মাদুরো সরকারের ওপর ট্রাম্প প্রশাসন যখন সামরিক চাপ বৃদ্ধি করা শুরু করে, তখন অবধারিতভাবে এই বিতর্ক সামনে চলে আসে যে, যুক্তরাষ্ট্র ভেনিজুয়েলায় ‘শাসন পরিবর্তন’ (রেজিম চেঞ্জ) করতে চাইছে? ‘রেজিম চেঞ্জ’ শব্দবন্ধটি আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বেশ বিতর্কিত এবং এর সংগত কারণও রয়েছে। আমেরিকার দীর্ঘ ও হতাশাজনক স্মৃতিবিজড়িত ইরাক এবং আফগানিস্তান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে কথাটি বহুল আলোচিত হয়ে ওঠে।
মার্কিন সামরিক বাহিনী সাধারণত বিভিন্ন মিশন বাস্তবায়নের জন্য প্রশিক্ষণ পেয়ে থাকে এবং সে মোতাবেক প্রস্তুত থাকেন সেনারা। যেমন—শত্রুকে নিরুত্সাহিত করা, মিত্রদের রক্ষা করা, নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে আক্রমণ চালানো, অবরোধ কার্যকর করা, মানবিক সহায়তা প্রদান ইত্যাদি। এ ধরনের মিশন সচরাচর সামরিক তত্ত্ব দ্বারা সংজ্ঞায়িত, আইন দ্বারা অনুমোদিত ও বাজেটের মাধ্যমে অর্থায়িত হয়ে থাকে। এমনকি দশকের পর দশক ধরে সেনাদের এর জন্য প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। তবে এখানে ‘রেজিম চেঞ্জ’ ধারণার কোনোই অস্তিত্ব পাওয়া যায় না। কেননা, এটি কোনো সামরিক মিশন নয়। উপরন্তু, মার্কিন সামরিক বাহিনীর একার পক্ষে কোনো দেশের রাজনৈতিক কাঠামো পরিবর্তন করা অসম্ভব।
মূলত ‘রেজিম চেঞ্জ’ হলো একটি সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক তত্পরতা, যা জটিল, ব্যয়বহুল এবং অনিশ্চিয়তা বয়ে আনে। ২০০৩ সালে ইরাক যুদ্ধের কথা আমার মনে আছে, তত্কালীন প্রতিরক্ষাসচিব রামসফেল্ড যখন ‘রেজিম চেঞ্জ’কে আমাদের মূল উদ্দেশ্য হিসেবে নির্ধারণ করে দেন, তখন ভেতরকার আলোচনাগুলো কেমন ছিল। শব্দবন্ধটি শুনতে সহজ, কিন্তু বাস্তবতা ছিল কঠিন। অনেক সিনিয়র অফিসারকে দীর্ঘ সময় ধরে বেসামরিক নেতাদের বোঝাতে শুনেছি যে, এভাবে কোনো একটি সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করা এবং এর পরবর্তী পরিণতির সম্পূর্ণ দায়ভার নেওয়া এককভাবে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের কাজ হতে পারে না বা হওয়া উচিতও নয়। পরবর্তী সময়ে অবশ্য প্রমাণিত হয়, মার্কিন সামরিক বাহিনী এবং মিত্র ও অংশীদারদের সহযোগিতায় খুব দ্রুত সাদ্দাম হোসেনের সেনাবাহিনী ও সরকারকে ধ্বংস করতে সক্ষম হওয়া আর দেশটির শাসনব্যবস্থাকে ফেলে দেওয়া এক কথা নয়। আবার, সেই শাসনব্যবস্থাকে প্রতিস্থাপন করাটাও আরেক কঠিন ব্যাপার।
সামরিক পেশাদারিত্বের দৃষ্টিকোণ থেকে, একটি শাসনব্যবস্থা প্রতিস্থাপন করার জন্য সামরিক শ্রেষ্ঠত্বের চেয়েও বেশি কিছু থাকা প্রয়োজন। এর জন্য প্রয়োজন মিত্রদের ব্যবস্থাপনা, সংঘাত-পরবর্তী নিরাপত্তা ও সিভিল অ্যাফেয়ার্স বাহিনী, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, নতুন সরকারের রাজনৈতিক বৈধতা এবং এমন হাজারো বিষয়ের পরিকল্পনা। প্রশ্ন হলো, এসব বিষয় সামরিক বাহিনী কি সম্পূর্ণ বোঝে বা তাদের বুঝতে পারার কথা?
