বাংলাদেশ সরকার দীর্ঘদিন ধরে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সমাজের মূল স্রোতধারায় সম্পৃক্ত করতে এবং অধিকার নিশ্চিত ও জীবনমান উন্নয়নে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ বাস্তবায়ন করে আসছে। প্রতিবন্ধিতার ধরন অনুযায়ী ভাতা, প্রতিবন্ধী শিক্ষা উপবৃত্তি, সেবার পরিধি বৃদ্ধি, সমন্বিত শিক্ষানীতি, জেলা পর্যায়ে প্রতিবন্ধী সেবা ও সহায়তা কেন্দ্র, স্কুলে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য ব্রেইল বই প্রদান, সহায়ক প্রযুক্তির ব্যবস্থা, দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ, হুইলচেয়ার, হিয়ারিং এইড, সাদা ছড়িসহ বিভিন্ন সহায়ক উপকরণ প্রদান করে আসছে, যা দেশের লাখো প্রতিবন্ধী নাগরিককে আত্মনির্ভরতার পথে এগিয়ে নিচ্ছে।
এছাড়া বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, এনজিও ও সিএসআর নির্ভর উদ্যোগসমূহ প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের শিক্ষা, পুনর্বাসন, দক্ষতা উন্নয়ন, কর্মসংস্থান ও নেতৃত্ব বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। তার মধ্যে বার্ডো দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী আবাসিক বিদ্যালয় পরিচালনা, বিনা মূল্যে ব্রেইল শিক্ষা প্রদান, বার্ডো চক্ষু হাসপাতাল স্বল্পমূল্যে চক্ষুসেবা প্রদান, কম্পিউটার ও আইসিটি প্রশিক্ষণ, দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী তরুণ-তরুণীদের দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি, কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টিতে সহযোগিতা এবং দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিশু ও প্রাপ্তবয়স্কদের কাউন্সেলিং করে আসছে। এসব প্রতিষ্ঠান প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা, ইনক্লুসিভ কর্মপরিবেশ এবং পরিবার ও কমিউনিটিভিত্তিক সাপোর্টের মাধ্যমে দেশের সমগ্র প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীকে মূলধারায় সম্পৃক্ত করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে।
প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সম্পূর্ণ রূপে সমাজে মূল ধারার সঙ্গে এগিয়ে নিতে হলে প্রয়োজন—‘প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন-২০১৩’-এর আইনের পূর্ণ বাস্তবায়ন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পূর্ণ প্রবেশযোগ্যতা নিশ্চিতকরণ, ডিজিটাল ও সহায়ক প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার বিস্তার, সরকারি-বেসরকারি খাতে কোটাভিত্তিক কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি, স্বনির্ভর ও উদ্যোক্তা উন্নয়ন কর্মসূচি জোরদার, সুলভমূল্যে আধুনিক সহায়ক যন্ত্রপাতি সরবরাহ এবং স্থানীয় পর্যায়ে প্রতিবন্ধী-বান্ধব জনসেবা উন্নয়ন।
প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ক্ষমতায়ন ও অধিকার নিশ্চিতকরণের জন্য কতিপয় প্রয়োজনীয় সুপারিশ :
১. দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তিসহ সব ধরনের প্রতিবন্ধী ব্যক্তির রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে সংসদে সংরক্ষিত আসন নির্ধারণ করা।
২. ‘প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ও ক্ষমতায়ন বিষয়ক মন্ত্রণালয়’ নিশ্চিত করা, যেখানে প্রতিবন্ধিতাবিষয়ক সব নীতি, বাজেট, কর্মসূচি ও সেবাসমূহ সমন্বিতভাবে পরিচালিত হবে।
৩. যোগ্য, দক্ষ, অভিজ্ঞ এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ প্রদান করা।
৪. শুধু প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার, সুরক্ষা, শিক্ষা, কর্মসংস্থান, ভাতা, ক্ষমতায়ন ও অভিগম্যতা নিশ্চিতকরণে দায়িত্বপ্রাপ্ত ‘প্রতিবন্ধী উন্নয়ন বিষয়ক সচিব’ নিয়োগ করা।
৫. ‘প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার ও সুরক্ষা আইন’ শক্তিশালী করা ও এর প্রয়োগ মনিটরিংয়ের জন্য জাতীয় কমিশন গঠন করা।
৬. প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের শিক্ষায়, চলাচলে, প্রযুক্তি ব্যবহারে ও চাকরিতে প্রবেশগম্যতা বাধ্যতামূলক করা। ৭. ভাতা, সেবা, উপকরণ বিতরণ, শিক্ষা ও কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরে আলাদা ফোকাল উইং গঠন করা। ৮. প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্যে তাদের ভাতা ৫ হাজার টাকায় উন্নীত করা।
আমরা বিশ্বাস করি, সরকারি-বেসরকারি খাত, সামাজিক সংগঠন ও জনগণের সমন্বিত প্রচেষ্টায় আমরা একটি সত্যিকারের প্রতিবন্ধিতা-অন্তর্ভুক্তিমূলক, মানবিক ও সমতাভিত্তিক সমাজ গড়ে তুলতে সক্ষম হব। প্রতিটি প্রতিবন্ধী ব্যক্তির ক্ষমতা, সৃজনশীলতা ও অংশগ্রহণই আমাদের রাষ্ট্রের সামাজিক অগ্রগতির প্রধান শক্তি।













