মিশরের পর্যটন শহর শারম আল শেখে মধ্যস্থতাকারী রাষ্ট্রগুলোর ‘গাজা শান্তিচুক্তি’ স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে হামাস-ইসরাইলের মধ্যকার দীর্ঘ দুই বছরের যুদ্ধের আনুষ্ঠানিক অবসান ঘটেছে। অনেকটাই উৎসবের আমেজে বিশ্বের ৩৫ দেশের সরকারপ্রধানের অংশগ্রহণে এই চুক্তি স্বাক্ষর গাজার জনগণের ভাগ্য পরিবর্তনে সত্যিকার অর্থে কী ভূমিকা পালন করতে পারবে, এর চেয়েও পুরো অনুষ্ঠানটি যেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টকে ঘিরে একটি ট্রাম্প শোতে পরিণত হয়েছিল। এতে অংশগ্রহণকারী সবার অভিব্যক্তিতে অনেকটা মনে হয়েছে, তারা যেন ট্রাম্পের স্তুতিবাক্য উচ্চারণের জন্যই সমবেত হয়েছিলেন এবং এর চেয়েও বড় বিষয় হচ্ছে— তাদের সেখানে মার্কিন উদ্যোগে একসঙ্গে জড়ো করা হয়েছিল।
চুক্তি স্বাক্ষরের দুদিন আগে থেকেই গাজায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও এর কার্যকারিতায় কেবল গাজার ৫৩ শতাংশ থেকে ইসরাইলের সৈন্য প্রত্যাহার এবং পক্ষদ্বয়ের মধ্যে বন্দি বিনিময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ রয়েছে। আমরা যদি গোটা প্রক্রিয়াটিকে পর্যবেক্ষণ করি, তাহলে দেখব যুদ্ধরত দুটি পক্ষের কারো আচরণের সেরকম উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটেনি, ইসরাইলের শর্ত অনুযায়ী হামাসের নিরস্ত্রীকরণ এবং হামাসের শর্ত অনুযায়ী গাজায় অবাধ ত্রাণ সরবরাহ এবং গাজায় হত্যাকাণ্ড বন্ধ —এর কোনোটাই এখনো অর্জিত হয়নি।
ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেকে বিজয়ী দাবি করে এর মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে এক ‘নতুন ভোরের’ উদয় হয়েছে বলে দাবি করেছেন। গাজা শান্তিচুক্তিটি মূলত তার ২০ দফা পরিকল্পনার ওপর ভিত্তি করে স্বাক্ষরিত হলেও ইসরাইল ও হামাসের মধ্যকার যুদ্ধবিরতি অনেক প্রশ্নের জানান দেয়। বর্তমান অবস্থা অনেকটাই যুদ্ধ শুরুর আগের মতোই, মধ্যে দুটি বছরে গাজায় প্রাণ ঝরেছে ৬৮ সহস্রাধিক মানুষের, যাদের অধিকাংশই নারী ও শিশু। এই যুদ্ধবিরতি আসলে কোন অবস্থার ওপর ভিত্তি করে হলো এবং কোন বোঝাপড়ার ভিত্তিতে ইসরাইল গাজায় হামলা বন্ধ করল, সেসব জবাব স্পষ্ট না হলেও এটা এখন আর কারো বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে না যে, একটি ছোট ভূখণ্ডে আসলে যে উদ্দেশ্যে এতদিন ধরে ইসরাইল হামলা করে যাচ্ছিল, যেখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রত্যক্ষ মদত দিচ্ছিল, এর কোনোটাই অর্জিত হওয়ার পরিবর্তে গোটা বিশ্বে মার্কিননীতি সমালোচিত হওয়ার পাশাপাশি ইসরাইল পরিচিত হয়েছে একটি ঘৃণিত রাষ্ট্র হিসেবে। এই সময়ের ভেতর পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যে মতবিরোধ স্পষ্ট হয়েছে এবং এত বছর ধরে ইসরাইলকে সমর্থন করে যাওয়া পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোর জনগণের ইসরাইলের বিরুদ্ধে ফুঁসে ওঠা রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং জনগণকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে।
