দেওয়ানি ও ফৌজদারি ছোটখাটো নানা বিরোধেই হাজার বছর ধরে গ্রাম বাংলায় চলে এসেছে সালিশি ব্যবস্থা। এমনকি ঢাকা শহরে মহল্লার সরদারগণও সালিশ নিষ্পত্তি করতেন বলে জানা যায়। রাজার দরবার, কাজীর আদালত বা পরবর্তীকালের কোর্ট-কাচারিতে যাওয়ার আগে এসব সালিশেই মিটে যেত বেশির ভাগ বিরোধ। ১৯৭৬ সালে প্রথম বারের মতো গ্রামীণ এই সালিশিকে প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ করা হয়। অধ্যাদেশের মাধ্যমে ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানকে প্রধান করে গঠন করা হয় গ্রাম আদালত। গঠনকালে ৫ হাজার টাকা বা তার কম মূল্যমানের ফৌজাদারি ও দেওয়ানি অপরাধ বিচারের জন্য গ্রাম আদালতকে এক্তিয়ার দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীকালে আইন হয়েছে, আইনে সময়ে সময়ে যোজন বিয়োজন ঘটেছে।
২০২৪ সাল থেকে গ্রাম আদালতে মামলার আর্থিক সীমা ৩ লাখ টাকা ধার্য হয়েছে, এমনকি গ্রাম আদালতকেও সর্বোচ্চ ৩ লাখ টাকা জরিমানা আরোপের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। ১৯৮৩ সাল থেকে বছর দশেক উপজেলায় ফৌজদারি ও দেওয়ানি আদালত থাকার সময়টুকু বাদ দিলে গ্রামের নিরীহ মানুষের আইনঘটিত বিষয়ে আশ্রয়স্থল গ্রাম আদালত।
গ্রাম আদালত গঠিত হয় পাঁচ জনকে নিয়ে। সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান (বা আইন অনুযায়ী মনোনীত প্যানেল চেয়ারম্যান বা অন্য কোনো ইউপি সদস্য)। বাদী ও বিবাদী উভয় পক্ষই অন্তত এক জন করে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য ও অন্য এক জন করে ব্যক্তিকে মনোনয়ন দিতে পারে। তবে গ্রাম আদালতে আইনজীবী গ্রাহ্য নয়। ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান বা প্যানেল চেয়ারমান কোনো কারণে কোনো মামলায় গ্রাম আদালতে প্রধান হতে অপারগ হলে বা কোনো পক্ষ চেয়ারমান বা প্যানেল চেয়ারম্যান সম্পর্কে আপত্তি উত্থাপন করলে উপজেলা নির্বাহী অফিসার কোনো সদস্য (যিনি কোনো পক্ষ দ্বারা মনোনীত নন)-কে গ্রাম আদালত পরিচালনার দায়িত্ব দেবেন। আমাদের সংবিধান অনুযায়ী স্থানীয় শাসন নির্বাহী বিভাগের অধীনে।
গ্রাম আদালতের বিচারিক ব্যবস্থাদি এখন যেমন, তেমনি থাকবে। পৃথক গ্রাম আদালত ভবন নির্মাণ না হওয়া পর্যন্ত ইউনিয়ন পরিষদ ভবনেই গ্রাম আদালতের কাজ চলতে পারে। তবে প্রত্যেক গ্রাম আদালতের জন্য একজন অফিস সহকারী কাম পেশকার ও একজন অফিস সহায়ক নিয়োগ করতে হবে। ইউনিয়ন পরিষদের চৌকিদার দফাদার গ্রাম আদালতের জারিকারপকের কাজ করবেন। প্রতিটি মামলায় বাদী ও বিবাদী যেমন একজন করে প্রতিনিধি দিয়ে আসছেন, এই আদালতেও তা-ই দেবেন
সংবিধানের চতুর্থ ভাগের তৃতীয় পরিচ্ছদের শিরোনাম এবং অনুচ্ছেদ ৫৯ ও ৬০- এ বর্ণিত স্থানীয় শাসনের ইংরেজি Local government করেও ব্যাবহারিক ক্ষেত্রে আমরা বাংলা করেছি স্থানীয় সরকার। দেশের স্থানীয় শাসন প্রতিষ্ঠানসমূহ হলো সিটি করপোরেশন, জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ। এই পাঁচটি স্থানীয় শাসন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কেবল ইউনিয়ন পরিষদেই আদালত পরিচালিত হয়। সংবিধানের ২২ অনুচ্ছেদমতে রাষ্ট্রের নির্বাহী অঙ্গসমূহ থেকে বিচার বিভাগের পৃথক্করণ রাষ্ট্র নিশ্চিত করবে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনামল থেকে এই শতাব্দীর প্রথম দশক পর্যন্ত দেশে ফৌজদারি মামলা আমলে নেওয়া থেকে শুরু করে একটি নির্দিষ্ট মেয়াদের দণ্ড প্রদান পর্যন্ত বিচারিক কাজ করত নির্বাহী বিভাগ। আলোচিত মাসদার হোসেন মামলার আদেশের বলে সরকার ২০০৯ সালে নির্বাহী বিভাগের বিচারিক ক্ষমতা লোপ করে।
