গাজা যুদ্ধ শেষ হয়েছে। তবে ইসরাইলের বাকি সংঘাতগুলোর ক্ষেত্রে এই কথা বলা যাবে না। বরং তিন তিনটি ফ্রন্ট এখনো খোলা রয়েছে। গাজার পর ইসরাইলের চোখ এখন সেদিকেই। লেবাননের দিকে তাকান। সেখানে একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির মধ্যে অস্থিরতা চলছেই। একই অবস্থা চলছে ইয়েমেনে। এই ভূখণ্ডে হুতিদের সঙ্গে বিক্ষিপ্তভাবে গুলি বিনিময় অব্যাহত রয়েছে। অন্যদিকে, ১২ দিনের যুদ্ধের পর গত জুন মাস থেকে সতর্ক অবস্থায় থাকা ইরানও যুদ্ধের অন্যতম ফ্রন্ট।
ঠিক এমন একটি পরিস্থিতিতে সবার নজর এখন ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর দিকে। গাজা যুদ্ধ বন্ধে গত ১৩ অক্টোবর শারম আল-শেখে অনুষ্ঠিত সম্মেলনের পরের ঘটনাবলি থেকে কি তার পদচ্যুত হওয়ার কোনো আলামত খুঁজে পাওয়া যায়? তিনি যেসব ‘মিশন’ শেষ করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে রেখেছেন, তা কি শেষ করতে পারবেন? অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, নেতানিয়াহু মিশন সম্পন্ন করতেই চেষ্টা করবেন। অর্থাত্, আগামী দিনগুলোতে উল্লিখিত তিনটি ফ্রন্টেই যে কোনো সময় সংঘর্ষের দামামা বেজে উঠতে পারে। লেবাননের পরিস্থিতি অন্তত সে কথাই বলছে।
২০২৩ সালের অক্টোবরে ইসরাইলি ভূখণ্ডে যে হামলার ঘটনা ঘটেছিল, তাতে নেতানিয়াহুর হাত রয়েছে বলে মনে করা হয়। বলা হয়, এই হামলার জন্য তিনিই দায়ী। এ কারণে সম্ভবত তার বিশ্বাস ছিল যে, গাজায় একটি পূর্ণ মাত্রার বিজয় অর্জন তাকে জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে নিয়ে যেতে পারে। তবে শেষ পর্যন্ত তার প্রত্যাশা পূরণ হবে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ থেকে যায়। যদি ধরে নেওয়া হয় যে, নেতানিয়াহুকে তার প্রতিদ্বন্দ্বীরা উত্খাত করতে সফল হবে, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই ইসরাইলের মসনদে আসবেন নতুন কোনো মুখ। এতে করে একটি নতুন নীতির অবতারণা ঘটতে পারে। অবশ্য তার জন্যও সময় লাগবে। আর ঠিক মাঝের এই সময়টাতে এতদঞ্চলের পরিস্থিতি পড়ে যাবে এক চরম অস্থিতিশীলতা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে। আবার, নেতানিয়াহু যদি উত্তেজনা প্রশমনে ‘ধীরে চলো নীতি’ বেছে নেন এবং অন্তত বছর দুয়েকের জন্য ‘অস্থিরতার অবসান’ পথ ধরেন, তাতে করে পরিস্থিতি শান্ত থাকতে পারে।
নেতানিয়াহু যেমন জটিল, তার দেশের সংসদীয় ব্যবস্থাও তেমনিই জটিল। অবশ্য নেতানিয়াহুর মতো ঝানু রাজনীতিক সেটা সহজেই ম্যানেজ করে ফেলবেন। ধারণা করা যায়, তিনি তার শাসনকে দীর্ঘায়িত করার জন্য আগামী দিনে একটি জোট গঠন করতে পারেন। ১৭ বছরেরও বেশি সময় ধরে ইসরাইল শাসন করা এই শাসকের পক্ষে অনেক কিছুই করা সম্ভব। এমনকি দীর্ঘ সময় ধরে ইসরাইলের ক্ষমতায় থাকা ডেভিড বেন-গুরিওনের চেয়েও বেশি সময় ধরে তিনি ক্ষমতায় থাকলেও তাতে অবাক হওয়ার কিছুই থাকবে না।
যাহোক, গাজা সংঘাতের পর এবার উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে লেবানন জুড়ে। খোদ লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউনই এই দাবি করেছেন। এর আগে তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেছিলেন যে, গাজা যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরপরই ইসরাইল তার দেশের দিকে দৃষ্টি দিতে পারে। রাজনৈতিকভাবে লাভবান হওয়ার চিন্তা থেকেই নেতানিয়াহু এটা করবেন বলে তার অনুমান।
যুদ্ধবিরতির পর গাজা থেকে বেশির ভাগ সেনা প্রত্যাহার করে নেবে ইসরাইল। এর ফলে স্বভাবতই ইসরাইলি সেনাবহরে শক্তি উদ্বৃত্ত হতে থাকবে। অন্যদিকে, ইসরাইলের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি চুক্তি থাকার কারণে হিজবুল্লাহ যোদ্ধারা লেবাননের সেনাবাহিনীর কাছে তাদের অস্ত্র হস্তান্তর করছেন। এটা ইসরাইলের কাজকে করে তুলছে আরো সহজ। অর্থাত্, এই ফ্রন্ট এখন ইসরাইলি সেনাদের জন্য ক্রমশ উন্মুক্ত হয়ে পড়ছে।
এ অবস্থায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নেতানিয়াহুকে আর আটকাতে পারবেন বলে মনে হয় না। এর কারণ, আমেরিকা এবং ফ্রান্স উভয়ই ইসরাইল-হিজবুল্লাহ চুক্তির সাক্ষী এবং গ্যারান্টার। অর্থাত্, তারা নেতানিয়াহুর ওপর সেভাবে চাপ দিতে পারবে না। সব মিলিয়ে বলা যায়, বল এখন লেবাননের প্রেসিডেন্টের কোর্টে। তিনি শুরু থেকে নাগরিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা রক্ষার জন্য হিজবুল্লাহর সঙ্গে সংঘর্ষ এড়িয়ে চলেছেন। সুতরাং, হিজবুল্লাহকে তিনি তার ইচ্ছেমতো সরানো-নড়ানো করতে পারবেন!