এখন আসা যাক, কী এমন আছে ট্রাম্পের প্রস্তাবে, যার মধ্য দিয়ে একটি ভয়ানক অবস্থার আপাত অবসান ঘটল। এখানে এটা নিশ্চিতভাবেই বলা যায় যে, ট্রাম্পের প্রস্তাবে মধ্যপ্রাচ্যের ছোট উপত্যকা গাজা নিয়ে যে বিষয়গুলো বিবৃত করা হয়েছিল, বাস্তবিক অর্থে যুদ্ধের অবসান এবং শান্তিচুক্তিতে এর তেমন প্রতিফলন ঘটেনি। উপরন্তু মিশরের শারম আল শেখে চুক্তি স্বাক্ষরকারী চারটি রাষ্ট্র—যুক্তরাষ্ট্র, তুরস্ক, মিশর ও কাতার এই চুক্তি অনুযায়ী যুদ্ধ অবসানে হামাস ও ইসরাইলের মধ্যকার সিদ্ধান্তের নিশ্চয়তাকারী হিসেবে কাজ করবে। এই চুক্তিতে উল্লেখ রয়েছে, ‘আমরা চাই সহনশীলতা ও মর্যাদা, এবং সবার জন্য সমান সুযোগ, যেন এই অঞ্চলটিতে জাতি-ধর্মনির্বিশেষে সবাই সামাজিক শান্তি, নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে কাজ করতে পারে।’ এসব প্রত্যাশার বিষয় এই চুক্তিতে আবার নতুন করে কেন আনতে হবে? মধ্যপ্রাচ্যের আজকের যত অস্থিতিশীলতা, এর কারণ কি জানেন না ডোনাল্ড ট্রাম্প? আরো অবাক করার বিষয় হচ্ছে—মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যস্থতাকারী রাষ্ট্র, যারা আজ ট্রাম্পের শান্তি প্রস্তাবের সঙ্গে সহমত পোষণ করে এই চুক্তিতে উপনীত হয়েছেন, তাদের অনেকের তো ইসরাইলের আগ্রাসী চরিত্র নিয়ে অনেক তিক্ত অভিজ্ঞতাও রয়েছে।
যে কোনো শান্তিপ্রক্রিয়া নিয়ে কাজ করতে গেলে সেই শান্তি বাস্তবিক অর্থে কতটা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে, সেসব আমলে নিয়ে সংঘাতের মূল উত্স নিয়ে কাজ করা হচ্ছে প্রধান কর্তব্য। যে প্রক্রিয়ায় শান্তিচুক্তি স্বাক্ষর এবং যুদ্ধের অবসান ঘটল, এখানে পুরো বিষয়টিতেই ফিলিস্তিনের সমস্যার মূল কারণগুলোকে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। উপরন্তু মধ্যপ্রাচ্যের শান্তির ক্ষেত্রে তাদেরকেই, বিশেষত হামাসকে প্রধান সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। আর তাই বেনইয়ামিন নেতানিয়াহুর মতোই ডোনাল্ড ট্রাম্পের কথাতেও সেই একই সুর, ‘হামাসকে অবশ্যই নিরস্ত্র হতে হবে, তাদের সংগঠনকে বিলুপ্ত করতে হবে’। যুক্তরাষ্ট্র তো বটেই, অপরাপর পক্ষ, যারা এই তথাকথিত শান্তিপ্রক্রিয়ায় কাজ করেছে, তাদেরও তো এটা ভুলে যাওয়া উচিত নয় যে, একটি সাংগঠনিক কাঠামো হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে হামাসের উত্পত্তি হয়েছে ১৯৮৭ সালে, অথচ মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের সূচনা সেই ১৯৪৮ সাল থেকে, যখন ইসরাইল নামক রাষ্ট্রটির জন্ম জয়। ইসরাইলের জন্ম, গোটা মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা এবং মার্কিন স্বার্থে কাজ করা, এ সবকিছুই আজ পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যকে পোড়াচ্ছে , প্রতিনিয়ত যার নির্মম বলি হচ্ছে ফিলিস্তিনের নিরীহ মানুষগুলো।
সবশেষ সংবাদ অনুযায়ী, শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের মাত্র দুদিনের মাথায় গাজায় ইসরাইলের হামলায় নতুন করে ৯ জন নিরীহ মানুষ নিহত হয়েছে। জানা গেছে, চুক্তি অনুযায়ী গাজাবাসীদের জন্য ত্রাণ সরবরাহ অবাধ রাখার নিশ্চয়তা দেওয়া হলেও ইসরাইল ত্রাণবাহী ট্রাকগুলোকে গাজায় ঢুকতে অনেক ক্ষেত্রেই বাধা দিচ্ছে। মিশরের সীমান্তবর্তী রাফা ক্রসিং খুলে দেওয়ার বিষয়ে ইসরাইলকে চুক্তিস্বাক্ষরকারী দেশগুলো অনুরোধ করলেও এখনো এ বিষয়ে ইতিবাচক সাড়া মেলেনি। আগেই বলা হয়েছে, আনুষ্ঠানিক একটি চুক্তি স্বাক্ষর হলেও পর্দার অন্তরালে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রীর যে সমঝোতা