স্থানীয় শাসন প্রতিষ্ঠান হিসেবে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাহী বিভাগ হওয়ায় ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে গ্রাম আদালত পরিচালনা সংবিধানের পরিপন্থি। বিদ্যমান গ্রাম আদালত আইনে ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ও ১২ জন সদস্যের মধ্যে কমপক্ষে তিন জন প্রতিটি গ্রাম আদালতের সদস্য হন। পরিষদের সদস্যগণ নির্দলীয়ভাবে নির্বাচিত হলেও তারা প্রকৃতপক্ষে কোনো না কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য। গত দুই নির্বাচনে চেয়ারম্যান দলীয় প্রতীকে নির্বাচিত হয়েছেন। সামনের নির্বাচন থেকে চেয়ারম্যানও নির্দলীয়ভাবে নির্বাচিত হবেন। চেয়ারম্যানও যতই নির্দলীয়র লেবেল আঁটুক না কেন, রাজনৈতিক নেতাকর্মীরাই মূলত স্থানীয় শাসনের নির্বাচনে অংশ নেন ও বিজয়ী হন। রাজনৈতিক নেতাগণ চেয়ারম্যান-মেম্বার নির্বাচিত হয়ে বিচারকের আসনে বসলে তাদের মধ্যে রাজনৈতিক চেতনা কাজ করতেই পারে। তাতে বিচারপ্রার্থীগণের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কাকে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
তাহলে কি গ্রাম আদালত বিলুপ্ত করতে হবে? মোটেও না। গ্রাম আদালতকে নির্বাহী বিভাগ তথা ইউনিয়ন পরিষদ থেকে বের করে এনে স্বাধীন গ্রাম আদালত গঠন করতে হবে। প্রস্তাবিত স্বাধীন গ্রাম আদালত ইউনিয়ন পরিষদ অধিক্ষেত্রে সর্বজনীন ভোটের মাধ্যমে কমপক্ষে একজন নারী বা পুরুষসহ তিন জনকে নির্বাচিত করবে। অন্তত একজন নারী বা পুরুষ সদস্যের নির্বাচন নিশ্চিত করার জন্য রিটার্নিং অফিসার যদি ভোট গণনার পরে দেখেন প্রথম দুই জন প্রার্থীই পুরুষ বা নারী, তাহলে তিনি অবশিষ্ট প্রার্থীদের মধ্য থেকে সর্বাধিক ভোটপ্রাপ্ত নারী বা পুরুষকে নির্বাচিত ঘোষণা করবেন। পদের মেয়াদ হবে পাঁচ বছর। গ্রাম আদালতের বিচারিক ব্যবস্থাদি এখন যেমন, তেমনি থাকবে। পৃথক গ্রাম আদালত ভবন নির্মাণ না হওয়া পর্যন্ত ইউনিয়ন পরিষদ ভবনেই গ্রাম আদালতের কাজ চলতে পারে। তবে প্রত্যেক গ্রাম আদালতের জন্য একজন অফিস সহকারী কাম পেশকার ও একজন অফিস সহায়ক নিয়োগ করতে হবে। ইউনিয়ন পরিষদের চৌকিদার দফাদার গ্রাম আদালতের জারিকারপকের কাজ করবেন। প্রতিটি মামলায় বাদী ও বিবাদী যেমন একজন করে প্রতিনিধি দিয়ে আসছেন, এই আদালতেও তা-ই দেবেন। নির্বাচিত তিন জন ও মনোনীত দুই জনসহ আদালত গঠিত হবে পাঁচ সদস্য নিয়ে। ফলে প্রতিটি মামলায় আদালত হবে পৃথক বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন। মনোনীত দুই জনসহ কমপক্ষে চার জন বিচারক উপস্থিত থাকলে কোরাম হবে ও আদালত বসতে পারবে। প্রতিটি মামলায় নির্বাচিত বিচারকদের মধ্য থেকে একজন লটারির মাধ্যমে প্রধান বিচারকের আসনে আসীন হবেন। সংখ্যাগরিষ্ঠের মতের ভিত্তিতে মামলার আদেশ হবে। চার জনের উপস্থিতিতে মতামত ২-২ হলে প্রধান বিচারক যে পক্ষে মত দেবেন, মামলার রায় সেপক্ষেই গেছে বলে গণ্য হবে।
সুশীল সমাজের অনেকের দাবি ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানদের গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। ইউনিয়ন পরিষদ একটি রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান বিধায় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানদের গ্র্যাজুয়েট হওয়ার বা যে কোনো শিক্ষার মানদণ্ডে বেঁধে দেওয়ার প্রস্তাবে আমি ব্যক্তিগতভাবে বিরোধী। তবে গ্রাম আদালতের বিচারক প্যানেলের সদস্যদের শিক্ষাগত যোগ্যতা, বয়স, প্রভৃতি নির্ধারণ করে দেওয়ার পক্ষে। স্বচ্ছ ব্যক্তিত্বের অধিকারী বিচারক প্যানেলের সদস্যগণের ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা এসএসসি বা সমমানের পর কমপক্ষে তিন বছরের সফল অধ্যয়ন, বয়স ৫০ থেকে ৭২ বছর, নিজে ও পরিবারের কোনো সদস্য (স্বামী/স্ত্রী ও সন্তান) কখনোই কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য না থাকা বা পূর্বে কোনো স্থানীয় শাসন প্রতিষ্ঠানের কোনো পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা না করা প্রার্থীর যোগ্যতা হতে পারে। এমনকি কর্মরত সরকারি-বেসরকারি কোনো চাকরি বা আইনজীবীও প্রার্থী হতে পারবেন না। বিচারক প্যানেলের নির্বাচিত সদস্য মেয়াদন্তে কোনো স্থানীয় শাসন প্রতিষ্ঠানের নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন না বলে বিধান করতে হবে। একমাত্র বিচারক নির্বাচন ছাড়া গ্রাম আদালতের বিদ্যমান বিধিবিধান যেমন আছে, তেমনভাবেই থাকবে।













