বাংলাদেশে আজকাল এমন এক রাজনৈতিক মৌসুম চলছে যেখানে দলে দলে গোষ্ঠীতে গোষ্ঠীতে বিবাদ-বিরোধ বাড়ছে। কোনো কোনো গোষ্ঠী আবার সেই বিরোধের আগুনে অকাতরে ঘি ঢালছে। হঠাত্ই রাজনীতির হাঁড়িতে ঘি ঢালার প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে যেন। কেউ বলছেন, ‘সোজা আঙুলে ঘি না উঠলে আঙুল বাঁকা করব’ শুনে মনে হলো, দেশটা বোধহয় এখন ‘আঙুল বাঁকানো পার্টি’ আর ‘ঘি খাওয়া দল’-এর লড়াইয়ে ভাগ হয়ে গেছে।
‘সোজা আঙুলে ঘি না উঠলে আঙুল বাঁকা করব’—এই উক্তি করেছেন জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির, সাবেক এমপি ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের। তিনি বলেছেন, ‘সরকার ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের সময় ঘোষণা করেছে। ফেব্রুয়ারি কাছাকাছি চলে এসেছে, কিন্তু গণভোটের তারিখ ঘোষণা হচ্ছে না। নির্বাচনের আগে গণভোট দিতে হবে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘সোজা আঙুলে ঘি না উঠলে আঙুল বাঁকা করব। ঘি আমাদের লাগবেই।’ তিনি চিকিত্সক মানুষ, নিশ্চয়ই জানেন ঘি খেলে কোলেস্টেরল বেড়ে যায়, কিন্তু হয়তো রাজনৈতিক কোলেস্টেরল কমানোর উপায় আর কিছু পাচ্ছেন না!
দেশের ৯৯ শতাংশ মানুষ আজকাল ঘি খাওয়া তো দূরের কথা, এর দাম শুনে তাদের বুক কেঁপে ওঠে। ১৮০০ টাকা কেজি! মনে হয়, ঘি নয়, সোনার তরল সংস্করণ। যে দেশে মানুষ এক লিটার তেল কিনতে হাঁপিয়ে যায়, সেখানে ‘ঘি লাগবেই’ বলা মানে, গরিবের ক্ষুধার পেটে ঘি-ঢালা। কিন্তু ঘি নিয়ে বাঙালির এক অদ্ভুত প্রেম আছে। খেতে না পারলেও ঘ্রাণে বাঁচে। যেমন আছে ‘ঘি-র ঘ্রাণতৃষ্ণা’ নামের এক রোগ রোগটা একেবারে আবেগঘটিত।
একবার এক ফেরিওয়ালা হাঁক পাড়ছিল, ‘এই ঘি লাগবে ঘি, এক নম্বর খাঁটি গাওয়া ঘি!’
এক গৃহবধূ ফেরিওয়ালার হাঁক শুনে এসে জিগ্যেস করলেন, ‘তোমার ঘি কত টাকা কেজি?’
ফেরিওয়ালা হেসে বলল, ‘ঘি নাই ম্যাডাম, আমি আসলে শণপাপড়ি বেচি।’
গৃহবধূ অবাক হয়ে জিগ্যেস করলেন, ‘তাহলে ঘি-ঘি বলে চ্যাঁচাচ্ছ কেন?’
