মানুষের চিন্তাশক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো —`প্রশ্ন করার শক্তি।‘ এই শক্তিই মানুষকে প্রতিনিয়ত বিকশিত করতে থাকে। উত্তর তো পৃথিবীতে সর্বত্র বিচ্ছুরিত—গ্রন্থে, ইতিহাসে, অভিজ্ঞতায়, যুক্তির অবারিত আকাশে; কিন্তু সঠিক প্রশ্ন করার ক্ষমতাই মানুষকে সেই উত্তরের নাগাল দেয়। প্রশ্ন করতে না পারলে জ্ঞান কেবল শব্দের সমষ্টি, কোনো জীবন্ত শক্তি নয়। এজন্য বলা হয়ে থাকে—বাইরে যতই আলো জ্বালিয়ে দাও, যদি অন্তরের প্রদীপ জ্বালাবার শক্তি না থাকে, তাহলে জ্ঞান কখনো প্রস্ফুটিত হয় না। জ্ঞান তখনই সত্য জ্ঞান হয়, যখন মানুষ প্রশ্ন উত্থাপন করতে শেখে; কারণ, প্রশ্ন না থাকলে কোনো সত্যই উদ্ভাসিত হয়ে উঠতে পারে না। উত্তরকে জাগিয়ে তোলার উপায় হলো সঠিক প্রশ্নের সমাহার।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, প্রাচ্য থেকে পাশ্চাত্য—সকল সভ্যতার বৌদ্ধিক উত্কর্ষের পেছনে রয়েছে জিজ্ঞাসার দুরন্ত শক্তি। গ্রিক দার্শনিকরা সমাজকে প্রশ্ন করার প্রয়াসেই সৃষ্টি করেছিলেন দর্শনের নব নব অধ্যায়। সভ্যতার প্রতিটি উত্থানেই আমরা দেখেছি—জিজ্ঞাসাই পরিবর্তনের জন্মদাতা।
উপনিষদের ‘কেন’, বুদ্ধের ‘কীসের দ্বারা দুঃখের অবসান’, সক্রেটিসের ‘নিজেকে জানো’, রেনেসাঁর ‘মানুষ কি সত্য জানতে পারে’—এগুলোই মানবমুক্তির পথ নির্মাণ করেছে। অথচ আজকের সমাজে সেই জিজ্ঞাসাই যেন অবহেলার ছায়ায় আচ্ছন্ন। বিশেষত, উন্নয়নশীল বিশ্বের বহু দেশে প্রশ্ন করার স্থান আজ সংকুচিত। শিক্ষার জগত্ মুখস্থবিদ্যার চাপে ভারাক্রান্ত; বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গবেষণার পরিবর্তে সনদ তৈরির কারখানায় রূপান্তরিত। পাঠ্যক্রম জুড়ে থাকে ‘কী’, কিন্তু সেখানে অনুপস্থিত ‘কেন’।
আজকের পৃথিবী তথ্যের স্রোতে প্লাবিত; কিন্তু এই স্রোত জ্ঞানের নয়—এটা কেবল তুচ্ছ তথ্যের বেগবান প্রবাহ। স্মরণশক্তির ক্লেশ হ্রাস করলেও এই তথ্য মানুষকে গভীরতা দেয় না; বরং তাকে ওপরে ওপরে ভাসিয়ে রাখে। জ্ঞানের পথ একসময় ছিল ধীর, মন্থর, সংযত; আজ তা প্রতিযোগিতার দৌড়ে প্রায় অদৃশ্য। ফলে মানুষের প্রশ্ন জাগানোর অবকাশ কমে গেছে। যেই সমাজ ভাসমান তথ্যেই তুষ্ট থাকে, সেই সমাজ গভীর সত্যের মুখ কখনো দেখে না।
বই পাঠ, পাঠাগার সংস্কৃতি ও চিন্তার গভীরতা—এই তিনটি স্তম্ভ যেই সমাজে দুর্বল হয়, সেই সমাজের ভবিষ্যত্ও দুর্বল হয়। দুঃখজনকভাবে, আমাদের চারপাশে এখন প্রশ্নহীনতার এই পরিবেশকে আরো ঘন করে তোলার আয়োজন চলছে। মানুষকে ব্যস্ত রাখার জন্য নিত্যনতুন বিনোদন, উত্তেজনা, ঝলমলে বিভ্রম সাজিয়ে দেওয়া হচ্ছে। মানুষের মনোযোগ এত সংকীর্ণ করে ফেলা হচ্ছে যে, দীর্ঘ কোনো যুক্তি-পথ অতিক্রম করার শক্তিই তার মধ্যে থাকছে না!
ফেসবুক ইউটিউবের রিলস-শর্টসের ক্ষণস্থায়ী চমক মানুষের চিন্তার গভীরতাকে প্রতিনিয়ত খণ্ডিত করছে। অবচেতন মনে আমরা যেন স্বল্প সময়ের উত্তেজনাকে জ্ঞানের স্থলে বসিয়ে দিচ্ছি। এই পরিবেশে যে ব্যক্তি শান্তভাবে বই খুলে বসে, তার মনই কেবল সত্যের পথে পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারে। বই মানুষকে থামতে শেখায়, ভাবতে বাধ্য করে, যুক্তির পথ দেখায় এবং প্রচলিত সত্যের ভেতর লুকানো প্রশ্নগুলোকে উন্মোচিত করে। বহুল পঠনপাঠন মানুষকে শেখায়—সমাজের প্রতিটি সিদ্ধান্ত কি সত্যিই ন্যায়যুক্ত? ক্ষমতার প্রতিটি নির্দেশ কি সত্যিই সংগত? এবং প্রচলিত প্রতিটি নীতি কি সত্যিই মানুষের মঙ্গল বহন করে? এর বিপরীতে, প্রশ্নহীন সমাজ মানুষকে নতশির হতে শেখায়। এটা সকল সময়ে, সকল যুগেই সত্য বাণী।
অতএব, আজকের যুগে সর্বাপেক্ষা প্রয়োজনীয় শিক্ষা হলো—মানুষকে জিজ্ঞাসু করে তোলা। শিক্ষার্থীদের মুখস্থের অতলসাগর থেকে উদ্ধার করে চিন্তার আকাশে ডানা মেলতে দেওয়া, সত্যকে যাচাই করার সাহস দেওয়া। প্রশ্ন করতে শেখা মানেই অজ্ঞতার শৃঙ্খল ভাঙা; প্রশ্ন করতে শেখা মানেই সমাজের অন্ধকারে আলোর রেখা আঁকা। এজন্য যেই সমাজ প্রশ্ন করতে জানে, তাকে আর কখনোই অন্ধকারে আবদ্ধ রাখা যায় না।












