মাসের শেষ সপ্তাহ মানেই বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত চাকরিজীবীর কাছে এক দীর্ঘশ্বাসের নাম। পকেটের তলানিতে পড়ে থাকা সামান্য কিছু খুচরা পয়সা আর বাজারের আকাশছোঁয়া আগুনের মাঝে দাঁড়িয়ে একজন সীমিত আয়ের মানুষ যখন ভবিষ্যতের হিসাব মেলান, তখন তাঁর চোখেমুখে ফুটে ওঠে এক নিদারুণ অসহায়ত্ব। ঠিক এরকম একটি দমবন্ধ করা পরিস্থিতিতে ‘নতুন পে স্কেল’ বা বেতনের নতুন কাঠামোর ঘোষণা যেন তপ্ত মরুভূমিতে এক পশলা স্বস্তির বৃষ্টির মতো নেমে আসে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একজন সরকারি কর্মচারীর জীবন বাঁধা থাকে নির্দিষ্ট আয়ের এক নিশ্ছিদ্র ছকে। যখন সেই আয়ের ছকটি নতুন করে আঁকা হয়, তখন একটি পরিবারের বহুদিনের জমে থাকা স্বপ্নগুলো নতুন করে ডানা মেলতে শুরু করে। কিন্তু এই স্বপ্নের পাশেই আবার ওঁত পেতে থাকে কিছু রূঢ় বাস্তবতা, বাজারের অদৃশ্য সিন্ডিকেট এবং আইনি জটিলতার দুর্ভেদ্য কাঁটা। একটি সংবাদপত্রের কলামের দৃষ্টিকোণ থেকে যদি আমরা নতুন পে স্কেলের এই আগমনী বার্তাকে আবেগ, বাস্তবতা এবং আইনের মানদণ্ডে বিচার করি, তবে এর বহুমুখী মাত্রা আমাদের সামনে উন্মোচিত হয়।
একটি নতুন পে স্কেল কেবল কিছু টাকার অঙ্কের গাণিতিক যোগফল নয়; এটি একটি পরিবারের একটু ভালো থাকার, একটু মাথা উঁচু করে বাঁচার পাসপোর্ট। এর ইতিবাচক দিকগুলো অত্যন্ত মানবিক এবং আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। দীর্ঘদিনের মূল্যস্ফীতির চাপে পিষ্ট কর্মচারীরা আর্থিকভাবে যখন কিছুটা হাঁফ ছাড়ার সুযোগ পান, তখন তাঁদের চোখেমুখে এক অদ্ভুত প্রশান্তি নেমে আসে। মাসের শুরুতে সন্তানের হাতে তুলে দেওয়া নতুন খেলনা, স্ত্রীর জন্য কেনা একটি শাড়ি, বৃদ্ধ মা-বাবার উন্নত চিকিৎসা কিংবা ঈদের দিন পরিবারের সবার মুখে হাসি ফোটানোর জন্য এই বাড়তি অর্থটুকু জাদুর মতো কাজ করে।
বাংলাদেশ সংবিধানের ২৭ নম্বর অনুচ্ছেদে স্পষ্ট বলা হয়েছে, “সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী।” কিন্তু যখন একই শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন দপ্তরে চাকরিতে প্রবেশ করে ভিন্ন পে স্কেল বা সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয়, তখন তা এই সাংবিধানিক সমতার নীতিকে সরাসরি প্রশ্নবিদ্ধ করে। একই কাজ করে একজন যে বেতন পান, অন্য দপ্তরের আরেকজন হয়তো তাঁর চেয়ে কম পান। এই ‘Equal pay for equal work’ নীতির লঙ্ঘন বহু আইনি বিতর্কের জন্ম দেয়
পে স্কেল বৃদ্ধির এই মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী। যখন একজন কর্মচারী দেখেন যে রাষ্ট্র তাঁর শ্রমের সঠিক মূল্যায়ন করছে, তখন স্বভাবতই তাঁর কাজের প্রতি একাগ্রতা, নিষ্ঠা ও সততা বৃদ্ধি পায়। দুর্নীতির প্রবণতা কমিয়ে এনে একটি স্বচ্ছ প্রশাসনিক কাঠামো তৈরিতে একটি যুগোপযোগী ও সম্মানজনক পে স্কেল অনুঘটকের মতো কাজ করে। এর পাশাপাশি পে স্কেল বাড়লে স্বাভাবিকভাবেই বেসিক বা মূল বেতন বাড়ে, যার ফলে একজন চাকরিজীবী যখন অবসরে যান, তখন তাঁর গ্র্যাচুইটি ও পেনশনের পরিমাণও উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পায়। এই আর্থিক নিরাপত্তা তাঁর বার্ধক্যের দিনগুলোকে পরনির্ভরশীলতার গ্লানি থেকে রক্ষা করে।
তবে মুদ্রার উল্টোপিঠের মতো নতুন পে স্কেলের খবর যতটা আনন্দ নিয়ে আসে, বাংলাদেশের বাস্তবতায় ঠিক ততটাই আতঙ্ক তৈরি করে সাধারণ মানুষের মনে। আমাদের দেশের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো, পে স্কেল ঘোষণার গুঞ্জন ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র, বাড়িভাড়া এবং যাতায়াত খরচ হু হু করে বেড়ে যায়। পে স্কেলের খবর সরকারি প্রজ্ঞাপন হওয়ার আগেই পৌঁছে যায় বাজারের অসাধু সিন্ডিকেট এবং বাড়িওয়ালাদের কানে। কর্মচারীর বেতন হয়তো বাড়ে দশ শতাংশ, কিন্তু জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যায় বিশ শতাংশ। যতটুকু বেতন বাড়ে, তার চেয়ে অনেক বেশি টাকা নীরবে চলে যায় বাজারের অদৃশ্য সিন্ডিকেটের পকেটে। এর ফলে পে স্কেলের আসল উদ্দেশ্য বা মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধির যে লক্ষ্য, তা পুরোপুরি ব্যাহত হয়।
