২১শে নভেম্বর, সশস্ত্র বাহিনী দিবস বাংলাদেশের ইতিহাসে অত্যন্ত গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়। ১৯৭১ সালের এই দিনে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে বাংলাদেশের সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনী শুরু করেছিল সমন্বিত আক্রমণ। জীবন-মরণ এই যুদ্ধে তাদের আত্মত্যাগে মহান মুক্তিযুদ্ধের বিজয় হয়েছিল ত্বরান্বিত। মুক্তিবাহিনীর সমন্বিত রণকৌশল ঘুরিয়ে দিয়েছিল যুদ্ধের মোড়, বিশ্ব দরবারে পৌঁছে গিয়েছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য নবসৃষ্ট সামরিক বাহিনীর আমরণ সংগ্রামের দৃঢ়প্রতিজ্ঞার সুস্পষ্ট বার্তা। আমরা সেই বীর সেনানীদেরই উত্তরসূরি। বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী দিবসের প্রাক্কালে ভবিষ্যত্ প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে চায় তাদের নিঃস্বার্থ আত্মত্যাগের বীরত্বগাথা।
১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ মধ্যরাতে পূর্ব পাকিস্তানে শুরু হয় সামরিক অভিযান ‘অপারেশন সার্চলাইট’। মানুষের আর্তচিত্কারে ভারী হয়ে ওঠে চারিদিক। কানে ভেসে আসে কান্নার রোল, বাতাসে রক্তের গন্ধ। ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট, ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস এবং পুলিশের মধ্যে থাকা দেশপ্রেমিক বাংলা মায়ের অকুতোভয় সন্তানেরা রুখে দাঁড়ান, গড়ে তোলেন সশস্ত্র প্রতিরোধ, শুরু হয় মুক্তির সংগ্রাম। ২৬শে মাচর্, ৮ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের উদ্যোগে কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে ভেসে আসে স্বাধীনতার ডাক। দাউ দাউ করে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে বিদ্রোহের আগুন। অবজ্ঞা আর অপমানের গ্লানি থেকে প্রতিশোধের স্পৃহায় ফুঁসে ওঠেন পূর্ব পাকিস্তানের মুক্তিকামী মানুষ। খেটে খাওয়া মানুষগুলো তুলে নেন অস্ত্র। আবালবৃদ্ধবনিতা ঝাঁপিয়ে পড়েন মুক্তিযুদ্ধে। কিন্তু যুদ্ধ তো আর ছেলের হাতের মোয়া নয়, এজন্য চাই কঠোর প্রশিক্ষণ, সুদক্ষ নেতৃত্ব, সামরিক কাঠামো ও রাজনৈতিক অভিভাবকত্ব।
৪ঠা এপ্রিল ১৯৭১, তত্কালীন সিলেট জেলার হবিগঞ্জ মহকুমার মাধবপুর থানার তেলিয়াপাড়ায় কর্নেল মুহাম্মদ আতাউল গনি ওসমানী ও পূর্ব পাকিস্তানে কর্মরত বাঙালি সামরিক অফিসাররা মিলিত হন আলোচনার টেবিলে। বৈঠকে কর্নেল ওসমানীকে মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক মনোয়ন ও প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার গঠনের প্রস্তাবসহ যুদ্ধের জন্য অস্ত্র ও গোলাবারুদ সংগ্রহ, সীমান্তবর্তী ভূখণ্ড ব্যবহারের অনুমতি, নেতৃত্বের কাঠামো গঠন, সামরিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা, এবং দায়িত্ব বণ্টনের মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। বৈঠক শেষে কর্নেল ওসমানী পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে সবাইকে দেশ স্বাধীনের শপথবাক্য পাঠ করান। এরপর ১০ই এপ্রিল তেলিয়াপাড়ায় দ্বিতীয় সেনা বৈঠকে সব কমান্ডারকে নিজ দায়িত্বপ্রাপ্ত এলাকায় যুদ্ধরত ক্ষুদ্র বাহিনীর সদস্যদের একই কমান্ড চ্যানেলে এনে সমন্বিত অভিযানে যাওয়ার সিদ্ধান্ত জানানো হয়। শুরু হয় শৃঙ্খলাবদ্ধ সমন্বিত মুক্তির সংগ্রাম।
রাজনৈতিক অভিভাবকের শূন্যতা পূরণে ৪ঠা এপ্রিল প্রস্তাবনার আলোকে, ১৯৭১ সালের ১৭ই এপ্রিল মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলায় (মুজিবনগর) গঠিত হয় অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকার। মুক্তিবাহিনীর সর্বাধিনায়ক হিসাবে ঘোষিত হয় কর্নেল ওসমানীর নাম। শুরু হয় মুক্তিবাহিনীকে সংগঠিতকরণের প্রক্রিয়া। পাকিস্তানি সামরিক ও আধাসামরিক বাহিনীর বিদ্রোহী সদস্যদেরকে নিয়ে তৈরি হয় নিয়মিত ‘মুক্তিবাহিনী’। এর পাশাপাশি সামরিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সাধারণ জনগণকে নিয়ে গঠিত হয় ‘গণবাহিনী’ নামে গেরিলা যোদ্ধা দল। যুদ্ধ নিয়ন্ত্রণ ও রণকৌশল সুবিধাপ্রাপ্তিতে সেনা কর্মকর্তাদের নেতৃত্বে বাংলাদেশকে ভাগ করা হয় ১১টি সেক্টরে। জেড-ফোর্স, এস-ফোর্স, কে-ফোর্স নামে গড়ে উঠে তিনটি স্বতন্ত্র ব্রিগেড। অসীম সাহসী মুক্তিসেনারা দখলদার হানাদারদের বিরুদ্ধে লড়ে চলেন এক অসম যুদ্ধ।
সেনাবাহিনীর পাশাপাশি, নৌ এবং বিমান বাহিনীর বিকাশ স্বাধীনতাযুদ্ধের ইতিহাসের এক বুদ্ধিদীপ্ত সংযোজন। জুলাই ১৯৭১, সেক্টর কমান্ডার সম্মেলনের ঘোষণা অনুযায়ী গড়ে ওঠে বাংলাদেশ নৌবাহিনী। ২৮শে সেপ্টেম্বর থেকে ভারত থেকে প্রাপ্ত ‘পদ্মা’ ও ‘পলাশ’ নামের দুইটি ছোট গানবোট নিয়ে শুরু হয় নৌবাহিনীর আনুষ্ঠানিক যাত্রা। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পরিচালিত অভিযানের মধ্যে ‘অপারেশন জ্যাকপট’ বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় নৌ সেক্টর কর্তৃক পরিচালিত সফলতম গেরিলা অপারেশন। ১৯৭১ সালের ১৫ই আগস্ট রাত ১২টার পর অর্থাত্ ১৬ই আগস্ট প্রথম প্রহরে চট্টগ্রাম ও মোংলা সমুদ্রবন্দরসহ চাঁদপুর ও নারায়ণগঞ্জ নদীবন্দরে নৌ কমান্ডোরা একযোগে চালান ধ্বংসাত্মক আক্রমণ। নিমজ্জিত হয় হানাদার বাহিনীর ২৬টি পণ্য ও যুদ্ধ সরঞ্জামবাহী জাহাজ এবং গানবোট। অকার্যকর হয়ে পড়ে সমুদ্রপথ এবং নৌবন্দর। মুখোশের আড়ালে থাকা পাকিস্তান সরকারের নাজুক অবস্থা বহির্বিশ্বের কাছে হয়ে যায় উন্মুক্ত। পরবর্তীকালে, গানবোট ‘পদ্মা’ এবং ‘পলাশ’ পশুর নদে ‘অপারেশন হটপ্যান্টস’ পরিচালনা করে ধ্বংস করে শত্রুর যুদ্ধ ও বাণিজ্যিক জাহাজ। মুক্তিযুদ্ধে অসীম সাহসিকতা ও আত্মত্যাগের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ নৌবাহিনীর ইঞ্জিনরুম আর্টিফিসার মোহাম্মদ রুহুল আমিনের ‘বীরশ্রেষ্ঠ’ উপাধিসহ মোট ২১ জনকে খেতাবে ভূষিত করা হয়। অন্যদিকে, ‘কিলো ফ্লাইট’ নামে ১৯৭১ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর ভারতের নাগাল্যান্ডের ডিমাপুরে আত্মপ্রকাশ করে বাংলাদেশ বিমান বাহিনী। একটি অটার ও একটি ড্যাকোটা বিমান এবং একটি অ্যালুয়েট হেলিকপটারের সমন্বয়ে শুরু হয় এই বাহিনীর পথচলা (৭)। মুক্তিযুদ্ধকালে হানাদার বাহিনীর অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় সফল আক্রমণ চালিয়ে চূড়ান্ত বিজয়কে ত্বরান্বিত করতে কিলো ফ্লাইটের অবদান অনস্বীকার্য। অসামান্য বীরত্ব ও আত্মত্যাগের স্বীকৃতিস্বরূপ স্বাধীন বাংলাদেশে বিমান বাহিনীর ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমানের ‘বীরশ্রেষ্ঠ’ উপাধিসহ মোট ২৩ জনকে বীরত্বসূচক খেতাবে সম্মানিত করা হয়।
মুক্তিযোদ্ধাদের গেরিলা আক্রমণে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী যখন পর্যুদস্ত, তখন রণকৌশলে আসে আমূল পরিবর্তন। গেরিলা যুদ্ধের ধাপ শেষে, ২১শে নভেম্বর সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনী মুক্তিপাগল জনগণের সঙ্গে একাত্ম হয়ে দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে শুরু করে সমন্বিত আক্রমণ।
২১শে নভেম্বরের সমন্বিত হামলার অন্যতম স্থান ছিল যশোর সেনানিবাস থেকে ১১ কিলোমিটার দূরের গরীবপুর। যশোর-চৌগাছা অক্ষ বরাবর সামরিক অগ্রযাত্রায় এ স্থানটি ছিল কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ২০শে নভেম্বর, মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় মিত্রবাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত যৌথ বাহিনী বয়রা সীমান্ত দিয়ে কপোতাক্ষ নদ পেরিয়ে প্রতিরক্ষা অবস্থান নেয় গরীবপুরে। হানাদার বাহিনীর ১০৭ ব্রিগেড ২১শে নভেম্বর ভোরে ট্যাংক ও আর্টিলারির সহায়তায় গরীবপুরের ওপর শুরু করে আক্রমণ। কিন্তু যৌথ বাহিনীর প্রতিরোধের মুখে তা ভেস্তে যায়। ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির মুখে হানাদার বাহিনীর মনোবল যায় সম্পূর্ণ গুঁড়িয়ে। এ বিজয়ের মধ্য দিয়ে যশোর সেনানিবাস পতনের ঘণ্টাধ্বনি বেজে ওঠে। নিরুপায় হানাদার বাহিনী তার হেডকোয়ার্টার্স যশোর থেকে খুলনাতে সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়।
মুক্তিযোদ্ধাদের সমন্বিত আক্রমণ যখন একাদিক্রমে সাফল্যের স্বাক্ষর রাখতে শুরু করে, ঠিক তখনই ৩রা ডিসেম্বর পাকিস্তান অপারেশন ‘চেঙ্গিস খান’ নামে পশ্চিম ভারতের কয়েকটি শহরে বিমান হামলা চালায়। জবাবে ভারত পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক যুদ্ধের ঘোষণা দেয়। ৪ঠা ডিসেম্বর থেকে শুরু হয় হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে বাংলাদেশ-ভারত যৌথ বাহিনী চূড়ান্ত লড়াই। ২১ নভেম্বরের থেকে মুক্তিসেনাদের সফলতার হার নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পায়। যশোর অঞ্চলে যৌথ বাহিনীর ক্রমাগত চাপে হানাদার বাহিনী অগ্রবর্তী ঘাঁটিগুলো ছেড়ে দেয়। মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনীর সাঁজোয়া বহর ৬ ডিসেম্বর ভোরে যশোর শহরে প্রবেশ করে। দেশে প্রথম দখলদারিত্ব থেকে মুক্তি পায় যশোর জেলা। বাংলাদেশের প্রথম অস্থায়ী রাজধানী মুজিবনগর এবং মেহেরপুর জেলাও ঐ একই দিনে হানাদার মুক্ত হয়। এছাড়া, ভারত স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ হিসাবে বাংলাদেশকে দেয় আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি। আন্তর্জাতিক এই স্বীকৃতি মুক্তিবাহিনীর মনোবলকে চাঙ্গা করে তোলে। হানাদার বাহিনীর পরাজয় হয়ে পড়ে অনিবার্য। একের পর এক দখলদারত্ব থেকে মুক্ত হয় নতুন নতুন অঞ্চল।
মুক্তিযুদ্ধের শেষের দিকে নৌ ও বিমান বাহিনী বিধ্বংসী ভূমিকা পালন করে। ‘কিলো ফ্লাইট’ ৩রা ডিসেম্বর মধ্যরাতে বাংলাদেশের আকাশসীমায় প্রবেশ করে। অটার বিমান চট্টগ্রামে এবং অ্যালুয়েট হেলিকপটার নারায়ণগঞ্জের জ্বালানি তেলের ডিপোতে তীব্র বিমান আক্রমণ পরিচালনা করে। এতে হানাদার বাহিনীর রসদ সরবরাহ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অন্যদিকে, নৌবাহিনীর গানবোট ‘বানৌজা পদ্মা’ ও ‘পলাশ’ পশুর নদে সামরিক ও বাণিজ্যিক জাহাজ আক্রমণের মাধ্যমে সমুদ্র ও নৌবন্দরগুলোকে করে তোলে অনিরাপদ। এভাবে, ২১শে নভেম্বর থেকে জল, স্থল ও আকাশপথে ত্রিমুখী আক্রমণে হানাদার বাহিনী দিশেহারা হয়ে পড়ে।
সমন্বিত যুদ্ধের সাফল্যে যৌথ বাহিনী অপ্রত্যাশিত গতিতে ঢাকা মুখে অগ্রসর হয়। ৮ই ডিসেম্বর মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনী লাকসামে অবস্থানরত হানাদার বাহিনীকে তিন দিক থেকে ঘিরে ফেলে। ১১ই ডিসেম্বর ভোরে লাকসাম শত্রুমুক্ত হয়। নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয় চাঁদপুর, নোয়াখালী এবং ফেনী অঞ্চলের ওপর। চারদিকে হানাদার বাহিনীর প্রতিরক্ষাব্যবস্থা একের পর এক পড়তে থাকে মুখ থুবড়ে। অবশেষে, মাত্র কয়েক সপ্তাহের সর্বাত্মক যুদ্ধের পর ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণে বাধ্য হয়—অর্জিত হয় বাংলাদেশের স্বাধীনতা।
স্বাধীনতার পর সেনাবাহিনী ২৫শে মার্চ (প্রতিরোধ যুদ্ধের সূচনা), নৌবাহিনী ১০ই ডিসেম্বর (নৌঘাঁটি পিএনএস তিতুমীরে অভিযান) এবং বিমান বাহিনী ২৮শে সেপ্টেম্বর (‘কিলো ফ্লাইট’ প্রতিষ্ঠা) স্বতন্ত্রভাবে নিজস্ব বাহিনী দিবস পালন করলেও ছিল না কোনো একক দিবস। এমতাবস্থায়, মুক্তিযুদ্ধে অভিন্ন লক্ষ্য অর্জনে, ঐক্যের ভিত্তিতে পরিচালিত সম্মিলিত হামলার তাত্পর্য স্মরণে ১৯৮০ সাল থেকে ২১শে নভেম্বর ‘সশস্ত্র বাহিনী দিবস’ উদ্যাপনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। ১৯৭১ সালে সামরিক বাহিনীর সফলতাকে কুক্ষিগত না করে, সাধারণ জনগণের ত্যাগকে মহিমান্বিত করার অভিপ্রায়ে, মুক্তিযুদ্ধে জাতীয় ঐক্যের অবদানকে আনুষ্ঠানিক রূপে স্বীকৃতি দেওয়াই ছিল এই সিদ্ধান্তের মূল লক্ষ্য। স্বাধীন দেশে স্থিতিশীলতা এবং জাতীয় ঐক্যের ধারণা সমুন্নত রাখতে নিঃসন্দেহে এটি ছিল অত্যন্ত দূরদর্শী পদক্ষেপ।
মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী জাতির অহংকার। এ বাহিনী শুধু দেশের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার অতন্দ্র প্রহরীই নয়, বরং বিপদে-আপদে সাহায্যে বিশ্বস্ত কান্ডারি, জাতির আস্থার প্রতীক। যে কোনো দুর্যোগে বা সংকট নিরসনে এ বাহিনী জনগণের আশা-ভরসার স্থল। ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, খরা, কিংবা অন্য কোনো প্রাকৃতিক তাণ্ডবে দুর্গত মানুষের পরম বন্ধু সশস্ত্র বাহিনী। জাতির প্রয়োজনে অর্পিত কঠিন দায়িত্ব পালনে সশস্ত্র বাহিনী নিষ্ঠা ও আন্তরিকতায় অনন্য। চরম ধৈর্য, দায়িত্ববোধ ও দেশপ্রেমের আদর্শে দীক্ষিত এ বাহিনীর সদস্যরা ’২৪-এর ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান ও তত্পরবর্তী পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রমাণ করেছে যে, ‘সমরে আমরা, শান্তিতে আমরা, সর্বত্র আমরা দেশের তরে’। এছাড়া, জাতিসংঘের পতাকাতলে বিশ্বের বিভিন্ন যুদ্ধবিধ্বস্ত এলাকায় শান্তি প্রতিষ্ঠা ও মানবাধিকার রক্ষায় বাংলাদেশের নাম সর্বজনবিদিত। বিশ্বব্যাপী শান্তিপ্রতিষ্ঠায় তাদের অবদান ভবিষ্যত্ প্রজন্মের জন্য হতে পারে অনুকরণীয়।
সশস্ত্র বাহিনী দিবস ভবিষ্যত্ প্রজন্মের কাছে মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বগাথা, জনসাধারণের আত্মত্যাগের ইতিহাস ও মুক্তিযুদ্ধে জাতীয় ঐক্যের সফলতার বার্তা বহন করে চলেছে বছরের পর বছর। মনে করিয়ে দেয় সেসব শিক্ষণীয় বিষয়, যা আমরা বেমালুম ভুলে যাই নিত্যদিনের কর্মব্যস্ততায়।
- একতা, শৃঙ্খলা ও পেশাদারিত্ব:মুক্তিযুদ্ধে ছাত্র-জনতা ও সশস্ত্র বাহিনীর সম্মিলিত শক্তি বিজয়কে করেছিল ত্বরান্বিত। বীর যোদ্ধাদের কর্তব্যনিষ্ঠা, দক্ষতা, উন্নত পেশাদারিত্ব ও নেতৃত্বের প্রতি পূর্ণ আনুগত্য ছিল লক্ষ্য অর্জনের মূল চাবিকাঠি, যা হতে পরে ভবিষ্যত্ প্রজন্মের জন্য অনুসরণীয়।
- জনসংযোগ ও আত্মিক সম্পর্ক:জনযুদ্ধের মধ্য দিয়ে জন্ম সশস্ত্র বাহিনীর। জনগণের সঙ্গে যে বাহিনীর রয়েছে আত্মিক সম্পর্ক, তাকে কেউ দমিয়ে রাখতে পারেনি, পারে না। নতুন প্রজন্মের জন্য এ এক অমিয় বার্তা।
- সাহস ও আত্মত্যাগ:অকুতোভয় শহিদ ও বীর মুক্তিযোদ্ধাদের নিস্বার্থ আত্মত্যাগ আমাদের ভবিষ্যত্ অনুপ্রেরণার অনন্য পাথেয়। প্রকৃতপক্ষে বৃহত্তর স্বার্থে লক্ষ্য অর্জনে কোনো কিছু বাধা হতে পারে না। এ চেতনাকে হূদয়ে ধারণ করে নতুন প্রজন্মকে আগামী দিনের নেতৃত্ব গ্রহণে প্রস্তুত হতে হবে, মূলোত্পাটন করতে হবে দেশের অস্তিত্ব ও জাতীয় স্বার্থবিরোধী সব ষড়যন্ত্রের নীল নকশা।