ফেরিওয়ালা শান্ত স্বরে উত্তর দিল, ‘আসলে ম্যাডাম, বহু বছর ঘি বেচছি, অভ্যাসটা যায় না। এখন শণপাপড়ি বেচলেও মুখে ঘি ঘি উঠে আসে।’
আমাদের রাজনীতিও ঐ ফেরিওয়ালার মতো। এখন আদর্শ নেই, নীতি নেই, শুধু ‘ঘি ঘি’ করে হাঁক দিচ্ছে। আগে আদর্শ বেচত, এখন বেচে শণপাপড়ি কিন্তু পুরোনো ডাকটা এখনো ত্যাগ করতে পারেনি।
চার্বাক মুনি অনেক আগেই বলেছিলেন, ‘ঋণং কৃত্বা ঘৃতং পিবেত্, যাবত্ জীবেত্ সুখং জীবেত্’—ঋণ করে হলেও ঘি খাও, যত দিন বাঁচো সুখে বাঁচো। আমাদের দেশের রাজনীতিবিদেরা এই দর্শন এমনভাবে মেনে নিয়েছেন যে, এখন ‘নিজের পাতে ঘি টানতে সবাই কেমন ব্যাকুল ও খ্যাপাটে হয়ে গেছেন।
ঘি যেন এক রাজনৈতিক প্রতীক হয়ে গেছে বিলাস, ক্ষমতা, আর সামান্য পরিমাণে পেটব্যথার। সোজা আঙুলে ঘি না উঠলে আঙুল বাঁকা করো এই প্রবাদটা আজ নতুন অর্থ পেয়েছে। আগে এটা বলা হতো কঠিন পরিস্থিতিতে বুদ্ধি খাটানোর প্রতীক হিসেবে, এখন শোনা যায় ‘বাঁকা পথে ক্ষমতা পাওয়ার’ রণকৌশল হিসেবে। মনে হয়, ঘি তোলার নামে সবাই আঙুল বাঁকাতে বাঁকাতে দেশটাই বাঁকা করে ফেলছে।
এর জন্য অবশ্য আমাদের ঘিয়ের সংস্কৃতিও কম দায়ী নয়। বাংলা ভাষায় ঘি নিয়ে প্রবাদ-প্রবচনের অভাব নেই। যেমন :‘কপালে নাই ঘি, ঠকঠকালে হবে কি’ এখন এই প্রবাদ রাজনীতিতে মানানসই। জনগণ শান্তি, সমঝোতা, নির্বাচিত সরকার চাইলেও মিলছে না। মিলবে কী করে? যার কপালে ঘি নেই, সে যতই ঠকঠকাক, ঘি উঠবে না।
তবে বর্তমান বিরোধপূর্ণ রাজনীতির যে তাপ বইছে, সেখানে অনেকেই ‘আগুনে ঘি’ ঢালছেন। কেউ সামান্য কিছু বললেই অন্যজন সেই আগুনে ঘি ঢেলে দেয়। যেন আগুনটা তেতে ওঠে। তবে একই সঙ্গে ‘ভস্মে ঘি ঢালা’ও চলছে। অনেক চেষ্টা-অধ্যবসায়ের পরও দেশের কিছু মানুষের চরিত্র বদল করা যায়নি। তারা ঠিকই ঘিয়ের বয়াম বাগিয়ে নিচ্ছেন। পরিবর্তন ও সংস্কার আমাদের দেশে শেষ পর্যন্ত ভস্মে ঘি ঢালার নামান্তর হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তাছাড়া সবার পেটে নাকি ঘি হজমও হয় না। কিছু লোক ঘি পেলে বিগড়ে যায়। আবার কিছু লোক ঘিয়ের ছিটা সাধারণ মানুষের দিকে না দিয়ে সুইস ব্যাংকে পাঠিয়ে দেয়।
আমরা ছোটবেলায় শুনেছি যে, ‘পদ্মার ইলিশ আর পাবনার ঘি, জামাইয়ের পাতে দিলে আর লাগে কি?’ এখন সেই লংকাবাটাও নেই, আতপ চালও নেই। কাজেই ঝালের পিঠাও নেই। এখনকার জামাইরা বলে, ‘আমাদের এমপি হবার নিশ্চয়তা দাও, অথবা মন্ত্রিসভায় চেয়ার দাও, ইলিশ-ঘি পরে দেখা যাবে।’
শিবরাম চক্রবর্তীর সেই বিখ্যাত গল্পটা মনে আছে তো? দুই কৃপণ অনেক কষ্টে দূর গাঁ থেকে খাঁটি ঘি আনল একেবারে আতরের শিশিতে ভরে। এক বছর পর দেখা, একজনের ঘি শেষ, আরেক জনের শিশি এখনো অর্ধেক ভরা। ‘তোমার এত ঘি বাকি কেন?’ দ্বিতীয় জন বলল, ‘আমি খাওয়ার সময় শুধু শিশিটার ঢাকনা খুলে থালার পাশে রাখতাম, ঘিয়ের ঘ্রাণেই খাওয়া হয়ে যেত।’
