বিশ্বকাপ ফুটবলের পর্দা নামতে চলেছে। বিশ্বকাপ কেবল ফুটবলপ্রেমীদের উৎসব নয়; এটি মানবিকতা, শৃঙ্খলা ও মূল্যবোধেরও এক অনন্য পাঠশালা। এবারের বিশ্বকাপেও বিশ্ববাসী প্রত্যক্ষ করেছে জাপানি সমর্থকদের সেই সুপরিচিত দৃশ্য—খেলা শেষে গ্যালারি ত্যাগের আগে তারা নিজ হাতে চারপাশ পরিষ্কার করে গেছেন। এই কাজের জন্য কেউ তাদের পুরস্কৃত করেনি, বাধ্যও করেনি। তবু তারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে এটি করেছেন। কেন? কারণ, সুকর্মের মধ্যেই নিহিত রয়েছে এক গভীর আত্মতৃপ্তি। বাহ্যিক স্বীকৃতি নয়, এই আত্মতৃপ্তিই তাদের প্রকৃত প্রাপ্তি। সত্যি বলতে, এই আত্মতৃপ্তিই মানুষের অন্তরে এক অদৃশ্য ইতিবাচক শক্তির জন্ম দেয়।
প্রকৃতপক্ষে, সৎকর্মের প্রথম উপকারভোগী অন্য কেউ নয়, স্বয়ং কর্মকারী। মানুষ যখন কোনো উত্তম কাজে নিজেকে নিয়োজিত করে, তখন তার অন্তরে জন্ম নেয় এক নির্মল প্রশান্তি। সেই প্রশান্তি আত্মবিশ্বাসে পরিণত হয়; আত্মবিশ্বাস জন্ম দেয় আশাবাদের, আর আশাবাদ মানুষকে উদ্বুদ্ধ করে আরও বেশি সৎকর্মে। আধুনিক মনোবিজ্ঞানও বলছে, অন্যের উপকার করা কিংবা সামাজিক দায়িত্ব পালনের মতো ছোট ছোট সুকর্ম মানসিক চাপ কমায়, সুখানুভূতি বাড়ায় এবং জীবনের প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলতে সহায়তা করে। অর্থাৎ, সুকর্ম কেবল সমাজকল্যাণেরই উপায় নয়—এটি ব্যক্তিমানসকেও আলোকিত ও সমৃদ্ধ করে। তবে দুঃখের বিষয়, আমাদের সমাজে আজ নেতিবাচকতার বিস্তার ক্রমেই বাড়ছে। মানুষ যেন সুকর্মের প্রশংসার চেয়ে অন্যের ত্রুটি খুঁজতেই বেশি আগ্রহী। সমালোচনা, বিদ্বেষ, হিংসা ও পরশ্রীকাতরতা সামাজিক পরিবেশকে প্রতিনিয়ত ভারাক্রান্ত করে তুলছে। অথচ একটি ছোট সৎকর্ম—রাস্তায় ময়লা না ফেলা, বিপন্ন মানুষকে সাহায্য করা, একটি গাছ লাগানো কিংবা অন্যের ভালো কাজের অকপট প্রশংসা—এসবই মানুষের মনে আশার সঞ্চার করতে পারে। একটি প্রদীপ যেমন আরেকটি প্রদীপ জ্বালায়, তেমনি একটি মহৎ কাজ কিংবা একটি নির্মল চিন্তাও বহু মানুষের অন্তরে ইতিবাচকতার স্ফুলিঙ্গ জ্বালিয়ে দিতে সক্ষম।
মূলত এই কারণেই বলা হয়, সৎ চিন্তাও সৎকর্মের সমান মূল্যবান। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন, ‘যে ব্যক্তি অণু পরিমাণ সৎকর্ম করবে, সে তা দেখতে পাবে।’ (সুরা যিলযাল, আয়াত ৭)। এই আয়াত আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, কোনো সৎকর্মই তুচ্ছ নয়। পৃথিবীতে তার প্রভাব যতই ক্ষুদ্র বলে মনে হোক, মানুষের অন্তর ও সমাজজীবনে তার প্রতিফলন সুদূরপ্রসারী। মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘কোনো ভালো কাজকে তুচ্ছ মনে করো না।’ অর্থাৎ, সুকর্মের প্রকৃত মূল্য বাহ্যিক প্রশংসায় নয়; তা নিহিত থাকে অন্তরের পরিতৃপ্তিতে।
উন্নত জাতিগুলোর সাফল্যের অন্তরালে তাকালে দেখা যায়, তারা কেবল উচ্চকিত নীতিবাক্যে আস্থা রাখেনি; বরং দৈনন্দিন জীবনের ছোট অথচ মহৎ অভ্যাসগুলোকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। দায়িত্ববোধ, পরিচ্ছন্নতা, সময়ানুবর্তিতা ও পরোপকার—এই গুণগুলোই ধীরে ধীরে তাদের জাতীয় শক্তির ভিত্তিতে পরিণত হয়েছে। আমাদেরও কি সেই পথ অনুসরণ করা উচিত নয়? আমরা যদি প্রতিদিন অন্তত একটি সৎকর্ম দিয়ে দিনের সূচনা করি, তাহলে তার আত্মতৃপ্তি যেমন আমাদের ব্যক্তিজীবনকে আলোকিত করবে, তেমনি সেই ইতিবাচক শক্তি ধীরে ধীরে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রেও ছড়িয়ে পড়বে। প্রকৃতির চিরন্তন বিধানই হলো—বৃহৎ পরিবর্তনের সূচনা ঘটে ক্ষুদ্র পদক্ষেপে। বিন্দু বিন্দু জলধারায় যেমন সাগরের সৃষ্টি হয়, তেমনি অসংখ্য ছোট ছোট সুকর্ম মিলেই গড়ে ওঠে একটি মহান জাতির পরিচয়। একটি জাতির প্রকৃত উন্নয়ন নির্ধারিত হয় তার নাগরিকের চরিত্রে; কেবল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কিংবা অবকাঠামোগত উন্নয়নের মাধ্যমে নয়। আর সেই চরিত্র গড়ে ওঠে প্রতিদিনের ছোট ছোট সৎকর্মের ভিতের ওপর। আমাদের মনে রাখিতে হইবে, ভালো কাজের সর্বশ্রেষ্ঠ পুরস্কার বাহ্যিক সম্মান নয়; বরং এটি মানুষকে আরও উত্তম মানুষে পরিণত করে। সর্বোপরি, এই আত্মতৃপ্তির মধ্য দিয়েই গড়ে ওঠে ইতিবাচক মানসিকতা—যা আজকের সমাজে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।













