সভ্যতা বলতে শুধু তলোয়ার-কামান-বন্দুক-গোলা-বারুদে সজ্জিত হয়ে দেশ দখল বা দুর্গ নির্মাণকে বোঝায় না। একটা জাতি নৈতিকতা, সমাজ, শাসনব্যবস্থা, আইন, দর্শন, সামাজিক শৃংখলা, কৃষি, শিক্ষা, নগর নির্মাণ ও লিখন পদ্ধতি এবং শিল্প-সংস্কৃতির ক্ষেত্রে উন্নত হলেই তাদের সভ্য বলা যায়।
বাংলাদেশে কয়েক হাজার বছর আগেই সভ্যতার বিকাশ ঘটেছিল। ঢাকা থেকে মাত্র ১০০ কিলোমিটারের মধ্যে খ্রিস্টপূর্ব যুগ থেকে হাজার বছরের প্রাচীন কয়েকটা সভ্যতা নিদর্শন আছে। এর মধ্যে নরসিংদীর ওয়ারী বটেশ্বর এবং ১৩০০ বছর আগে নির্মিত কুমিল্লা শালবন বৌদ্ধ বিহার বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। কুমিল্লার এই বুদ্ধ বিহার পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহারেরও ১০০ বছর আগে নির্মিত হয়। এগুলি মূলত ছিল বিশ্ববিদ্যালয়, যেখানে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে শিক্ষার্থীরা বৌদ্ধ ধর্ম ছাড়াও অন্যান্য বিষয়ে অধ্যয়নের জন্য আসতেন। এমনকি বর্তমানের রাজধানী ঢাকার ইতিহাস ‘মাত্র ৪০০ বছর আগের মোগল আমল থেকে বলে প্রচার চালানো হলেও এর প্রকৃত ইতিহাস হাজার বছরের প্রাচীন বলে পুরোনো কেন্দ্রীয় কারাগারে খননকাজে প্রাপ্ত প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন থেকে ধারণা করা হয়। এসব থেকে বাংলার উন্নত সভ্যতা ও সংস্কৃতির পরিচয় পাওয়া যায়।
একজন ব্যক্তির আচরণের ক্ষেত্রে যেমন তার পারিবারিক শিক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, সেভাবে একটা জাতির আচরণের ক্ষেত্রেও তার অতীত ঐতিহ্য, শিক্ষা এবং সংস্কৃতির প্রতিফলন থাকা প্রয়োজন। বাঙালির যে অসাম্প্রদায়িকতা, আতিথেয়তা, বৈচিত্রপূর্ণ খাবার, পোষাক এবং উৎসব— এসবকিছুই সেই হাজার বছরের পুরানো সংস্কৃতির উত্তরাধিকার। পৃথিবীর সবদেশ থেকে বিদেশীরা বাংলায় এসে স্থায়ীভাবে থেকেছেন।
একটা জাতির অধিকাংশ লোক সহিংস, অসৎ, সভ্যতা-শিষ্টাচারবর্জিত হলে কেউই তাদের দেশে থাকতে আগ্রহী হয়না। নীতিহীন লোকজন সবসময়ই ছিল, কিন্ত অতীতে সেটা নির্দিষ্ট পেশা বা এলাকার লোকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিলো। কিন্তু বর্তমানে দেখা যাচ্ছে অতীত সভ্যতার কল্যাণমূলক আচরণের চেয়ে ক্ষতিকর আচরণ দেশে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। অর্থলোভ, দুর্নীতি সন্ত্রাস, মিথ্যাচার, প্রতারণা এ ধরনের সভ্যতাহীন কর্মকাণ্ড বাংলাদেশের সব শ্রেণী এবং পেশার ব্যাক্তিদের মধ্যে দেখা যাচ্ছে, যা উন্নত সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনের এবং শান্তিপূর্ণ বসবাসে বাধা সৃষ্টি করছে।
একটা জাতির বর্তমান অবস্থা তাদের বিভিন্ন কর্মকান্ডের মাধমে সৃষ্ট অতীত ইতিহাসের ধারাবাহিকতা। প্রাচীন গ্রীক এবং রোমান থেকে শুরু করে পরবর্তী সব ঐতিহাসিক বাংলার অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং সামরিক শক্তির কথা লিখেছেন। বাংলার সীমানায় অবস্থিত গঙ্গারিডাই রাজ্যের সামরিক শক্তির কথা শুনে আলেকজান্ডারের সৈন্যরা আতঙ্কিত হয় এবং আক্রমণ না করার সিদ্ধান্ত নেয়।
