ঈদের রাতে আকাশে চাঁদ ওঠে। সেই চাঁদ দেখে কেউ মায়ের কোলে মুখ গুঁজে বলে, “আম্মু, ঈদ এসে গেছে!” বাড়িতে সেমাই রান্নার গন্ধ ভেসে আসে, নতুন জামা আলমারিতে ঝুলছে, আর পরদিন সকালে ঈদগাহে যাওয়ার আনন্দে ঘুম আসতে চায় না। কিন্তু সেই একই চাঁদ যখন রেলস্টেশনের প্ল্যাটফর্মে পড়ে, যখন বাস টার্মিনালের ভাঙা ছাদের ফাঁক দিয়ে ফুটপাতে এসে পৌঁছায়, তখন সেখানে শুয়ে থাকা আট বছরের একটি ছেলে হয়তো সেদিকে তাকিয়েও থাকে না। সে জানে না ঈদ কী; সে জানে শুধু একটি সত্য—আজ রাতেও তার পেট খালি।
এই দেশে প্রতি বছর ঈদ আসে। লাখো মানুষ আনন্দে মেতে ওঠে, বাড়ি ফেরে, কোলাকুলি করে, ক্ষমা চায়, ক্ষমা করে। কিন্তু এই উৎসবের বিশাল ঢেউ যখন পুরো শহরকে রঙিন করে তোলে, তখন ফুটপাতের কোণে, বাস টার্মিনালের ছাদের নিচে, রেলস্টেশনের পুরোনো বেঞ্চের আড়ালে কিছু শিশু নিঃশব্দে আরেকটি সাধারণ রাত পার করে। তাদের জন্য ঈদ আসে না, উৎসব আসে না; আসে শুধু আরেকটি দিন, আরেকটি রাত।
তাদের ঈদ নেই।
একটি প্রশ্ন আছে—এই দিনটি তার জন্য কেন নেই?
আমরা কি সেই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারি?
বাংলাদেশে পথশিশুর সঠিক সংখ্যা নিয়ে সরকারি ও বেসরকারি তথ্যে বিস্তর ফারাক রয়েছে। বিভিন্ন সমাজকল্যাণ সংস্থা ও গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, এই সংখ্যা কয়েক লাখ ছাড়িয়েছে। ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, রাজশাহী, খুলনা—প্রতিটি বড় শহরের নাড়িতে এই শিশুরা বাস করে। তারা ফুটপাতে ঘুমায়, ভিক্ষা করে, ময়লা কুড়ায়, যানবাহনের পেছনে ঝুলে পত্রিকা ফেরি করে, চায়ের দোকানে ছোটখাটো কাজ করে বেঁচে থাকে।
এদের মধ্যে কারও বাবা নেই, কারও মা নেই, কারও দুজনেই নেই। আবার কেউ কেউ আছে, যাদের বাবা-মা জীবিত, কিন্তু নেই আদর, নেই আশ্রয়, নেই সেই উষ্ণতা—যা একটি শিশুর মানুষ হয়ে ওঠার জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। দারিদ্র্যের কারণে কেউ ঘর ছেড়েছে, কাউকে বের করে দেওয়া হয়েছে, কেউ সৎ বাবা বা মায়ের নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে পালিয়ে এসেছে। পার্থক্যটুকুও হয়তো তারা নিজেরা আর মনে রাখে না।
এই শিশুরা কোনো দুর্ঘটনার ফল নয়; তারা একটি ব্যবস্থার শিকার। একটি রাষ্ট্রের, একটি সমাজের, একটি অর্থনীতির ব্যর্থতার জীবন্ত প্রমাণ হয়ে তারা রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে—আর আমরা পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি।
রাস্তায় বড় হওয়া মানে শুধু কষ্টে বড় হওয়া নয়; রাস্তায় বড় হওয়া মানে প্রতিদিন একটু একটু করে ভেঙে পড়া। প্রতিটি সকাল শুরু হয় বেঁচে থাকার লড়াই দিয়ে—খাবারের জন্য, আশ্রয়ের জন্য, নিরাপত্তার জন্য।