- জাতীয় ঐক্য:জাতীয় ঐক্যের অভূতপূর্ব স্বাক্ষর বুকে নিয়ে, সশস্ত্র বাহিনী দিবস যেন বীরত্বের এক জীবন্ত কিংবদন্তি; যা প্রজন্মের পর প্রজন্মকে উদ্বুদ্ধ করে ন্যায় প্রতিষ্ঠার প্রয়াসে প্রতিবাদী কণ্ঠ জাগরণে। জাতির প্রয়োজনে ক্ষুদ্র স্বার্থকে বিসর্জন দিয়ে দেশ গঠনের অঙ্গীকার হোক আমাদের দৃঢ় প্রত্যয়। দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার অবিচল সংকল্পের সঙ্গে সঙ্গে ভবিষ্যত্ প্রজন্মের ব্রত হোক ঐক্য, সম্প্রীতি ও কল্যাণ।
একুশে নভেম্বর ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী, সশস্ত্র বাহিনীর আত্মবিশ্বাসের জাগ্রত উদাহরণ; জাতীয় ঐক্যের সেই স্বর্ণালি অধ্যায়, যা বীরত্বগাথার অমর মহাকাব্য হয়ে প্রবাহিত হচ্ছে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে। পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে চূড়ান্ত বিজয়ের পথে আলোকবর্তিকা হয়ে আছে দিনটি ইতিহাসের পাতায় পাতায়। ১৯৭১ সালে জাতির ক্রান্তিলগ্নে শোষকগোষ্ঠী ও হানাদার পাকিস্তানি বাহিনীর করালগ্রাস থেকে মুক্তির প্রয়াসে আপামর জনসাধারণের সশস্ত্র প্রতিরোধের ঐকান্তিক প্রচেষ্টারই ফসল আমাদের সশস্ত্র বাহিনী। এ বাহিনীর প্রতিটি সদস্য তো ঐ সব বীরদেরই উত্তরসূরি। তাদের ধমনিতে বয়ে চলে সেই প্রতিবাদী রক্তের ধারা। অন্যায়, অপবাদ আর প্রবঞ্চনায় ব্যথিতের সঙ্গে নাড়ির টানে আজও অনুরণিত হয় সশস্ত্র বাহিনী সদস্যদের হূদয়। তাই তো জাতির যে কোনো প্রয়োজনে কুণ্ঠাহীন চিত্তে, অকার্পণ্য মননে সর্বাগ্রে ঝাঁপিয়ে পড়ে সশস্ত্র বাহিনী। ’৭১-এর জনযুদ্ধের চেতনাকে ধারণ করে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং জাতীয় অবকাঠামো উন্নয়নে জনগণের হাতে হাত রেখে সশস্ত্র বাহিনী প্রতিনিয়ত রচনা করে চলেছে সফলতার কাব্য। তারা পেশাদারিত্বের মাধ্যমে কেবল দেশের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতাই বজায় রাখেনি, বরং জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনেও বাংলাদেশকে ‘বিশ্বশান্তির দূত’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে, জাতিকে করেছে মহিমান্বিত। মাতৃভূমির প্রতি আনুগত্য এবং জনতার প্রতি বিনম্র কৃতজ্ঞতাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত দেশাত্মবোধের এক শুদ্ধ স্রোতোধারা এই বাহিনীর সদস্যদের হূদয়কে করে স্পন্দিত। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও দেশ গঠনে সশস্ত্র বাহিনীর অবদান অনস্বীকার্য। জাতির স্বপ্ন বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ শৃঙ্খলা এবং জনগণের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক বজায় রেখে সেবার ব্রতে ঐক্যবদ্ধভাবে সব অপচেষ্টা ও অপশক্তিকে মোকাবিলা করার শপথ হোক সশস্ত্র বাহিনী দিবসের প্রাক্কালে আমাদের অঙ্গীকার।