বাংলার ইতিহাস বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এদেশের জনগণ যখনই, দলাদলি,পরশ্রীকাতরতা ও বিভেদ ছেড়ে জাতীয় স্বাধীনতা এবং উন্নয়নের গুরুত্ব দিয়েছে; সত্য এবং ন্যায়ের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে তখনই তাদের স্বাধীনতা এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি লাভ করা সম্ভব হয়েছে। শশাঙ্ক পরবর্তী দীর্ঘ ৪০০ বছর পাল রাজবংশের শাসন এবং ৭১-এ মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীনতা এর দৃষ্টান্ত। আর যখন তারা নিজেদের জাতীয় স্বার্থের কথা ভুলে ব্যক্তিগত এবং গোষ্ঠীগত স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়েছে তখন স্বাভাবিকভাবেই জাতীয় ঐক্য দুর্বল হয়ে পড়েছে এবং দেশে অত্যাচারী বিদেশী শাসন শুরু হয়েছে। বহিরাগত সেনদের পাল বংশের শাসেনের অবসান ঘটানো এবং বৌদ্ধ ধর্ম ও স্থাপনার সম্পূর্ণ ধ্বংস সাধন, পরবর্তীতে আফগানিস্তান, তুরস্ক, ইরান থেকে বিভিন্ন গোষ্ঠীর আক্রমণ ও বাংলা শাসন এবং সব শেষে ইংরেজদের বাংলা দখল করে দীর্ঘ ঔপনিবেশিক শাসন এর সত্যতা প্রমাণ করে। বাংলার জনগণ যদি ঐক্যবদ্ধ থাকতো তাহলে কর্ণাটকের সেনরা কখনোই ভূমিপুত্র পালদের ক্ষমতাচ্যুত করতে পারত না। আরব, পারস্য, চীন, জাপান, কোরিয়া এবং রাশিয়া হাজার বছর ধরে নিজেদের বিভিন্ন রাজবংশ স্বাধীনভাবে শাসন করেছে। কারণ তারা প্রত্যেকে জাতীয় স্বার্থে এবং স্বাধীনতার ক্ষেত্রে ঐক্যবদ্ধ ছিল।
পৃথিবীর প্রতিটা উন্নত দেশ অতীতে গৃহযুদ্ধ বা অভ্যন্তরীণ সংঘাতের মধ্যে দিয়ে গেছে। বাংলাদেশেও ১১ শতকে পাল আমলে একই ধর্ম ও জাতির অনুসারী কৈবর্তদের সাথে শাসকদের সহিংস গৃহযুদ্ধ হয়েছে, যে যুদ্ধে রাজাকে প্রাণ হারাতে হয়েছে। রাশিয়া, চীন, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানি, সব দেশেই মধ্য এবং আধুনিক যুগেও ব্যাপক গৃহযুদ্ধ হয়েছে । কিন্তু তারা সেসব অতিক্রম করে নিজেদের দেশকে উন্নত দেশে পরিণত করেছে। কিন্ত স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশের সম্পূর্ণ অকারণে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সহিংসতা চলছে। পৃথিবীর কোন এক ভাষার বা জাতির দেশে এরকম দুর্নীতি, দলাদলি বা সহিংসতা হতে দেখা যায় না। এসব অর্থহীন অপকর্মের কারণে দেশ উন্নত বা শন্তিপূর্ণ হতে পারছে না। বাংলাদেশের অতীত গৌরবের ইতিহাস অবগত হয়ে দেশের প্রতিটা নাগরিকের উন্নত ও শান্তিপূর্ণ দেশ গঠনের প্রতিজ্ঞাই এই অবস্থার অবসান ঘটাতে পারে।
লেখক : ৬৫ শান্তিনগর ঢাকা-১২১৭ থেকে।
(এই লেখা লেখকের একান্ত ব্যক্তিগত অভিমত; এ সংক্রান্ত কোনো দায় দৈনিক মূলধারা বহন করবে না)