ইসরাইল দাবি করে আসছে, হিজবুল্লাহ যতক্ষণ অস্ত্র হস্তান্তর না করবে, ততক্ষণ দক্ষিণ লেবানন থেকে তারাও পিছু হটবে না। এমনকি আক্রমণও বন্ধ করবে না। অধিকন্তু, প্রয়োজনীয় গ্যারান্টি আদায় করে নেওয়ার জন্য ‘নতুন কোনো ব্যবস্থা’ও করা হতে পারে।
এদিকে, ইয়েমেনের হুতিদের সঙ্গে ইসরাইলের সংঘর্ষ, ইরান-সমর্থিত অন্য গোষ্ঠীর আচরণ এবং সর্বোপরি গাজা যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর ইয়েমেনে কী হবে, সে প্রশ্নও সামনে আসছে। হুতিদের দুর্বল করার এবং সানায় হুতি শাসনকে উত্খাতের মিশন সম্পন্ন করার চেষ্টা করবে তেল আবিব। এর জন্য ইয়েমেনি বাহিনীকে তারা প্রস্তুত করবে আর সেই সামরিক সক্ষমতা তাদের রয়েছে। এই বাহিনীর মধ্যে নতুন করে উত্সাহ-উদ্দীপনা সৃষ্টির প্রচেষ্টা পরবর্তী পর্যায়ের জন্য তাদের প্রস্তুতিরই ইঙ্গিত বহন করে।
সবচেয়ে কঠিন এবং বিপজ্জনক ফ্রন্ট হলো ইরান। এই ফ্রন্টের বিস্তৃত আঞ্চলিক প্রতিক্রিয়া রয়েছে বটে। ট্রাম্প গত জুনে মাত্র দুই সপ্তাহেরও কম সময় ধরে চলা ইরান-ইসরাইল যুদ্ধ বন্ধ করতে সক্ষম হয়েছেন। তবে প্রতিবারই তিনি সফলতা না-ও পেতে পারেন। ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ তিনিই বাধিয়েছিলেন, ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতেও তার নির্দেশেই হামলা হয়। এটি ছিল তার দ্বিতীয় মেয়াদে প্রথম যুদ্ধ। অবশ্য তিনিই আবার যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেন।
নেতানিয়াহু ইরান প্রশ্নে ট্রাম্পের ওপর নাখোশ। কারণ, ইরানে পরিকল্পিত সামরিক অভিযান চালিয়ে যাওয়ার জন্য তিনি ট্রাম্পের কাছ থেকে সবুজ সংকেত পাননি। অবশ্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট দক্ষতার সঙ্গে তেহরানের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। তেহরানকে সতর্ক করে দিয়ে তিনি বলেছেন যে, যদি তারা ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বা সামরিক কার্যক্রম পুনরায় শুরু করে, তাহলে তিনি নেতানিয়াহুকে আর আটকাবেন না। বরং চাপিয়ে দেবেন তেহরানের ঘাড়ে! মূলত এ কারণেই ইরানের সশস্ত্র বাহিনী সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। এ রকম একটি পরিস্থিতিতে নেতানিয়াহু যদি পুনরায় যুদ্ধ শুরু করতে চান, তার জন্য তাকে কোনো ধূর্ততা দেখাতে হবে না কিংবা খুঁজতে হবে না কোনো অজুহাত। সেক্ষেত্রে আবারও যদি এ দুই আঞ্চলিক শক্তির মধ্যে নতুন করে সংঘর্ষ শুরু হয়, তাহলে তা হবে সত্যিই ধ্বংসাত্মক। এ অঞ্চলের দেশগুলো উদ্বিগ্নভাবে এটা পর্যবেক্ষণ করছে, রয়েছে সতর্ক।
লেবানন ও ইরানের রাজনীতিবিদদের বুঝতে হবে যে, গাজা যুদ্ধবিরতি চুক্তির মাধ্যমে বিপদ শেষ হয়ে যায়নি। এমনকি তা যেন কখনো শেষও হবে না। রক্তক্ষয়ী গাজা যুদ্ধ একটি দ্বিপাক্ষিক চুক্তির মাধ্যমে শেষ হয়েছে মাত্র। তবে অন্যান্য ফ্রন্টের পরিস্থিতি এখনো অমীমাংসিত। গাজা যুদ্ধবিরতি কেবল সাময়িক বিরতি, যা ইসরাইলের জন্য একটি বড় সুযোগ। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে তারা নিজেদের আরো গুছিয়ে নিতে চেষ্টা করবে। অর্থাত্, অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি কখনই চূড়ান্ত মীমাংসা হতে পারে না। বরং এটি একটি টিকটিক টাইম বোমা ছাড়া আর কিছুই নয়।













