বর্তমানে জাতীয় ঐক্যের কথা কেউ চিন্তা করছেন বলে মনে হয় না। জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের আগে গত দেড় দশক ধরে যারা ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ছিলেন, তারাও এটা নিয়ে চিন্তা করেননি। বরং জাতি বিভক্ত হয়, এমন কিছু ইস্যুকে সামনে এনেছিলেন বারবার। বিশেষ করে, স্বাধীনতার পক্ষ-বিপক্ষের শক্তি বলে দেশে তৈরি করেছিলেন বিভাজন রেখা। তারা দুটি গুরুত্বপূর্ণ দলকে বাদ দিয়েই নির্বাচনের আয়োজন করেন। বর্তমানেও একই দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। কোনো কোনো দলকে বাদ রেখেই নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে। ইতিমধ্যে দেশের প্রধান নির্বাহী কর্তৃক সেই ঘোষণাও দেওয়া হয়েছে। দলনিরপেক্ষ ও বিবেকবানদের প্রশ্ন—এরূপ নির্বাচন কি অন্তর্ভুক্তি ও অংশগ্রহণমূলক হবে? যে কোনো দেশের জনগণের একটি বৃহত্ অংশকে বাদ দিয়ে জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা করা যায় না। আর জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠিত না হলে সেই দেশে শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। কেননা, কোনো না কোনো সময় দেশে আবার অশান্তি ও বিশৃঙ্খলা যে দেখা যে দেবে না, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।
জাতীয় ঐক্যের অর্থ এই নয় যে, আমাদের সব বিষয়ে একমত হতে হবে। পররাষ্ট্রনীতিসহ কিছু সাধারণ জাতীয় স্বার্থ ও ইস্যুতে সবাই একমত হলে দেশে শান্তি ফিরে আসতে পারে। যে কোনো দেশে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে নানা মত ও পথ থাকবে; এটাই স্বাভাবিক এবং এটাই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। সকলের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধা পোষণ করা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পরিচায়ক। এভাবে সকলকে গ্রহণ করতে পারাটা ঐক্যবদ্ধ হওয়ার অন্যতম পূর্বশর্ত। এক্ষেত্রে ব্যক্তি, গোষ্ঠী ও দলীয় সংকীর্ণ স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠতে হবে। নতুবা আমরা জাতি হিসেবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ব এবং ক্ষতিগ্রস্ত হব।
আসলে, একটি জাতিকে কেন ঐক্যবদ্ধ রাখা যায় না? উন্নয়নশীল দেশগুলোর এটাই বড় সমস্যা। সেখানে জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করে শান্তি, সমৃদ্ধি ও স্থিতিশীলতার দিকে পরিচালিত করার মতো রাষ্ট্রনায়কের বড়ই অভাব। ঔপনিবেশিকতার নাগপাশ থেকে স্বাধীনতা অর্জনকারী এসব দেশে `আনফিনিশড রেভ্যুলিউশন‘ বা অসমাপ্ত বিপ্লবের রেশ বিরাজমান। বিভিন্ন সময় গণআন্দোলনের হাত ধরে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর যেখানে সকলকে ঐক্যবদ্ধ করে জাতীয় উন্নয়ন ও অগ্রগতির কথা চিন্তা করা প্রয়োজন, সেখানে শেষ পর্যন্ত বিভাজন, হানাহানি, মারামারিসহ প্রতিহিংসাপরায়ণতাই সার হয়। এক্ষেত্রে দক্ষিণ আফ্রিকার অবিসংবিদিত বর্ণবাদবিরোধী নেতা নেলসন ম্যান্ডেলা ছিলেন ব্যতিক্রম। তিনি ছিলেন সত্যিকারের রাষ্ট্রনায়ক ও বিচক্ষণ রাজনীতিবিদ, যিনি জাতীয় ঐক্যের কথা মর্মে মর্মে উপলব্ধি করেছিলেন। জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করতে হলে উদারতা এবং সমঝোতা ও ত্যাগ স্বীকারের আদর্শ অনুসরণ করতে হয়। অতীতের বিবাদবিসংবাদ ভুলে ধর্মবর্ণনির্বিশেষে সবাইকে নিয়ে দেশ ও জাতি গঠনে ব্রত গ্রহণ করতে হয়। রিকনসিলিয়েশন বা জাতিগত পুনর্মিলনের দিকে অগ্রসর হতে হয়। যুদ্ধবিগ্রহ, সংঘাত-সহিংসতা বা যে কোনো বড় ধরনের বিরোধ-বিপ্লব শেষে শান্তি ও জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠাকেই অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন। এর অর্থ এই নয় যে, যারা খুন-গুম-ধর্ষণ, লুটপাট, মানবতাবিরোধী অপরাধ, অর্থপাচার ইত্যাদি গুরুতর অন্যায়-অপকর্মের সাথে জড়িত ছিল, তাদের সকলকে মাফ করে দিতে হবে। বরং তাদের অবশ্যই বিচারের মুখোমুখি করে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে; কিন্তু ঢালাও এবং অন্যায়ভাবে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করলে জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠার বদলে সেই দেশটিতে সংঘাত-সহিংসতা লেগেই থাকবে। বিশ্বের জটিল ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হলেও আমাদের জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলা অত্যাবশ্যক।
আমরা স্বাধীনতা অর্জন বা স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন-সংগ্রামে ঐক্যবদ্ধ হয়ে লড়াই করি বটে; কিন্তু এরূপ ক্ষেত্রে সাময়িক সাফল্য অর্জনের পর আবার অনৈক্য ও হানাহানিতে লিপ্ত হয়ে পড়ি, যা মোটেও কাম্য নয়।
অতএব, কতিপয় জাতীয় ইস্যুতে সকলের এক থাকা প্রয়োজন। প্রয়োজন পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সৌজন্যবোধের অনুশীলন এবং জনগণের সম্মিলিত আকাঙ্ক্ষার বাস্তবায়ন। আমাদের মনে রাখতে হবে, ভগ্নাংশকে নিয়ে কখনো জাতীয় ঐক্য হয় না বা হতে পারে না। হাফ ইঞ্জিন নিয়েও কোনো দেশ সঠিকপথে চলতে পারে না। আবার, লিবারেল ডেমোক্র্যাসি বা উদার গণতন্ত্রের চর্চা ছাড়া জাতীয় ঐক্য গঠন করা সম্ভব হবে না। এই বাস্তবতা উন্নয়নশীল বিশ্বের সরকারগুলোকে বুঝতে হবে এবং মর্মে মর্মে উপলব্ধি করতে হবে।