একটি শিশু যখন ফুটপাতে বড় হয়, তার চারপাশে কোনো শিক্ষক থাকে না, যে তাকে ভালো-মন্দের পার্থক্য শেখাবে। কোনো মা থাকে না, যে রাতে গল্প বলবে, ভুল করলে বকবে, আবার কাছে টেনে নেবে। কোনো বাবা থাকে না, যার হাত ধরে সে স্কুলে যাবে। থাকে শুধু রাস্তা—নিষ্ঠুর, কঠোর, বেপরোয়া।
এই রাস্তায় টিকে থাকতে হলে রাস্তার নিয়ম মানতে হয়। আর সেই নিয়ম কোনো পাঠ্যবইয়ে লেখা নেই।
এখন আসা যাক সেই প্রশ্নে, যেটি নিয়ে ভদ্র সমাজ কথা বলতে চায় না।
এই পথশিশুদের একটি বড় অংশ ধীরে ধীরে অপরাধের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। এটি তাদের স্বভাবের দোষ নয়; এটি পরিস্থিতির নির্মম পরিণতি। ক্ষুধার কাছে নীতি টেকে না। বেঁচে থাকার তাড়নায় মানুষ যা করে, একটি অভুক্ত দশ বছরের শিশুও তাই করে।
শহরের বিভিন্ন এলাকায় পথশিশুদের ব্যবহার করে পকেটমারা, ছোটখাটো চুরি, এমনকি মাদক বহনের মতো কাজ করানো হচ্ছে। এর পেছনে রয়েছে সংঘবদ্ধ চক্র, যারা এই শিশুদের দুর্বলতাকে পুঁজি করে। তারা আশ্রয় দেয়, খাবার দেয়, ‘আপন’ মনে করায়, তারপর ধীরে ধীরে অপরাধের জালে টেনে নেয়। একটি শিশু যখন প্রথমবার পকেট মেরে পেট ভরায়, তখন সে বুঝতে পারে না—সে এমন এক পথে নামছে, যেখান থেকে ফিরে আসা কঠিন।
এরপর আসে মাদক।
ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন শহরে পথশিশুদের মধ্যে ড্যান্ডি—অর্থাৎ আঠার নেশা—ভয়াবহভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। পাশাপাশি গাঁজা, ফেনসিডিল, এমনকি ইয়াবার মতো মাদকও তাদের নাগালে চলে এসেছে। প্রশ্ন হলো—কেন একটি শিশু নেশায় জড়িয়ে পড়ে?
কারণ নেশা ক্ষুধা ভুলিয়ে দেয়, ঠান্ডা ভুলিয়ে দেয়, একাকীত্ব ভুলিয়ে দেয়। নেশা কিছুক্ষণের জন্য সেই ব্যথাকে মুছে দেয়—যার নাম, কেউ না থাকা; কিছু না থাকা; কোনো ভবিষ্যৎ না থাকা।
যে বয়সে তার হাতে বই থাকার কথা, সেই বয়সে সে রাস্তার অন্ধকারে আঠার প্যাকেট শুঁকে একটু ঘুমানোর চেষ্টা করছে। এটি তার পছন্দ নয়; এটি সেই বাস্তবতা, যা আমরা তাকে উপহার দিয়েছি।
একটি শিশু যখন অপরাধী হয়, সমাজ তাকে দোষ দেয়। কিন্তু কেউ প্রশ্ন করে না—কোন সমাজ তাকে এই পথে ঠেলে দিয়েছে? কেন রাষ্ট্র তাকে রক্ষা করেনি? কেন পরিবার তাকে ধরে রাখতে পারেনি?
ঈদের সকালে নতুন পাঞ্জাবি পরে কেউ গাড়ি চালিয়ে ঈদগাহে যাচ্ছেন। জানালার কাচের বাইরে, রাস্তার মোড়ে একটি ছেলে দাঁড়িয়ে—ছেঁড়া টি-শার্ট, খালি পা, চোখে অনিশ্চিত দৃষ্টি। বাস টার্মিনালের পাশে একটি মেয়ে ভোরের আলোয় একা বসে আছে; তার গায়ে ঈদের কোনো চিহ্ন নেই। ফুটপাতে একটি ছোট ছেলে ঘুম থেকে উঠে তাকিয়ে আছে উৎসবমুখর মানুষদের দিকে—যেন অন্য কোনো পৃথিবীর দৃশ্য দেখছে।
সেই দৃষ্টিতে ঈর্ষা আছে কি না, জানা নেই। কিন্তু একটি প্রশ্ন আছে—এই দিনটি তার জন্য কেন নেই?
আমরা কি সেই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারি?
