই মানবিকতা বজায় রাখাই মানবাধিকার রক্ষা।
দুঃখজনক ব্যাপার হলো, গত ১১ মাসে দেশে গুম ও ক্রসফায়ারের ঘটনা না ঘটলেও রাজনৈতিক সহিংসতা, গণপিটুনি, হত্যা, ধর্ষণ ও সাংবাদিকের ওপর হামলা ইত্যাদি বেড়েছে। আরো বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, দেশে মানবাধিকার কমিশন এখনো অকার্যকর। ইতিমধ্যে মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ জারি হলেও মানবাধিকার কমিশন এখনো গঠিত হয়নি। তাই এই ব্যাপারে নজর দেওয়া অত্যাবশ্যক।
যেহেতু মানবাধিকার কোনো রূপকথা নয়, এটি মানুষের বাঁচার অবিচ্ছেদ্য অংশ। মানুষ যখন মর্যাদা নিয়ে বাঁচে, তখনই সমাজ সুন্দর এবং রাষ্ট্র শক্তিশালী হয়। বাংলাদেশে প্রায়ই মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে ওঠে। হেফাজতে নির্যাতন, আত্মস্বীকারোক্তি আদায়ে চাপ, আইনজীবী বা পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগে বাধা ইত্যাদি মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রতীক। হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনাও মাঝে মধ্যে শিরোনাম হয়।
বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে র্যাব, পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানের সময় ‘ক্রসফায়ার’, ‘গোলাগুলি’, ‘এনকাউন্টার’ ইত্যাদি নামে বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগ নতুন নয়। গত কয়েক সরকারের আমলে এ-সংক্রান্ত অনেক অভিযোগ পাওয়া যায়। অনেক ক্ষেত্রে ঘটনাগুলোর সঠিক তদন্ত না হওয়ায় জবাবদিহিতা প্রশ্নের মুখে পড়ে।
কিছু মানবাধিকার সংগঠনের তথ্য অনুযায়ী রাজনৈতিক টানাপড়েন, প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার বা অপরাধী গোষ্ঠীর প্রভাবে গুমের ঘটনা ঘটে। পরিবারগুলো দীর্ঘ সময় ধরে ভোগান্তিতে থাকে এবং অধিকাংশ ঘটনায় তদন্তের অগ্রগতি ধীর প্রকৃতির। জাতিগত সংখ্যালঘু, ধর্মীয় সংখ্যালঘু, পাহাড়ি জনগোষ্ঠী, দলিত সম্প্রদায়সহ বিভিন্ন গোষ্ঠী ভূমি বিরোধ, সহিংসতা বা বৈষম্যের শিকার হয়। ন্যায়বিচার ও নিরাপত্তা পাওয়ার ক্ষেত্রে কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে।
ধর্ষণ, যৌন হয়রানি, গৃহ-নির্যাতন, বাল্যবিবাহ, পাচার ইত্যাদি নারী ও শিশুদের অধিকারকে গুরুতরভাবে লঙ্ঘন করে। অনেক ঘটনা সামাজিক ভয় বা বিচার প্রাপ্তির অনিশ্চয়তায় প্রকাশ পায় না। গার্মেন্টস শ্রমিক, দিনমজুর, কৃষি শ্রমিকসহ অনেক ক্ষেত্রেই মজুরি বৈষম্য, নিরাপদ কর্মপরিবেশের অভাব, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, শ্রমিক ইউনিয়ন গঠনের বাধা ইত্যাদি মানবাধিকার লঙ্ঘনের উদাহরণ।
অতএব, সরকারের উচিত সব নাগরিকের সচেতনতা বৃদ্ধি ও প্রশাসনিক জবাবদিহিতার মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটানো। স্বচ্ছ বিচার ব্যবস্থার মাধ্যমে মানুষের মৌলিক ও সাংবিধানিক অধিকার কার্যকরভাবে নিশ্চিত করা। মোদ্দাকথা, জনকল্যাণকর রাষ্ট্র গঠন করতে হলে সর্বত্র মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার কোনো বিকল্প নেই।