২০০২ এবং ২০০৩ সালের ঘটনা। মার্কিন সামরিক বাহিনী ইরাকে ‘রেজিম চেঞ্জ’ সম্পন্ন করতে পারবে—এমন যুক্তি দিতে গিয়ে পেন্টাগনের ভেতরে ও বাইরের বেসামরিক প্রবক্তারা নির্ভুল হামলা, বড় আকারের আক্রমণ এবং লজিস্টিক প্রবাহের প্রসঙ্গ উপস্থাপন করেছিলেন। তবে এই সক্ষমতাগুলো ছিল কেবল সামরিক যুদ্ধের প্রস্তুতির ধাপ, রাজনৈতিক পরিণতির নয়।
‘রেজিম চেঞ্জ’-এর সুনির্দিষ্ট অর্থ কী? এর অর্থ কি কেবল একজন নেতাকে সরিয়ে দেওয়া, নাকি পুরো শাসনকাঠামো ভেঙে ফেলা? অথবা এটি কি নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করার পদ্ধত্বি? প্রসঙ্গত, একজন নেতাকে সরিয়ে দিলেই শাসনব্যবস্থা বদলে যায় না। এমনকি পুরো শাসনব্যবস্থা ভেঙে দিলেও তা স্বয়ংক্রিয়াভাবে পরবর্তী ব্যবস্থার বৈধতা নিশ্চিত করে না।
প্রশ্ন হলো, পুরোনো ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার পরের দিন কে শাসন করবেন? যখন পুলিশ, সেনাবাহিনী এবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সংস্থাগুলো ভেঙে যাবে বা বিদ্রোহ শুরু করবে, তখন নিরাপত্তা কে দেবে? যখন পুরোনো আমলারা পালিয়ে যাবে, তখন অর্থনীতি স্থিতিশীল করা, মৌলিক সেবা পুনরুদ্ধার এবং প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠনের খরচ কে দেবে? এবং কতদিন পর্যন্ত হস্তক্ষেপকারী শক্তি সেই ফলাফলের জন্য দায়ী থাকবে, যা তারা কেবল প্রভাবিত করতে পারে কিন্তু পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না? মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বারবার শত্রু বাহিনীকে পরাজিত করার অসাধারণ পরিকল্পনা দেখিয়েছে, কিন্তু এর ফলে সৃষ্ট রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক শূন্যতা পূরণ করতে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে।
নিউ ইয়র্ক টাইমসের এক রিপোর্ট অনুযায়ী, ভেনিজুয়েলায় ট্রাম্প প্রশাসন তিনটি লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে—নিকোলাস মাদুরোর ক্ষমতা সীমিত করা, মাদক কার্টেলগুলোর বিরুদ্ধে সামরিক শক্তি ব্যবহার করা এবং ভেনিজুয়েলার বিশাল তেল সম্পদের দখল নিশ্চিত করা। বস্তুত, প্রতিটি লক্ষ্যই এককভাবে একটি জটিল জাতীয় উদ্যোগ এবং একত্রে এগুলো আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক প্রভাবসম্পন্ন এক বিশাল এজেন্ডা।
সবচেয়ে ইঙ্গিতপূর্ণ লক্ষ্য হলো প্রথমটি—‘মাদুরোর ক্ষমতা সীমিত করা।’এটা শুনতে বেশ সংযত মনে হয়, কিন্তু লক্ষ্যটি অস্পষ্ট। এসব ক্ষেত্রে প্রশাসন যখন সামরিক কর্মীদের তাদের ডিউটির মেয়াদ বাড়াতে এবং ঝুঁকির মুখে পড়তে নির্দেশ দেয়, তখন তারা এটা ব্যাখ্যা করে না যে, তাদের লক্ষ্য কি হবে? মাদুরোকে প্রতিবেশী দেশ বা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সমস্যা সৃষ্টি থেকে বিরত রাখা হবে, নাকি তার চারপাশের লোকদের ভয় দেখিয়ে তাকে সরিয়ে দেওয়া হবে, নাকি সরাসরি ভেনিজুয়েলার কর্তৃত্ববাদী সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করা হবে। এভাবেই একটি দেশ এমন সব প্রতিশ্রুতির দিকে ধাবিত হয়, যা তারা পুরোপুরি খতিয়ে দেখে না। চাপ তখন হস্তক্ষেপে রূপ নেয় এবং সংকীর্ণ লক্ষ্যগুলো পরিণত হয় বিশাল দায়িত্বে।