প্রতিবছর ঈদের আগে পথশিশুদের নিয়ে দু-একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। কিছু এনজিও সেমাই খাওয়ায়, নতুন জামা দেয়, ছবি তোলে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেই ছবি ছড়িয়ে পড়ে; মানুষ প্রশংসা করে। তারপর ঈদ শেষ হয়। পত্রিকা নতুন বিষয়ের দিকে যায়, প্রকল্প বদলায়—আর শিশুরা ফিরে যায় সেই একই ফুটপাতে, হয়তো আরও কিছুটা অন্ধকারে।
এই দেশে পথশিশুদের জন্য নীতি আছে, আইন আছে, সরকারি প্রকল্প আছে। কাগজে-কলমে সবই আছে। কিন্তু বাস্তবায়নের জায়গায় এসে সবকিছু থেমে যায়। রাষ্ট্র এই শিশুদের নাগরিক হিসেবে স্বীকার করে, কিন্তু মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার দায়িত্ব নেয় না।
আর এই দায়িত্বহীনতার মাশুল দেয় শিশুরা—প্রথমে ক্ষুধায়, তারপর নেশায়, তারপর অপরাধে। একটি ব্যর্থ রাষ্ট্র তাদের রাস্তায় ঠেলে দেয়, আর পরে সেই রাষ্ট্রই তাদের অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করে। এর চেয়ে নির্মম পরিহাস আর কী হতে পারে?
সমাজেরও দায় আছে—এবং সেই দায় এড়ানোর কোনো সুযোগ নেই।
আমরা যারা ঈদের বাজারে ব্যস্ত, রেস্তোরাঁয় ইফতার করছি, উৎসবে মেতে উঠছি—আমাদের পাশেই এই শিশুরা রয়েছে। আমরা তাদের দেখি, আবার দেখি না; চোখ সরিয়ে নিই।
ইসলামে যাকাত ও ফিতরার বিধান রয়েছে। কিন্তু সেই অর্থ প্রকৃত প্রয়োজনীয় মানুষের কাছে কতটা পৌঁছায়—তা কি আমরা ভেবে দেখি?
একটি সচেতন সমাজ গড়তে হলে শুধু নিজের পরিবারের কথা ভাবলেই চলবে না; ভাবতে হবে পাশের মানুষটির কথা, পথের শিশুটির কথা। ঈদের আনন্দ তখনই পূর্ণ হয়, যখন তা সবার মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে।
মনে রাখা প্রয়োজন—এই শিশুরা আজ যা হয়েছে, তার দায় আমাদের সবার। রাষ্ট্রের, সমাজের, পরিবারের। কেউ জন্ম নেয় না অপরাধী হওয়ার জন্য, কেউ জন্ম নেয় না নেশাগ্রস্ত হওয়ার জন্য, কেউ জন্ম নেয় না রাস্তায় ঘুমানোর জন্য।
একটি শিশু পৃথিবীতে আসে সম্ভাবনা নিয়ে। সে একজন চিকিৎসক হতে পারত, একজন লেখক হতে পারত, একজন সচেতন নাগরিক হতে পারত। কিন্তু সেই সম্ভাবনাকে আমরা বিকশিত হতে দিইনি। আমরা তাকে রাস্তায় ঠেলে দিয়েছি, তারপর ভুলে গেছি।
ইতিহাস কিন্তু ভোলে না।
ঈদের চাঁদ সবার আকাশেই ওঠে। কিন্তু যার ঘর নেই, যার মা নেই, যার পেটে ভাত নেই—সে কোন আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে সেই চাঁদ দেখে?
ফুটপাতের সেই মেয়েটি, রেলস্টেশনের সেই ছেলেটি, বাস টার্মিনালের সেই শিশুটি—তারা কি ঈদের রাতে আকাশের দিকে তাকায়? নাকি তাকানোর শক্তিটুকুও তাদের কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া হয়েছে?
এই প্রশ্ন আমাদের সবার।
রাষ্ট্র যদি দায়িত্ব না নেয়, সমাজকে নিতে হবে।
সমাজ যদি না দেখে, বিবেককে দেখতে হবে।
বিবেক যদি না কাঁদে, কলম কাঁদবে।
আর কলমও যদি থেমে যায়, তবে ফুটপাতের সেই মেয়েটি, রেলস্টেশনের সেই ছেলেটি, বাস টার্মিনালের সেই শিশুটি—তারা সবাই একা থেকে যাবে, এক উদাসীন চাঁদের নিচে, নিঃশব্দে।
লেখক : তরুণ কলামিস্ট ও শিক্ষার্থী, গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
E-mail : [email protected]













