ধর্মীয় শিক্ষা ও নৈতিকতার এক পবিত্র আঁতুড়ঘর হিসেবে মাদ্রাসাগুলো যুগ যুগ ধরে আমাদের সমাজের মানুষের অগাধ শ্রদ্ধা ও বিশ্বাসের কেন্দ্রবিন্দু। অভিভাবকেরা নিজেদের সন্তানদের একবুক আশা ও পরম বিশ্বাস নিয়ে এসব প্রতিষ্ঠানে পাঠান, যেন তারা জাগতিক ও আধ্যাত্মিক জ্ঞানে আলোকিত সৎ মানুষ হয়ে ওঠে।
কিন্তু চরম উদ্বেগের বিষয় হলো, সাম্প্রতিক সময়ে কিছু ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ঘটে যাওয়া শারীরিক নির্যাতন, যৌন নিপীড়ন ও প্রাতিষ্ঠানিক অনিয়মের ভয়াবহ চিত্র সমাজের এই পবিত্র আস্থার জায়গাটিকে গভীরভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। রক্ষক যখন ভক্ষকের রূপ নেয় এবং ধর্মীয় লেবাসের আড়ালে পৈশাচিকতা লুকিয়ে থাকে, তখন তা কেবল একটি ফৌজদারি অপরাধ নয়; বরং গোটা সমাজের নৈতিক কাঠামোর ওপর এক ভয়াবহ আঘাত।
“ইকরা বিসমি রাব্বিকাল্লাজি খালাক”—অর্থাৎ, “পাঠ করুন আপনার প্রতিপালকের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন।” পবিত্র কুরআনের ৯৬তম সূরা ‘আল-আলাক’-এর এই আয়াতের মাধ্যমেই মুসলিম উম্মাহর মধ্যে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দেওয়ার যাত্রা শুরু। সন্তানকে ইসলামি দীনের পথে পরিচালিত করতে, ধর্মীয় জ্ঞানে সমৃদ্ধ করতে এবং ইসলামের সুশীতল ছায়ায় জীবন গড়তে পিতামাতার প্রথম ও প্রধান বিশ্বস্ত আশ্রয় হলো মাদ্রাসা। এখানে ইসলামি ধর্মতত্ত্ব, আইনবিজ্ঞান (ফিকহ), কুরআন, হাদিস এবং বর্তমানে এসব বিষয়ের পাশাপাশি সাধারণ শিক্ষার সমন্বয়ে পাঠদান করা হয়।
দেশের লক্ষ লক্ষ আদর্শ আলেম ও হাজারো মাদ্রাসা অত্যন্ত সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দ্বীনি শিক্ষা প্রদান করে যাচ্ছেন। গুটিকয়েক দুর্নীতিগ্রস্ত ও বিকৃত মানসিকতার অপরাধীর কারণে পবিত্র এই শিক্ষাব্যবস্থা ও আলেম সমাজের সম্মান কোনোভাবেই ভুলুণ্ঠিত হতে দেওয়া যায় না
বাংলাদেশের মাদ্রাসাগুলোকে প্রধানত দুটি শ্রেণিতে ভাগ করা যায়—সরকারি বোর্ড নিয়ন্ত্রিত ‘আলিয়া মাদ্রাসা’ এবং সম্পূর্ণ বেসরকারি উদ্যোগে পরিচালিত ‘কওমি মাদ্রাসা’। শিক্ষার আলোর আশায় এসব প্রতিষ্ঠানে যাওয়া কোমলমতি শিশুরা যখন মাদ্রাসার চার দেয়ালের ভেতরের ভয়াল ও অন্ধকার রূপের সঙ্গে পরিচিত হয়, তখন সেটি ইসলামি শিক্ষার মূল চেতনা ও আদর্শের চরম অবমাননায় পরিণত হয়।
সংবাদমাধ্যমের পাতা খুললেই সাম্প্রতিক সময়ে এমন কিছু নির্মম বাস্তবতার চিত্র চোখে পড়ে, যা নিছক কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং আমাদের পরম আস্থার চরম লঙ্ঘনের এক ভয়াবহ দলিল। নেত্রকোনার মদনে ১১ বছর বয়সী এক শিশু শিক্ষার্থীর অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ার ঘটনা কিংবা এপ্রিলের শেষদিকে নরসিংদীর রায়পুরায় ১০ বছর বয়সী ছাত্রীর ওপর হওয়া যৌন নিপীড়নের সংবাদ আমাদের মনে এই কঠিন প্রশ্ন জাগায়—সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়েই শিশুরা আজ কতটা অনিরাপদ!