হয়েছে, সেটা অনুযায়ী হামাসকে অবশ্যই নিরস্ত্র এবং সংগঠন হিসেবে কেবল নিষিদ্ধই নয়, তাদের আত্মসমর্পণের বিনিময়ে সাধারণ ক্ষমার বিষয়টি নিয়ে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে মতৈক্য রয়েছে। এর অন্যথা হলে রয়েছে আবারও হামলার হুমকি। সুতরাং, ট্রাম্প এবার কেবল ইসরাইলকে নিয়ে নয়, মধ্যপ্রাচ্যকে নতুন করে ভবিষ্যতে অশান্ত করতে সেখানকারই কিছু দেশকে সাক্ষী হিসেবে নিয়েছেন, যাতে তারা নিজেরাই নিজেদের দুর্দশার গল্প নতুন করে লিখতে পারে।
একটি চুক্তি হয়েছে যাদের নিয়ে, অবাক করার মতো বিষয় হচ্ছে এই চুক্তি স্বাক্ষর নিয়ে, তাদের এই অনুষ্ঠানে অনুপস্থিতি অনেক প্রশ্নের জন্ম দেয়। এর মধ্য দিয়ে তাদের দিক থেকে চুক্তির অনেক শর্তাবলি নিয়ে অনীহার দিকটিকে প্রকাশ পায়, যা ইতিমধ্যে ইসরাইল ও হামাসের বক্তব্য থেকে পরিষ্কার হয়েছে। এই যেমন হামাস নিরস্ত্র হওয়া এবং গাজার নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দেওয়ার বিষয়টিকে প্রত্যাখ্যান করেছে এবং একই সঙ্গে ইসরাইল গাজা থেকে তার সব সৈন্য প্রত্যাহার এবং আর হামলা না চালানোর বিষয়টি এড়িয়ে যাচ্ছে। এমন অবস্থায় চুক্তির নিশ্চয়নকারী পক্ষগুলো একটি চুক্তির নিশ্চয়তা দেবে—এটা এককথায় হাস্যকর। দুদিনের মাথায়ই হামাসের পক্ষ থেকে দাবি জানানো হয়েছে তাদের কাছে, ইসরাইল চুক্তির শর্তগুলো সঠিকভাবে প্রতিপালন করছে কি না, সেসব বিষয়ে নজরদারি করতে। এখন কথা হচ্ছে—হামাস যদি যুদ্ধবিরতির শর্ত লঙ্ঘন করে, তাহলে ইসরাইল আবারও হামলা চালাবে, যাতে যুক্তরাষ্ট্রের সায় রয়েছে। তবে সেই সঙ্গে কি এই প্রশ্নটিও আসা সংগত নয় যে, যদি ইসরাইল এর শর্ত লঙ্ঘন করে, তাহলে ইসরাইলের কি একই পরিণতি ভোগ করা উচিত নয়? সেক্ষেত্রে হামাসের সঙ্গে থাকবে কারা? এটি একটি অসম চুক্তি, রাজনৈতিকভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং ইসরাইলের সুরক্ষার বিষয়টি মাথায় রেখে সম্পাদন করা।
আগেই বলা হয়েছে—২৫টি দেশের সরকারপ্রধান উপস্থিত ছিলেন এই চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে। অথচ এ বিষয় নিয়ে রাশিয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ দেশের কোনো ভূমিকা নেই, অর্থাত্ তাদের উপস্থিতির বিষয়টি আমলে নেওয়া হয়নি। অথচ ইউরোপের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের সব গুরুত্বপূর্ণ নেতৃবর্গ এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন, যার মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের সম্পর্কের বিষয়টি একটু ঝালাই করেও নেওয়া হলো। এমন পরিস্থিতিতে রাশিয়া-আরব সম্মেলন, যা গত ১৫ অক্টোবর মস্কোতে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল, সেটি স্থগিত করা হয়েছে। জানা গেছে কেবল সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট ও আরব লিগের মহাসচিব ছাড়া আর কেউ এতে যোগদানে আগ্রহ দেখাননি। বিষয়টি হতাশ করেছে রাশিয়া ও পুতিনকে। সুতরাং এককথায় এটাই বলতে হয়, ট্রাম্প একসঙ্গে অনেকগুলো খেলার চাল দিয়েছেন, বিভ্রান্ত করেছেন আরবদের এবং গুটি বানিয়েছেন ফিলিস্তিনিদের।
লেখক : অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।
(এই লেখা লেখকের একান্ত ব্যক্তিগত অভিমত; এ সংক্রান্ত কোনো দায় দৈনিক মূলধারা বহন করবে না)













