সৌদি আরবের রিয়াদে একটি সোফা তৈরির কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১৬ বাংলাদেশির মৃত্যু হয়েছে। গত রবিবার স্থানীয় সময় বেলা ২টার দিকে শিফা থানা এলাকার মুসা সানাইয়া শিল্প এলাকায় আগুন লাগে। প্রাথমিকভাবে বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। নিহতদের মধ্যে নওগাঁ, নাটোর ও রাজশাহীর শ্রমিক রয়েছেন। শুধু আত্রাই উপজেলাতেই নিহতের সংখ্যা ১১ অথবা ১৩ বলে বিভিন্ন সূত্রে ভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে।
এই মর্মান্তিক ঘটনার মধ্যেই জানা গেছে, চুল কাটাতে যাওয়ায় এক বাংলাদেশি শ্রমিক প্রাণে বেঁচেছেন। অর্থাৎ একই কর্মস্থলে কয়েক মিনিটের উপস্থিতি ও অনুপস্থিতির ব্যবধানেই নির্ধারিত হতে পারে জীবন ও মৃত্যুর সীমারেখা। কিন্তু বিদেশে যাওয়া বাংলাদেশি শ্রমিকদের জীবন কি এমন আকস্মিকতার ওপর নির্ভর করবে?
সৌদি আরব বাংলাদেশের বৃহত্তম শ্রমবাজার। ২০২৫ সালে বাংলাদেশ থেকে ১১ লাখেরও বেশি মানুষ কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে বিদেশে গেছেন। তাদের দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি সৌদি আরবে গেছেন। এই বিপুল শ্রমশক্তি দেশের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স বৈদেশিক মুদ্রার ভান্ডারকে শক্তিশালী করে, পরিবারকে টিকিয়ে রাখে, গ্রামীণ অর্থনীতিতে অর্থের প্রবাহ সৃষ্টি করে। অথচ যাদের শ্রমে এই অর্থনীতি এতটা উপকৃত হয়, তাদের একটি বড় অংশ বিদেশে মানবেতর পরিবেশে বসবাস ও কাজ করেন। সংকীর্ণ কক্ষে অতিরিক্ত শ্রমিকের বসবাস, অগ্নিনিরাপত্তার ঘাটতি, পর্যাপ্ত বহির্গমনপথ না থাকা, ঝুঁকিপূর্ণ বৈদ্যুতিক সংযোগ, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা এবং নিয়োগকর্তার অনিয়মের অভিযোগ বহুদিনের। দুর্ঘটনা ঘটলে তখন শুরু হয় আরেক দুর্ভোগ। মৃতদেহ শনাক্তকরণ, ময়নাতদন্ত, আইনি আনুষ্ঠানিকতা, নিয়োগকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ এবং দেশে মরদেহ পাঠানোর দীর্ঘ প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপেই পরিবারকে উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকতে হয়।
রিয়াদের আগুনে ১৬টি প্রাণের মৃত্যু তাই কেবল একটি দুর্ঘটনা নয়। এটি আমাদের প্রবাসী শ্রমব্যবস্থার নিরাপত্তা ও মানবিকতার একটি বিষণ্ন চিত্র। এই বিষণ্ন বিবর্ণচিত্রের পরিবর্তন প্রয়োজন। প্রবাসীর জীবন কখনোই এত সস্তা হতে পারে না
এই জায়গায় রাষ্ট্রের দায়িত্ব অত্যন্ত স্পষ্ট। বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের জন্য প্রতিটি শ্রমবাজারে নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দেশের কর্তৃপক্ষ ও নিয়োগকর্তাদের সঙ্গে নিয়মিতভাবে আলোচনার প্রয়োজনীয়তা সবাই জানেন। দূতাবাস ও শ্রমকল্যাণ উইংকে শুধু দুর্ঘটনার পরে সক্রিয় হলে চলবে না। ঝুঁকিপূর্ণ কর্মস্থল শনাক্তকরণ, শ্রমিকদের অভিযোগ গ্রহণ, কর্মপরিবেশ পরিদর্শনে স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত উদ্ধার ও সহায়তার ব্যবস্থা গড়ে তোলার কথা আমরা কতখানি গুরুত্বের সঙ্গে চিন্তা করেছি? বিদেশ যাওয়ার আগে শ্রমিকদের প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রেও পরিবর্তন প্রয়োজন। শুধু কাজের দক্ষতা ও ভাষাজ্ঞান শিখিয়ে দায়িত্ব শেষ করা যাবে না। অগ্নিকাণ্ড, বৈদ্যুতিক দুর্ঘটনা, কর্মস্থল থেকে নিরাপদে বের হওয়ার পদ্ধতি, জরুরি নম্বর, স্থানীয় শ্রম আইন এবং দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগের ব্যবস্থা সম্পর্কে প্রত্যেক শ্রমিককে বাস্তবভিত্তিক প্রশিক্ষণ কি আমরা দিতে পারি না?
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনা। কোনো শ্রমিকের মৃত্যু হলে পরিবারের ওপর প্রশাসনিক বোঝা চাপানো মানবিকতার পরিপন্থী। সরকার এমন একটি কেন্দ্রীয় ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারে, যেখানে পরিবারকে এক দপ্তর থেকে অন্য দপ্তরে ছুটতে না হয়। পরিচয় শনাক্তকরণ, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, পরিবহন ও ক্ষতিপূরণের পুরো প্রক্রিয়া নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে সম্পন্ন করা দরকার। প্রবাসী শ্রমিককে কেবল রেমিট্যান্স পাঠানো একটি সংখ্যা হিসেবে দেখলে চলবে না। তারা প্রত্যেকেই একেকজন মানুষ—একটি পরিবারের অন্যতম অবলম্বন, কখনো বৃদ্ধ মা-বাবার শেষ আশ্রয়, কখনো সন্তানের ভবিষ্যতের একমাত্র ভরসা। বিদেশে তার শ্রমের মূল্য যদি দেশের অর্থনীতিতে এত বেশি হয়, তাহলে তার জীবনের মূল্যও রাষ্ট্রকে সমান গুরুত্বে বিবেচনা করতে হবে।
রিয়াদের আগুনে ১৬টি প্রাণের মৃত্যু তাই কেবল একটি দুর্ঘটনা নয়। এটি আমাদের প্রবাসী শ্রমব্যবস্থার নিরাপত্তা ও মানবিকতার একটি বিষণ্ন চিত্র। এই বিষণ্ন বিবর্ণচিত্রের পরিবর্তন প্রয়োজন। প্রবাসীর জীবন কখনোই এত সস্তা হতে পারে না।