মার্কিন বেসামরিক নেতাদের উচিত হবে, এই বিষয়গুলো সম্পর্কে সচেতন হওয়া—
প্রথমত, সামরিক বিজয় মানেই রাজনৈতিক সাফল্য নয়। একটি শাসনব্যবস্থাকে সহজে টপকে যাওয়া যায়, কিন্তু একটি দেশকে স্থিতিশীল করা কখনো সহজ হয় না। আমেরিকার সফলতম ‘রেজিম চেঞ্জ’গুলোতেও অনেক বছর সময় লেগে গেছে। যেমন—দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মার্কিন বাহিনী চার বছর জার্মানি দখল করে রেখেছিল; জাপানে সেই দখলদারিত্ব স্থায়ী হয়েছিল সাত বছর এবং আজও উভয় দেশে মার্কিন বাহিনী মোতায়েন রয়েছে।
দ্বিতীয়ত, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে ভেঙে ফেলা বা অকার্যকর করার ফলে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়। পুলিশ বা সেনাবাহিনী রাতারাতি বিলীন হয় না। আমলাতন্ত্র বা অর্থনৈতিক ব্যবস্থা টিকে থাকে। এর ফলে মাথাচাড়া দেয় বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী; ঘিরে ধরে বেতনহীন কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং শৃঙ্খলার জন্য মরিয়া একটি জনগোষ্ঠী।
তৃতীয়ত, বাইরের শক্তিগুলো সব সময়ই ‘রেজিম চেঞ্জ’-এর শূন্যতা দিয়ে ঢুকে পড়ার চেষ্টা করে। ২০০৩ সালে ইরান ও মিলিশিয়া গোষ্ঠীগুলো কী করেছিল? তারা কিন্তু বিনয়ের সঙ্গে বসে অপেক্ষা করেনি। একইভাবে, ভেনিজুয়েলার বন্ধু হিসেবে কিউবা, চীন, রাশিয়া ও ইরান রয়েছে; রয়েছে ঐ অঞ্চলে অত্যন্ত সুসংগঠিত গোষ্ঠীগুলোও। তারা কি বসে থাকবে?
চতুর্থত, আমাদের ইরাক থেকে শেখা উচিত ছিল যে, ‘বৈধতা’ আমদানি করা যায় না। সরকার বৈধতা পায় তার নিজের জনগণের কাছ থেকে, বিদেশি পতাকা বা প্রবাসীদের কাছ থেকে নয়।
সবশেষে, ইরাক নিয়ে প্রথমে যা কয়েক মাস বা বছরের পরিকল্পনা ছিল, তা গড়ায় দশকের ঘরে। যুক্তরাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত ইরাকে খাপ খাইয়ে নিয়েছিল বটে, কিন্তু তার মূল্য দিতে হয়েছে অনেক জীবন, বিশ্বাসযোগ্যতা এবং কৌশলগত অবস্থানের বিনিময়ে।
সুতরাং, যদি ভেনিজুয়েলায় ‘রেজিম চেঞ্জ’ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়, তাহলে সামরিক বাহিনীকে একটি দীর্ঘমেয়াদি এবং ক্লান্তিকর অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা মিশনের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। সামরিক ও বেসামরিক নেতাদের এই সত্য মেনে নিতে হবে যে, যুদ্ধ শেষ হওয়ার অনেক পরেও হতাহতের ঘটনা ঘটবে। সুতরাং, যারা ভেনিজুয়েলায় রেজিম চেঞ্জের সপক্ষে, তারা আসলে একটি দীর্ঘ, রক্তক্ষয়ী এবং ব্যয়বহুল অঙ্গীকারের ওকালতি করছেন। স্মর্তব্য, রেজিম চেঞ্জ হলো আমাদের হাতে থাকা যাবতীয় উপায়ে অন্য একটি দেশের রাজনীতির রূপান্তর, যা আদতে কোনো কৌশল নয়, বরং একধরনের জুয়া।
লেখক : ইউরোপে নিযুক্ত সাবেক ইউএস আর্মি কমান্ডার ও ইরাক যুদ্ধে বহুজাতিক ডিভিশন-নর্থ-এর নেতৃত্বদানকারী
- যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ওপিনিয়ন ওয়েবসাইট বালওয়ার্ক থেকে নেওয়া (ইংরেজি থেকে অনূদিত)