দেশের আনাচে-কানাচে ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে ওঠা অসংখ্য অনিবন্ধিত আবাসিক মাদ্রাসায় সরকারি কোনো কার্যকর নজরদারি নেই। এই বদ্ধ পরিবেশ ও জবাবদিহির অভাবকে পুঁজি করেই বিকৃত মস্তিষ্কের অপরাধীরা তাদের লালসা চরিতার্থ করে
চরম উদ্বেগের বিষয় হলো, এই প্রাতিষ্ঠানিক ও নৈতিক অবক্ষয়ের শিকার কেবল কন্যাশিশুরাই নয়; ছেলে শিশুরাও এই অনিরাপদ বৃত্তের বন্দি। নরসিংদীতে সাত বছর বয়সী শিশু মুজাহিদের ওপর শিক্ষকের নির্মম শারীরিক নির্যাতন কিংবা জয়পুরহাট ও টাঙ্গাইলের ভূঞাপুরে কোমলমতি ছাত্রদের ওপর মাসের পর মাস চলতে থাকা যৌন নিপীড়নের ঘটনাগুলো প্রমাণ করে, বিকৃত মানসিকতার এই অপরাধগুলোর কোনো লিঙ্গভেদ নেই। পত্রিকার পাতায় প্রকাশিত এই নামগুলো কেবল কিছু অপরাধের পরিসংখ্যান নয়; এগুলো একেকটি ধ্বংস হয়ে যাওয়া শৈশব এবং আমাদের সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক নজরদারির চরম ব্যর্থতার স্পষ্ট প্রমাণ।
শারীরিক ও যৌন নিপীড়নের পাশাপাশি এই প্রতিষ্ঠানগুলোর কাঠামোগত ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির চিত্রও কম ভয়াবহ নয়। সম্প্রতি গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে জানা যায়, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে জাল সনদধারী ২৬২ জন শিক্ষকের খোঁজ পেয়েছে সরকার। যারা নিজেরাই জালিয়াতি, প্রতারণা ও দুর্নীতির আশ্রয় নিয়ে ধর্মীয় শিক্ষার মতো পবিত্র ও মহান পেশায় প্রবেশ করেছেন, তাদের কাছ থেকে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা কী নৈতিক শিক্ষা পাবে? শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে এই চরম অস্বচ্ছতা ও দুর্নীতিই প্রমাণ করে, কাঠামোগত গলদ আজ কতটা গভীরে পৌঁছেছে। যোগ্য, পরীক্ষিত ও নৈতিকতাসম্পন্ন শিক্ষকের অভাব এবং নিয়োগ-বাণিজ্যের কারণেই আজ পবিত্র এই শিক্ষাঙ্গনগুলোর একটি অংশ অপরাধীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হচ্ছে।
শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে জাল সনদ যাচাইয়ের পাশাপাশি তাঁদের নৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক প্রোফাইল পরীক্ষা করা জরুরি। পাশাপাশি সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে মাদ্রাসার পাঠ্যক্রমে কোমলমতি শিশুদের ‘গুড টাচ’ ও ‘ব্যাড টাচ’ সম্পর্কে সচেতনতামূলক শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করতে হবে
এখন প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক—শিক্ষাঙ্গনগুলোতে এমন পৈশাচিকতা ও দুর্নীতি কেন বারবার ঘটছে? এর অন্যতম প্রধান কারণ হলো তদারকির অভাব এবং ‘ভয়ের সংস্কৃতি’। অপরাধী শিক্ষকেরা খুব সুকৌশলে কোমলমতি শিশুদের মনে এই ভয় ঢুকিয়ে দেন যে, ‘হুজুরের বিরুদ্ধে কথা বললে গুনাহ হবে’। আবার অনেক ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের বদনাম হবে—এমন ঠুনকো অজুহাতে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ বা স্থানীয় প্রভাবশালীরা ঘটনাগুলো ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেন। এ ছাড়া দেশের আনাচে-কানাচে ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে ওঠা অসংখ্য অনিবন্ধিত আবাসিক মাদ্রাসায় সরকারি কোনো কার্যকর নজরদারি নেই। এই বদ্ধ পরিবেশ ও জবাবদিহির অভাবকে পুঁজি করেই বিকৃত মস্তিষ্কের অপরাধীরা তাদের লালসা চরিতার্থ করে।
আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে এই চিত্র আরও হতাশাজনক। বাংলাদেশ সংবিধানের ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রতিটি নাগরিকের জীবনের অধিকার ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। এ ছাড়া ২০১১ সালে মহামান্য হাইকোর্ট এক যুগান্তকারী রায়ের মাধ্যমে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের শারীরিক শাস্তি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। ‘শিশু আইন, ২০১৩’-তেও শিশুদের শারীরিক ও মানসিক সুরক্ষার সুস্পষ্ট বিধান রয়েছে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, এসব আইনের কঠোর প্রয়োগ না থাকায় এবং অনেক ক্ষেত্রেই সামাজিকভাবে ‘শালিস’-এর মাধ্যমে আপস-মীমাংসা করে ফেলার কারণে অপরাধীরা সহজেই পার পেয়ে যাচ্ছে। ধর্মকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে অপরাধীদের এই দায়মুক্তি সমাজকে এক ভয়াবহ অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
এই ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থায় কাঠামোগত আধুনিকায়ন ও কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। প্রথমত, দেশের প্রতিটি আলিয়া, কওমি ও স্বতন্ত্র আবাসিক মাদ্রাসাকে বাধ্যতামূলকভাবে সরকারি নিবন্ধনের আওতায় আনতে হবে। আবাসিক মাদ্রাসাগুলোর প্রতিটি করিডর, শ্রেণিকক্ষ ও প্রবেশপথে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করে নিয়মিত মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। দ্বিতীয়ত, শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে জাল সনদ যাচাইয়ের পাশাপাশি তাঁদের নৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক প্রোফাইল পরীক্ষা করা জরুরি। পাশাপাশি সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে মাদ্রাসার পাঠ্যক্রমে কোমলমতি শিশুদের ‘গুড টাচ’ ও ‘ব্যাড টাচ’ সম্পর্কে সচেতনতামূলক শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। অভিভাবকদেরও অন্ধবিশ্বাসের খোলস থেকে বেরিয়ে এসে সন্তানদের সঙ্গে নিয়মিত কথা বলতে হবে এবং তাদের মানসিক ও শারীরিক অবস্থার খোঁজ নিতে হবে।
আমাদের মনে রাখতে হবে, ইসলাম শান্তির ধর্ম এবং মাদ্রাসা হলো সেই শান্তি, নৈতিকতা ও মানবিকতা শিক্ষার অন্যতম শ্রেষ্ঠ মাধ্যম। দেশের লক্ষ লক্ষ আদর্শ আলেম ও হাজারো মাদ্রাসা অত্যন্ত সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দ্বীনি শিক্ষা প্রদান করে যাচ্ছেন। গুটিকয়েক দুর্নীতিগ্রস্ত ও বিকৃত মানসিকতার অপরাধীর কারণে পবিত্র এই শিক্ষাব্যবস্থা ও আলেম সমাজের সম্মান কোনোভাবেই ভুলুণ্ঠিত হতে দেওয়া যায় না। অপরাধীর একমাত্র পরিচয় সে অপরাধী; তার কোনো ধর্মীয় লেবাস থাকতে পারে না। তাই ধর্মীয় শিক্ষার এই প্রতিষ্ঠানগুলো যেন পুনরায় শিশুদের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ ও শান্তির আশ্রয়ে পরিণত হয়, তা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র, সমাজ ও ধর্মীয় নেতাদের এখনই একযোগে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
- খন্দকার রামীম হাসান পায়েল
তরুণ লেখক ও কলামিস্ট; শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ, গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।
ই-মেইল : [email protected]
(এই লেখা লেখকের একান্ত ব্যক্তিগত অভিমত; এ সংক্রান্ত কোনো দায় দৈনিক মূলধারা বহন করবে না)













