একবিংশ শতাব্দীর শুরু হয়েছিল প্রতিযোগিতার নতুন সংজ্ঞা নিয়ে। পৃথিবী যেন আগেভাগেই বলে দিয়েছিল যে, যারা দৌড়াতে পারবে, কেবল তারাই দাঁড়িয়ে থাকবে! বর্তমানে আমরা সেটিই প্রত্যক্ষ করছি। এই দৌড়ে কেউ প্রযুক্তির ঘোড়ায় চড়েছে তো, কেউ গবেষণার বা শিল্পের; আবার কেউ কেউ এখনো অন্যের ঘোড়া কত সুন্দর দৌড়ায়, তা দেখেই সময় কাটাচ্ছে! চীনের একটি সাম্প্রতিক ঘটনা এই ব্যবধানটি বেশ মজার করে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছে।
দেশটির শেনঝেনে এক উদ্যোক্তা অর্থের বিনিময়ে মানুষের শরীর চুলকিয়ে দেওয়ার ব্যবসা শুরু করেছেন। ঘণ্টায় ৩০০ ইউয়ান পর্যন্ত মূল্য নেওয়া হয় এই সেবার জন্য। এতে মাসিক আয় হচ্ছে বাংলাদেশি মুদ্রায় ১৮ লাখ টাকা। ইতিমধ্যে দুটি শাখা চালু হয়েছে এবং ব্যবসার শাখা কমপক্ষে ১০০টিতে সম্প্রসারণের পরিকল্পনাও রয়েছে। খবরটি তুচ্ছ মনে হতে পারে, কিন্তু একটু গভীরভাবে দেখলে এর ভেতরেই একটি বড় শিক্ষা লুকিয়ে থাকতে দেখা যায়।
যে অর্থনীতিতে মানুষের গা চুলকিয়ে দেওয়ার জন্যও মানুষ অর্থ ব্যয় করতে পারে, সেই অর্থনীতির মানুষের হাতে স্বাভাবিকভাবেই আগে অতিরিক্ত অর্থ আসতে হয়। অর্থাৎ, চীনের গল্পটি আসলে গা চুলকানোর বিলাসিতার গল্প নয়; এটি ক্রয়ক্ষমতা, কর্মসংস্থান, উদ্যোক্তা-সংস্কৃতি এবং অর্থনৈতিক সক্ষমতার এক অসাধারণ গল্প। যে জাতি একদিকে মহাকাশে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বৈদ্যুতিক গাড়ি ও জ্বালানি প্রযুক্তিতে বিপুল বিনিয়োগ করছে; বিপুলসংখ্যক অবকাঠামো ও শিল্পকারখানা গড়ে তুলে বিশ্ববাজার দখল করে নিচ্ছে, সেই দেশে ‘মানুষের গা চুলকিয়ে দিয়েও টাকা কামানো যায়’—এতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। অর্থনীতি যখন বড় হয়, মানুষের প্রয়োজনও তখন নানা স্তরে বাজার তৈরি করতে থাকে, যা সত্যিই চমকপ্রদ!
তারা গা চুলকিয়ে টাকা কামাচ্ছে, আর আমরা অনেক সময় মাথা চুলকিয়ে, কপাল চাপড়ে ভাবছি—উন্নতি আসছে না কেন! উন্নতি কি সহসা আসে? অবশ্যই না। উন্নতিকে ডেকে আনতে হয় মাথা খাটিয়ে, হাত লাগিয়ে, সময়ের মূল্য বুঝে। কারণ, কোনো জাতির কপালেই ‘উন্নতি’ লেখা থাকে না, তা অর্জন করার বিষয়
উন্নত বিশ্ব এই বাস্তবতা অনেক আগেই বুঝেছিল। এই কারণে তারা শুধু মানুষকে অধিক সময় কাজ করাতে চায় না, বরং এক ঘণ্টার শ্রমে কত বেশি মূল্য সৃষ্টি করা যায়, সেই প্রশ্নের উত্তরও খোঁজে। দক্ষতা উন্নয়ন, প্রযুক্তি, গবেষণা, উদ্ভাবন, অবকাঠামো এবং উৎপাদনশীলতায় বিনিয়োগ তাই তাদের অর্থনৈতিক নীতির কেন্দ্রে থাকে সর্বদাই। অন্যদিকে, বিশ্বে এমন বহু সমাজ রয়েছে, যেখানে চিত্রটি এখনো বড়ই বিচিত্র। সেখানে সময় নষ্ট হলেও যেন আপত্তি নেই; বরং সময়মতো কাজ শেষ করলে যেন সন্দেহ হয়! দক্ষতার চেয়ে পরিচিতি, যোগ্যতার চেয়ে তদবির, নিয়মের চেয়ে ‘ম্যানেজ’, পরিশ্রমের চেয়ে শর্টকাট—এই সংস্কৃতি যদি কোনো অর্থনীতির ভেতরে জায়গা করে নেয়, তাতে উন্নতির গাড়ি যত দামিই হোক না কেন, চাকা ঘুরবে কি?
চীনারা একসময় বিদেশে কাজের সন্ধানে ছুটত। আজ তাদের দেশেই পৃথিবীর নানা প্রান্তের মানুষ ব্যবসা ও কাজের সুযোগ খুঁজছে। এর পেছনে কোনো জাদুর কাঠি নেই, বরং আছে দীর্ঘদিনের শ্রম, শৃঙ্খলা, সময়ানুবর্তিতা, শিক্ষা, প্রযুক্তি ও রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ। এই কারণে চীনের ‘গা চুলকানো’ ব্যবসাকে কেবল কৌতূহলোদ্দীপক খবর হিসেবে দেখলে, আমরা এর আসল অর্থটিই হারিয়ে ফেলব।
তারা গা চুলকিয়ে টাকা কামাচ্ছে, আর আমরা অনেক সময় মাথা চুলকিয়ে, কপাল চাপড়ে ভাবছি—উন্নতি আসছে না কেন! উন্নতি কি সহসা আসে? অবশ্যই না। উন্নতিকে ডেকে আনতে হয় মাথা খাটিয়ে, হাত লাগিয়ে, সময়ের মূল্য বুঝে। কারণ, কোনো জাতির কপালেই ‘উন্নতি’ লেখা থাকে না, তা অর্জন করার বিষয়। কোনো দেশই গা চুলকিয়ে উন্নত হয় না। তারা আগে মাথা খাটায়, হাত চালায় এবং তারপর একদিন এমন অর্থনীতি তৈরি হয়, যেখানে গা চুলকিয়ে নেওয়ার লোকও পাওয়া যায়, আবার গা চুলকিয়ে দেওয়ার লোকটিও সম্মানের সঙ্গে উপার্জন করে।
অথচ প্রতিযোগিতার এই বিশ্বে এমন অনেক জাতি রয়েছে, যাদের হাত দুঃখজনকভাবে নিজের মাথা চুলকাতেই ব্যস্ত। উন্নতির গল্প তারা লিখবে কোন হাত দিয়ে?