শ্রেণি বৈষম্যের দিকটিও এখানে প্রকটভাবে ফুটে ওঠে। পূর্বের পে স্কেলগুলোর দিকে গভীরভাবে তাকালে দেখা যায়, উচ্চতর গ্রেড এবং নিম্নতর গ্রেডের কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির হারে আকাশ-পাতাল তফাত থাকে। প্রথম শ্রেণির একজন কর্মকর্তার বেতন যে জ্যামিতিক হারে বাড়ে, তৃতীয় বা চতুর্থ শ্রেণির একজন কর্মচারীর বেতন সেই অনুপাতে বাড়ে না। অথচ বাজারের দ্রব্যমূল্য সবার জন্যই সমান। এই বৈষম্য প্রবল মানসিক হতাশা ও আন্তঃক্যাডার বা আন্তঃবিভাগীয় ক্ষোভের জন্ম দেয়। সবচেয়ে মর্মান্তিক দিকটি হলো বেসরকারি খাতের দীর্ঘশ্বাস। পে স্কেল কেবল সরকারি কর্মচারীদের জন্য আসে, যা সমগ্র কর্মজীবীর একটি ক্ষুদ্র অংশ মাত্র। কিন্তু এর প্রভাবে বাজারে যে মূল্যস্ফীতির আগুন লাগে, তাতে সবচেয়ে বেশি দগ্ধ হন বেসরকারি চাকরিজীবী, কৃষক, শ্রমিক ও দিনমজুররা, যাঁদের আয় এক পয়সাও বাড়ে না। সরকারি পে স্কেলের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে বেসরকারি খাতের এই বিশাল জনগোষ্ঠীর জীবনমান আরও এক ধাপ নিচে নেমে যায়।
আবেগ আর বাস্তবতা দিয়ে পেট চললেও, রাষ্ট্র চলে আইনের কঠোর কাঠামোতে। পে স্কেল বাস্তবায়নের সময় সবচেয়ে বেশি যে সমস্যাটি মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে, তা হলো আইনি অসঙ্গতি বা অ্যানোমালি (Anomaly)। অনেক সময় নতুন পে স্কেলে বিভিন্ন দপ্তরের পদমর্যাদা ও স্কেল নির্ধারণে এমন কিছু শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়, যা কর্মচারীদের পূর্ববর্তী সুবিধাকে ক্ষুণ্ণ করে। উদাহরণস্বরূপ, আগের একটি পে স্কেলে ‘টাইম স্কেল’ ও ‘সিলেকশন গ্রেড’ বাতিল করার কারণে হাজার হাজার কর্মচারী চরম বৈষম্যের শিকার হয়েছিলেন। নিজেদের অধিকার ফিরে পেতে তাঁরা প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনাল থেকে শুরু করে সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত দীর্ঘ আইনি লড়াই চালিয়েছেন। এই আইনি লড়াইগুলো প্রমাণ করে যে, পে স্কেল প্রণয়নে অনেক সময়ই মাঠপর্যায়ের বাস্তবতাকে আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হয় না।
বাংলাদেশ সংবিধানের ২৭ নম্বর অনুচ্ছেদে স্পষ্ট বলা হয়েছে, “সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী।” কিন্তু যখন একই শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন দপ্তরে চাকরিতে প্রবেশ করে ভিন্ন পে স্কেল বা সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয়, তখন তা এই সাংবিধানিক সমতার নীতিকে সরাসরি প্রশ্নবিদ্ধ করে। একই কাজ করে একজন যে বেতন পান, অন্য দপ্তরের আরেকজন হয়তো তাঁর চেয়ে কম পান। এই ‘Equal pay for equal work’ নীতির লঙ্ঘন বহু আইনি বিতর্কের জন্ম দেয়। এছাড়া পে স্কেল ঘোষণার পর এর গেজেট প্রকাশ, ফিক্সেশন (Fixation) এবং বকেয়া টাকা হাতে পাওয়া পর্যন্ত যে আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হয়, তাও কাঠামোগত দুর্বলতারই নির্লজ্জ প্রতিফলন।
পরিশেষে বলা যায়, নতুন পে স্কেল একটি দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা এবং প্রবৃদ্ধির আয়না। একজন চাকরিজীবীর ঘাম ঝরানো শ্রমের শ্রেষ্ঠ স্বীকৃতি হলো এই সম্মানজনক বেতন। কিন্তু কেবল বেতনের কাগুজে অঙ্ক বাড়িয়েই মানুষের মুখে স্থায়ী হাসি ফোটানো সম্ভব নয়, যদি না বাজার ব্যবস্থাকে আইনের কঠোর শাসনে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। বৈষম্যহীন, আইনি জটিলতামুক্ত এবং বাস্তবসম্মত একটি পে স্কেলই পারে সত্যিকারের স্বস্তি এনে দিতে। রাষ্ট্রকে নিশ্চিত করতে হবে যে, পে স্কেলের আনন্দ যেন বাজারের আগুনে পুড়ে ছাই না হয়ে যায় এবং এর খেসারত যেন বেসরকারি খাতের নিরীহ মানুষদের দিতে না হয়।
- মো. বাইজিদ শেখ গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগগের শিক্ষার্থী
[এই লেখার যাবতীয় দায় লেখকের। এর সঙ্গে দৈনিক মূলধারার কোনোই সম্পর্ক নেই]