আজকের আমরা যেন সেই দ্বিতীয় কৃপণ। ঘি খেতে পারি না, শুধু ঘ্রাণেই তৃপ্ত। সরকার পরিবর্তন, বাজেট, উন্নয়ন, সবই যেন ঘিয়ের ঘ্রাণের মতো বয়ামের ঘ্রাণ আছে, আসল জিনিসই কেবল নেই।
ঘি এখন শুধু খাবার নয়, মানসিক প্রশান্তির এক প্রতীক। কেউ বলে, ‘দেশে প্রকৃত স্বাধীনতা এসেছে’ আমরা শুনে মনে করি, কোথাও একটা হাঁড়িতে ঘি পড়ছে। যদিও সেই হাঁড়ির ঢাকনা আমাদের নাগালের বাইরে।
আমরা এমন এক জাতি, যারা দেউলিয়া হয়েও ঘিয়ের স্বপ্ন দেখি। কারো ঘরে চাল নাই, কিন্তু কল্পনায় ঘিয়ে ভাজা পরোটা খাচ্ছে। রাজনীতিবিদেরা জানেন, এই জাতিকে চালের দাম দিয়ে জাগানো যায় না, ঘিয়ের গন্ধ দিলেই চোখ চকচক করে ওঠে। তাই তারা ঘি ঢেলে যান বক্তৃতায়, প্রতিশ্রুতিতে, নীতিতে।
একজন বলে, ‘আমরাই আসল ঘি-ওয়ালা দল।’ অন্যজন বলে, ‘ওরা ঘি নয়, তেল ঢালে।’ তৃতীয় জন বলে, ‘আমাদের ঘি বিদেশি সার্টিফায়েড।’ এইভাবে ঘি নিয়ে এমন মহাযুদ্ধ চলছে, যেন রাজনীতি না হয়ে গেছে ঘির ওপর দখল নেওয়ার প্রতিযোগিতা।
ঘি আমাদের সমাজে সর্বদা উচ্চবিত্তের প্রতীক। গ্রামের মেলায় যে ছেলেটা রুটি ভাজে, তার চুলে ঘাম চকচক করে, ঘি নয়। শহরের অভিজাত এলাকায় যে রাঁধুনি ‘খাঁটি গাওয়া ঘি’তে বিরিয়ানি বানায়, তার পাশের টেবিলের দামই গরিবের তিন দিনের রোজগার।
তবু সবাই ঘিয়ের প্রতি দুর্বল। ঘি যেন প্রেমের মতো যাদের আছে তারা দোষ ধরে, যাদের নেই তারা ঘ্রাণ খুঁজে বেড়ায়। রাজনীতির হাঁড়িতে এখন এত ঘি ঢালা হয়েছে যে তাতে আগুন ধরলে দেশটাই পুড়ে যাবে। একদল আগুনে ঘি ঢালে, অন্যদল ভস্মে ঘি ঢালে আর জনগণ দাঁড়িয়ে দেখে, কার ঘি বেশি খাঁটি।
ডা. তাহের সাহেবের সেই উক্তি ‘ঘি আমাদের লাগবেই’ শুনে এক বেকার যুবক বলছিল, ‘আমাদেরও লাগে স্যার, কিন্তু চাকরির লাইনে দাঁড়িয়ে দেখি ঘিয়ের বদলে শুধু ফাঁকা হাঁড়ি।’
আমরা আসলে এমন এক যুগে বাস করছি, যেখানে ঘি আর ঘৃণা দুটোই রাজনীতির মূল উপকরণ। একদিকে বক্তৃতায় ঘি, অন্যদিকে বাস্তবে পুড়ে যাওয়া ভাত। ঘি আসলে আমাদের জাতীয় আত্মার এক দার্শনিক প্রতীক। আমরা হয়তো ঘি খেতে পারি না, কিন্তু ঘিয়ের স্বপ্নে বাঁচি। ‘ঋণ করেও ঘি খাও’—এই মন্ত্রে আমরা ঋণে ডুবে আছি, তবু মুখে বলি, ‘সব ভালো চলছে।’
রাজনীতিবিদেরা ঘি-র দোহাই দিয়ে ভোট চায়, আমরা প্রতারিত হয়েও ঘিয়ের ঘ্রাণে তৃপ্ত হওয়ার আশায় আবার তাদেরই নির্বাচিত করি। আমাদের কপালে যদি ঘি না থাকে, ঠকঠকিয়ে লাভ কী? তবু আমরা ঠকঠকাই কারণ ঘিয়ের আশায় বেঁচে থাকা, ঘি খাওয়ার চেয়ে সস্তা!













